তখন নিতান্তই শিশু আমি। স্কুলের শুরুর দিকে পড়ি। আমাদের পাঠ্যবইয়ের একটি কবিতা আমাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করে। কবিতার নাম প্রার্থনা। লিখেছেন সুফিয়া কামাল।
‘তুলি দুই হাত করি মোনাজাত
হে রহিম রহমান
কত সুন্দর করিয়া ধরণী
মোদের করেছ দান।’
পুরো কবিতা পড়ি আর মুগ্ধ হয়ে যাই। আমিও দুই হাত তুলে মোনাজাত করি। কবির লেখা কবিতা বলি,
‘মাতা, পিতা, ভাই, বোন ও স্বজন
সব মানুষেরা সবাই আপন
কত মমতায় মধুর করিয়া
ভরিয়া দিয়াছ প্রাণ’।
আমার শিশুমনে দুটো বড় ধরনের ঘটনা ঘটে গেল। সিদ্ধান্ত নিলাম সুন্দর পৃথিবী যেন আমার কাছ থেকে কখনো কষ্ট না পায়। সারা জীবন প্রকৃতিকে ভালোবেসে যাব। আরেকটা সিদ্ধান্ত নিলাম, তা হচ্ছে বাবা, মা, ভাই, বোন, আত্মীয়স্বজন কাউকে কখনো দুঃখ দেব না। সবাইকে নিয়ে ভালো থাকব। আমার প্রতিজ্ঞার স্মারক হিসেবে কবিতার সঙ্গে দুই হাত তুলে মোনাজাত করার যে ছবি ছিল সেই ছবি খাতার কাগজে আঁকলাম। ছবি রং করে ঘরের দেয়ালে টাঙিয়ে রাখলাম।
কবি সুফিয়া কামাল ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালের আড়িয়াল খাঁ নদীর পাড়ে শায়েস্তাবাদের নবাব পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ছিলেন নামকরা উকিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিলাউরের সৈয়দ আবদুল বারী। তিনি ছিলেন অদ্ভুত চরিত্রের মানুষ। সুফিয়া কামালের বয়স যখন সাত বছর তখন তার বাবা ওকালতির চাকরি, ঘরবাড়ি সব ছেড়ে সন্ন্যাসি-সুফি হয়ে যান। সুফিয়া কামাল মা সাবেরা বেগমের সঙ্গে মামার বাড়িতে বড় হতে থাকেন।
সুফিয়া কামাল শিশুর মানসগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। শিশুদের আহ্বান জানিয়েছেন সামনের দিকে। উৎসাহ দিয়েছেন। কী অসাধারণভাবে ‘আমাদের শিশু’ কবিতায় লিখেছেন,
‘আমাদের যুগে আমরা যখন খেলেছি পুতুল খেলা
তোমরা এ যুগে সেই বয়সে লেখাপড়া করো মেলা।
আমরা যখন আকাশের তলে উড়ায়েছি শুধু ঘুড়ি
তোমরা এখন কলের জাহাজ চালাও গগন জুড়ি।’
গভীর আবেগ, ভালোলাগা, সরলতা, আত্মবিশ্বাস আর মনোবল মিশে আছে কবি সুফিয়া কামাল নামের সঙ্গে। তিনি শিশুদের নিয়ে সবসময় ভেবেছেন। তারা যেন প্রত্যেকে দেশের সুনাগরিক হয়ে গড়ে ওঠে, সেই উদ্যোগ নিয়েছেন। সেই মানসে তিনি ১৯৫৬ সালে শিশুদের সংগঠন কচিকাঁচার মেলা প্রতিষ্ঠা করেন।
সুফিয়া কামাল কেবল কবি নন, কবিতার পাশাপাশি তিনি শিশুতোষ কাহিনি, ছোটগল্প, উপন্যাস, ডায়েরি, ভ্রমণকাহিনি লিখেছেন। তার লেখা প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ২০। তিনি শুধু লেখালেখিতে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখেননি। দেশের সব সংকটময় মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। ভাষা আন্দোলনে তিনি ছিলেন একজন অগ্রণী ব্যক্তিত্ব, সক্রিয় কর্মী ও সংগঠক। তিনি যেমন ভাষা আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণে উৎসাহিত করেছিলেন তেমনি ভাষা আন্দোলনের পক্ষে জনমত তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান মহিলা সমিতি গঠিত হয় এবং সুফিয়া কামাল তার সভানেত্রী নির্বাচিত হন। বাঙালি সংস্কৃতির ওপর যখনই আঘাত এসেছে, তখনই তিনি তার প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন। ১৯৬১ সালে তিনি ‘সাংস্কৃতিক স্বাধিকার আন্দোলন’-এর নেতৃত্ব দেন। যা রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপনের ওপর পাকিস্তান সরকারের নিষেধাজ্ঞা জারির প্রতিবাদে হয়েছিল। সেই বছরই তিনি ছায়ানটের সভাপতি হন। ১৯৬৯ সালে সুফিয়া কামাল মহিলা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেন।
মুক্তিযুদ্ধেও সুফিয়া কামালের অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ছিলেন একজন দৃঢ়চেতা ও সাহসী ব্যক্তিত্ব। ১৯৭১ সালের মার্চের শুরুতে অসহযোগ আন্দোলনে সুফিয়া কামাল ঢাকায় নারী সমাবেশ এবং মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন যখন বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের সমর্থনে বিবৃতি দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল তখন সেই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করতে তিনি অস্বীকৃতি জানান। সুফিয়া কামালের লেখা বিখ্যাত একখানা ডায়েরি আছে।
একাত্তরের ডায়েরি। যেখানে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং সেই সময়ের ভয়াবহ পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা করা হয়েছে। যে ডায়েরি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের উল্লেখযোগ্য দলিলের মর্যাদা লাভ করেছে। যা মহান মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পেতে সহায়তা করে।
সুফিয়া কামালের জীবনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো বড় একটি ঘটনা ঘটে ১৯১৮ সালে। তিনি মায়ের সঙ্গে প্রথম কলকাতায় যান। তখন মহিয়সী ব্যক্তিত্ব নারী জাগরণের পথিকৃত বেগম রোকেয়ার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। বেগম রোকেয়ার নারী জাগরণের মনোভাব, দর্শন এবং সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ ভীষণভাবে কিশোরী সুফিয়ার মনে আলোড়ন তৈরি করে এবং স্থায়ীভাবে স্থান করে নেয়।
বড় হতে হতে সেই কিশোরী সুফিয়া খেয়াল করেছেন আমাদের সমাজে তুলনামূলকভাবে নারীর ওপর বৈষম্য ও অসাম্য চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। আর নারীর প্রতি এই বৈষম্য আর অসাম্য গড়ে ওঠে শিশুকাল থেকে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায়, যা নারীকে অধস্তন করে রাখে। তাতে ইতিহাসে নারীর অবদান বারবার উপেক্ষিত হয়, নারী থেকে যায় ‘নারী’ হিসেবে, মানুষ হিসেবে তার স্বীকৃতি মেলে না। তিনি নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীর প্রতি বৈষম্যের নানান রূপের বিরুদ্ধে গণজাগরণ সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি নিজ লেখা ও কাজের মাধ্যমে নারীকে উৎসাহ জুগিয়েছেন, আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছেন, হয়েছেন আস্থা আর প্রেরণার স্থান। তখনকার সমাজে নারীদের বড় হতে হয়েছে রক্ষণশীল পরিবারে। যেখানে নারীদের লেখাপড়ার ব্যাপারই ছিল দুরূহ, সেখানে একজন নারীর লেখালেখি ছিল অকল্পনীয়। সুফিয়া কামাল সেই রক্ষণশীল পরিবারের অবরোধবাসিনীদের লিখতে আগ্রহী করে তুলেছেন। সুফিয়া কামাল ছিলেন সাপ্তাহিক ‘বেগম’ পত্রিকার প্রধান সম্পাদিকা।
সুফিয়া কামাল সবসময় সমাজগঠনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। তিনি ছিলেন অনেকটা গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিত। ১৯২৫ সালে মহাত্মা গান্ধী একবার বরিশালে এসেছিলেন। মহাত্মা গান্ধীর জীবনবোধ এবং অহিংস আন্দোলন অল্পবয়সী সুফিয়াকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছিল। এরপর তিনি বেশ কিছুদিন চরকায় সুতা কেটেছেন।
পরবর্তীতে কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ সুফিয়া কামালের জীবনে বড় ভূমিকা রাখে। সুফিয়া কামালের লেখা কবিতা পড়ে কাজী নজরুল ইসলাম মুগ্ধ হয়েছিলেন এবং তাৎক্ষণিক ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। ১৯২৬ সালে সাওগাত পত্রিকায় সুফিয়া কামালের লেখা প্রথম কবিতা ‘বাসন্তী’ প্রকাশ হলে বাংলার সাহিত্যাঙ্গনে সুফিয়া কামাল কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৩৮ সালে সুফিয়া কামালের লেখা প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাঁঝের মায়া’ প্রকাশিত হয়।
বইয়ের ভূমিকা লিখেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। এই বই পড়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা ও আশীর্বাদ জানিয়ে সুফিয়া কামালকে চিঠি লিখেছিলেন।
নারীশিক্ষা, নারীমুক্তি এবং সমাজের কুসংস্কার ও অনগ্রসরতা দূর করতে সুফিয়া কামাল সারা জীবন কাজ করে গেছেন। তার সংগ্রামী ও সাহসী ভূমিকার জন্য তাকে ‘জননী সাহসিকা’ খেতাব দেওয়া হয়। ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর তিনি ইন্তেকাল করেন। আজ ২০ জুন, সুফিয়া কামালের জন্মদিন। তিনি আমাদের পথিকৃৎ, পথপ্রদর্শক, বাতিঘর। তার প্রতি প্রগাঢ় শ্রদ্ধা।