পঞ্চম অধ্যায় : প্রাচীন বাংলার সামাজিক অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস
সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর-২
উদ্দীপকটি পড়ে নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর লেখ।
বেনু তার বান্ধবীর সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে যায়। সেখানে গিয়ে দেখতে পেল সেখানকার নারী ও পুরুষ উভয়ের মধ্যেই অলংকার ব্যবহারের রীতি আছে। নারীরা পায়ে আলতা, কপালে কুমকুম, গলায় হার ও আঙুলে আংটি পরে। খাবারের মধ্যে ভাত, মাছ, মাংস, সবজি, দুধ, ঘি ইত্যাদি খাবারের প্রচলন দেখতে পায়। সে সময় খাবারের পর মসলাযুক্ত পান খাওয়ার রীতি প্রচলিত ছিল।
ক) আর্যদের ভাষার নাম কী? ১
খ) ‘জাতিভেদ প্রথা’ বলতে কী বোঝায়? ২
গ) উদ্দীপকে বর্ণিত অলংকার ব্যবহারের সঙ্গে বাংলার কোন যুগের মিল আছে। ব্যাখ্যা করো। ৩
ঘ) উল্লেখিত খাবারগুলো অতীত থেকে বাংলার খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল, আলোচনা করো। ৪
উত্তর: ক) আর্যদের ভাষার নাম ছিল সংস্কৃত। এটি একটি প্রাচীন ভারতীয় ভাষা, যা আর্যদের ধর্মীয় গ্রন্থ রচনার জন্য ব্যবহৃত হতো।
খ) ‘জাতিভেদ প্রথা’ বলতে সমাজে বিভিন্ন জাতি বা বর্ণের মধ্যে পার্থক্য ও বিভাজন বোঝায়। এটি ভারতের বৈদিক যুগ থেকে শুরু হয়ে ক্রমে প্রাচীন এবং মধ্যযুগীয় সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়। জাতিভেদ প্রথার মূল ভিত্তি ছিল বৈদিক সমাজে বর্ণব্যবস্থা, যা চারটি প্রধান শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। সেগুলো হলো-
১. ব্রাহ্মণ: ধর্মীয় আচার ও শিক্ষার দায়িত্ব পালন করতেন।
২. ক্ষত্রিয়: শাসন ও যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন।
৩. বৈশ্য: কৃষি, ব্যবসা ও পশুপালনের কাজে নিযুক্ত ছিলেন।
৪. শূদ্র: শ্রমজীবী শ্রেণি, যারা বাকি তিন শ্রেণির সেবা করতেন।
জাতিভেদ প্রথায় জন্মগত বর্ণ নির্ধারণ হতো এবং এক বর্ণের মানুষ অন্য বর্ণের মানুষের সঙ্গে মেলামেশা বা বিবাহ করতে পারত না। এটি সামাজিক শ্রেণিবিভাজন এবং বৈষম্যের সৃষ্টি করেছিল। পরবর্তী সময়ে এটি সমাজে মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে।
আরো পড়ুন : প্রাচীন বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস অধ্যায়ের ১টি সৃজনশীল প্রশ্নোত্তর, ১ম পর্ব
গ) উদ্দীপকে বর্ণিত অলংকার ব্যবহারের সঙ্গে বাংলার প্রাচীন ও মধ্যযুগের সামাজিক সংস্কৃতির মিল রয়েছে।
বাংলার প্রাচীন যুগে অলংকার ব্যবহার ছিল এক সাধারণ প্রথা, যা নারীদের পাশাপাশি পুরুষের মধ্যেও দেখা যেত। তৎকালীন সমাজে ধাতব অলংকার যেমন- সোনা, রুপা, তামা এবং কাচের অলংকার ব্যবহার প্রচলিত ছিল। নারীরা গলার হার, কানের দুল, নূপুর, আঙুলে আংটি এবং মাথায় বিভিন্ন অলংকার পরতেন। পাশাপাশি পুরুষদের কানে দুল এবং গলায় মালা পরার প্রচলিত রীতি ছিল।
মধ্যযুগে এই অলংকারের ব্যবহার আরও প্রসার লাভ করে। বাঙালির সংস্কৃতিতে নারীদের বৈবাহিক অবস্থার পরিচায়ক হিসেবে অলংকারের ব্যবহার ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদ্দীপকে বর্ণিত অলংকার ব্যবহারের রীতিগুলো সেই যুগের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ধারা প্রতিফলিত করে।
এই অলংকারগুলো শুধু সৌন্দর্যবর্ধনের জন্যই নয়, তা সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক অবস্থার প্রতীক হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। উদ্দীপকে বর্ণিত সংস্কৃতি বাংলার ঐতিহাসিক অলংকার ব্যবহারের ঐতিহ্যকেই প্রকাশ করে।
ঘ) উদ্দীপকে ছিল উল্লেখিত খাবারগুলো বাংলার অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত এবং এগুলো বাংলার ভৌগোলিক, কৃষিনির্ভর এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক।
১. ভাত : বাংলার প্রধান খাদ্য ভাত, যা ধান থেকে তৈরি। বাংলার উর্বর মাটিতে প্রচুর ধান উৎপন্ন হওয়ায় এটি মানুষের খাদ্যাভ্যাসের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
২. মাছ : নদীমাতৃক বাংলায় মাছ অন্যতম প্রধান খাদ্য। ইলিশ, পুঁটি, চিংড়ি প্রভৃতি মাছের চাহিদা প্রাচীনকাল থেকেই রয়েছে। ইলিশ, শুঁটকি মাছ এবং বিভিন্ন প্রজাতির দেশি মাছ তাদের খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল। বাংলার প্রাচীন সাহিত্যে এবং মিথে মাছের উল্লেখ পাওয়া যায়।
৩. মাংস : বাংলায় মাংস খাওয়ার রীতি ছিল। গরু, ছাগল, মুরগির মাংস এবং শিকার করা বন্যপ্রাণীর মাংস খাওয়া প্রচলিত ছিল।
৪. সবজি : বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি প্রাচীনকাল থেকেই বাংলার খাদ্যতালিকায় ছিল। শাক, কচু, কুমড়া, লাউ প্রভৃতি সবজি সহজলভ্য এবং পুষ্টিকর হওয়ায় ব্যাপকভাবে খাদ্যতালিকায় রাখা হতো।
৫. দুধ ও ঘি: গৃহপালিত গরু এবং মহিষ থেকে প্রাপ্ত দুধ এবং তা থেকে তৈরি ঘি বাংলার খাদ্যতালিকার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল। এগুলো পুষ্টির পাশাপাশি আচার-অনুষ্ঠানেও ব্যবহৃত হতো।
৬. মসলাযুক্ত পান : পান খাওয়া প্রাচীন বাংলার এক বিশেষ রীতি, যা আজও প্রচলিত। খাবারের পরে মসলাযুক্ত পান খাওয়া সামাজিক ঐতিহ্যের প্রতীক। এটি শুধু মুখের স্বাদ বৃদ্ধিই নয়, অতিথি আপ্যায়নের অংশও ছিল।
সংস্কৃতির প্রতিফলন : বাংলার খাদ্যাভ্যাস পরিবেশ, কৃষি এবং সামাজিক জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। এই খাবারগুলো প্রাচীন বাংলার কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, নদীমাতৃক পরিবেশ এবং খাদ্য উৎপাদনের প্রতিচ্ছবি। উদ্দীপকে বর্ণিত খাবারগুলোর উল্লেখ অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত বাংলার খাদ্যাভ্যাসের ধারাবাহিকতার পরিচায়ক।
লেখক : সহকারী শিক্ষক
সাভার অধরচন্দ্র সরকারি উচ্চবিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা
কবীর