নাটক : সিরাজউদ্দৌলা
অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন: ‘ব্রিটিশ সিংহ ভয়ে লেজ গুটিয়ে নিলেন, এ বড় লজ্জার কথা’- ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘সিরাজউদ্দৌলা’ নাটকের প্রথম অঙ্কের প্রথম দৃশ্যে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে নবাব সিরাজউদ্দৌলার আক্রমণের মুখে ইংরেজরা পালিয়ে যাওয়ায় ওপরের মন্তব্যটি করা হয়েছে।
কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে ইংরেজরা নবাবের বিনা অনুমতিতে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে। তাই নবাব ওই দুর্গ আক্রমণ করেন। ইংরেজ সেনারা নবাবের সেনাদের আক্রমণের মুখে দিশেহারা হয়ে পড়লে ক্যাপ্টেন মিনচিন, কাউন্সিলর ফকল্যান্ড ও ম্যানিংহাম নৌকাযোগে দুর্গ থেকে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন। শেষ পর্যায়ে ক্যাপ্টেন ক্লেটনও গভর্নর ড্রেকের সঙ্গে পরামর্শের নাম করে আত্মরক্ষার্থে সব প্রতিজ্ঞা ভুলে দুর্গ থেকে পালিয়ে যান। এমতাবস্থায় বন্দি উমিচাঁদ হলওয়েলকে ব্যঙ্গার্থে ওপরের কথাটি বলেছিলেন। মুখে বড় বড় কথা বললেও ইংরেজরা শক্ত প্রতিরোধে পালাতে বাধ্য হয়েছিল।
প্রশ্ন: ট্র্যাজেডি হিসেবে ‘সিরাজউদ্দৌলা’ নাটকের সার্থকতা বিচার করো।
উত্তর: নায়ককে প্রধান করে কাহিনি এবং করুণ রস পরিবেশনের ফলে ‘সিরাজউদ্দৌলা’ নাটকে ট্র্যাজেডির বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে।
নায়ক কিংবা নায়িকামুখ্য করুণ রস পরিবেশন ট্র্র্যাজেডির ধর্ম। ট্র্যাজেডি নাটকে কোনো জটিল ও গুরুতর ঘটনার আশ্রয়ে বিশেষ ধরনের রস সঞ্চার করা হয়, যা আমাদের অনুভূতিকে অভূতপূর্ব আবহে আলোড়িত করে, ভয় ও করুণা জাগায়। এ ধরনের নাটকে শত বিপর্যয় সত্ত্বেও নায়কের সুদৃঢ় মহিমান্বিত অবস্থান রূপায়িত হয়। ‘সিরাজউদ্দৌলা’ নাটকে আমরা দেখি নায়কমুখ্য কাহিনি এবং কারুণ রসের ব্যঞ্জনা ঘটেছে। সামরিক সামর্থ্য, উচ্চ মর্যাদা, শত্রুর চেয়ে বেশি যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যখন নবাব সিরাজের নির্মম পরাজয় ও মৃত্যু ঘটে, তখন তা সত্যিকার অর্থেই ট্র্যাজেডির বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে।
প্রশ্ন: ‘রজার ড্রেক প্রাণভয়ে কুকুরের মতো ল্যাজ গুটিয়ে পালিয়েছে’- ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘সিরাজউদ্দৌলা’ নাটকের প্রথম অঙ্কের প্রথম দৃশ্যে নবাব সিরাজউদ্দৌলার সেনারা ফোর্ট উইলিয়ামে আক্রমণ করলে গভর্নর রজার ড্রেকের পালিয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে নবাব ওপরের কথাটি বলেছেন।
১৭৫৬ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলা ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ অধিকার করে নেন এবং কলকাতার নামকরণ করেন ‘আলিনগর’। এই দুর্গের যুদ্ধে নবাব সেনার আক্রমণে ইংরেজদের শোচনীয় পরাজয় ঘটে। তখন গভর্নর রজার ড্রেক ভয় পেয়ে গোপনে পালিয়ে যান। কিন্তু হলওয়েল প্রকৃত সত্য গোপন করে নবাবকে জানায়, রজার ড্রেক কলকাতার বাইরে গেছেন। রজার ড্রেকের কাপুরুষতার কথা নবাব জানতেন বলেই ওপরের কথাটি বলে তিনি ব্যঙ্গ করেছেন।
আরো পড়ুন : বিলাসী গল্পের ১০টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ১০ম পর্ব, এইচএসসির বাংলা ১ম পত্র
প্রশ্ন: ‘ভিক্টরি অর ডেথ, ভিক্টরি অর ডেথ’ কথাটির ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘সিরাজউদ্দৌলা’ নাটকের প্রথম অঙ্কের প্রথম দৃশ্যে ক্যাপ্টেন ক্লেটন সেনাদের মনোবল বাড়ানোর উদ্দেশ্যে বলেছিলেন- ‘ভিক্টরি অর ডেথ, ভিক্টরি অর ডেথ’-বিষয়টি তার নেতৃত্বগুণ প্রকাশিত হয়েছে।
১৭৫৬ সালের ১৯ জুন ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে নবাবের বাহিনীর সঙ্গে ইংরেজদের যুদ্ধ হচ্ছিল। নবাব সিরাজউদ্দৌলার সেনাদের কাছে ইংরেজরা পর্যুদস্ত হয়ে পড়ছিল। সেনাদের উৎসাহ দিতে ক্লেটন আলোচ্য কথাটি বলেছিলেন। কারণ তার মতে যুদ্ধে জয়লাভ অথবা মৃত্যুবরণ, এটাই ব্রিটিশ সেনাদের প্রতিজ্ঞা। প্রাথমিকভাবে তাকে বেশ বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে দেখা গেলেও, শেষে দেখা যায় তিনি তার কথার মতো সাহসী নন।
প্রশ্ন: ওয়ালি খানকে চড় মারার জন্য ক্লেটনের এগিয়ে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘সিরাজউদ্দৌলা’ নাটকের প্রথম অঙ্কের প্রথম দৃশ্যে ‘বাঙালি কাপুরুষ নয়’-এ কথা বলায় ওয়ালি খানকে চড় মারার জন্য ক্লেটন এগিয়ে যান।
ফোর্ট উইলিয়ামে ইংরেজরা পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছালে তাদের পক্ষের বাঙালি সেনা ওয়ালি খান ক্যাপ্টেন ক্লেটনকে যুদ্ধ বন্ধ করতে বলেন। নবাব সিরাজউদ্দৌলার সেনারা গোলাগুলি করতে করতে ইংরেজদের ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের কাছাকাছি এসে গেলে নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য ওয়ালি খান এর কোনো বিকল্প কিছু দেখেননি। কিন্তু ক্যাপ্টেন ক্লেটন বাঙালিদের কাপুরুষ বলে গালি দিলে বাঙালি ওয়ালি খান এ কথার প্রতিবাদ করায় ক্লেটন তাকে চড় মারার জন্য এগিয়ে যান। টাকার জন্য বাঙালিরা ইংরেজদের পক্ষে গেলেও বাঙালিরা কাপুরুষ ছিল না, এমন কথার প্রতিরোধ ক্লেটন সহ্য করতে পারেননি।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, ঢাকা
কবীর