ঢাকা ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
‘নতুন পুরাতন মিলিয়ে ভালোই বোর্ড হবে’ শাহজালালের কার্গো শেডে আগুন শূন্যরেখায় মানবেতর জীবন শিকলবাহায় হত‍্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে মরদেহ নিয়ে মহাসড়কে বিক্ষোভ অ্যালামনাই প্ল্যাটফর্ম ০২০৪ ব্যাচের বন্ধুদের ঈদ পরবর্তী পুনর্মিলনী মায়ানমারে পাচারকালে দেড় হাজার বস্তা সিমেন্ট আটক ৫২ মরুভূমিতে বিকল ট্রাক, পানির অভাবে ৪৯ জনের মৃত্যু মেধা ও ক্রীড়াবান্ধব জাতি গঠনে সরকার বহুমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী নোয়াখালীতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ভক্তদের শোডাউন সরকারকে ৭ দিনের আলটিমেটাম ইনকিলাব মঞ্চের প্রথমবার এআই তৈরি করল ‘সুপার-ভ্যাকসিন’ হাদি হত্যা মামলার বাদীকে নিয়ে বোনের প্রশ্ন? জয়পুরহাট সীমান্তে পুশইনের চেষ্টা, বিজিবির টহল জোরদার রাজনীতি এক ভয়ংকর পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হচ্ছে: মির্জা ফখরুল হজ শেষে দেশে ফিরলেন ২৯,৬৯৪ হাজি নারায়ণগঞ্জে ১৭ বন্যপাখি উদ্ধার ও অবমুক্ত হান্নানের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির তথ্য ফাঁস, ছাত্রদল নেতার বাড়িতে হামলার অভিযোগ নায়িকা মিমির বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট, শেষ দেখে নেওয়ার হুমকি! দোয়া গুরুত্বপূর্ণ এক ইবাদত সংসদ ভবন এলাকায় আগ্নেয়াস্ত্র বহনসহ মিছিল-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা কটাক্ষের শিকার আনুশকা কলকাতার মেয়র পদ ছাড়লেন ফিরহাদ হাকিম চট্টগ্রামে কাফনের কাপড় পরে যুবলীগের বিক্ষোভ মিছিল হরোস্কোপের গোলকধাঁধায় ভবিষ্যৎ ভাবনা বিয়ে করলেন উপস্থাপিকা দীপ্তি চৌধুরী উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের মানসিকতা সরকারের নেই: তথ্য প্রতিমন্ত্রী দিনে দিনেই ঘুরে আসুন মৈনট ঘাট থেকে পাবনায় ২০০ একর জমির ওপর বিসিক শিল্পনগরী গড়ে তোলা হবে: বাণিজ্যমন্ত্রী
Nagad desktop

সর্বনাশের মানবিক শিল্পযাপন

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৫, ১০:০২ এএম
আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৫, ১০:৩৯ এএম
সর্বনাশের মানবিক শিল্পযাপন
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই

হাঙ্গেরির সদ্য নোবেলজয়ী লেখক লাসলো ক্রাসনাহোরকাই বাংলাদেশে একেবারে অপরিচিত ছিলেন না। কিন্তু তার পরিচিতি নির্দিষ্ট কিছু পাঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কেউ কেউ তার গল্প অনুবাদও করেছেন। তবে তা সংখ্যায় খুবই কম, ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। বৃহত্তর পাঠক পরিসরে তিনি সেইভাবে পঠিত হননি। না হোন পঠিত, কিন্তু উল্লেখযোগ্য একজন লেখক হিসেবে তার নাম জানেন ইউরো-মার্কিন লেখক, সমালোচক ও পাঠকবৃন্দ। গত দু-তিন বছর ধরে নোবেল পাওয়ার দৌড়ে তিনি এগিয়ে ছিলেন, এমন সম্ভাবনার কথাও শোনা গেছে। ওই অঞ্চলের পত্র-পত্রিকাগুলো এ রকম খবর নোবেল পুরস্কার ঘোষণার আগে প্রকাশও করেছে। এবার তো তিনি সমকালীন বিশ্বসাহিত্যের রথী-মহারথীদের অনেককে ছাড়িয়ে পুরস্কারটা জয় করে নিলেন।

তার এই জয়ে বাংলাদেশের পাঠক এবং কোনো কোনো লেখক আবারও চমকে উঠেছেন। তাদের প্রতিক্রিয়াটা এমন, নাহ্, চিনতে তো পারছি না। কেউ কেউ কটাক্ষ করে বললেন, নোবেল পুরস্কার ঘোষিত হওয়ার পর-পর বাংলাদেশের অনেককে দেখা যায়, যেন আগে থেকেই তার সম্পর্কে জানতেন। এই কটাক্ষ থেকে বোঝা যায়, তারা যাকে পুরস্কার পাবেন বলে প্রত্যাশা করেছিলেন, তিনি পাননি। তাদের পঠন-পাঠনের কথা বাদই দিলাম, জানাশোনার পরিধিও যে কম, সেটা বোঝা যায়। এ যুগে অন্তর্জালের সূত্রে কে পুরস্কার পেতে পারেন, সেটা জানা খুব কঠিন নয়। একটু অনুসন্ধান করলেই জানা যায়। কিন্তু না, এই পরিশ্রমটুকু কেউ করেন না। শুধু নিজে যাকে ভাবছেন পেতে পারেন তার বাইরে অন্য কিছু ভাবতে পারেন না। কিন্তু সাহিত্য তো নির্দিষ্ট কোনো দেশের নির্দিষ্টসংখ্যক পাঠকের ভাবনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিশ্ব পরিমণ্ডলে ছড়িয়ে যায়। সেদিক থেকে ক্রাসনাহোরকাই যে এবার পুরস্কার পেলেন, সেটা আকস্মিক ছিল না। এটা ঠিক, কখনো কখনো সুইডিস অ্যাকাডেমি এমন কাউকে পুরস্কার দিয়ে দেন, যার পরিচিতি বা বিশ্বজুড়ে পাঠকের সংখ্যা, খুবই কম। কিন্তু এবার তা ঘটেনি। পুরস্কার ঘোষণার আগে বেশ জোরেশোরেই বলা হচ্ছিল ক্রাসনাহোরকাইয়ের ভাগ্যের শিকে ছিঁড়তে পারে। যা-ই হোক, এবার এই লেখক সম্পর্কে কিছু কথা বলি।

লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ে প্রথম উপন্যাস সাতানট্যাঙ্গো। ১৯৮৫ সালে হাঙ্গেরীয় ভাষায় প্রকাশিত উপন্যাসটি ইংরেজিতে অনুবাদ করে কবি জর্জ সির্তেসের ২০১২ সালে নিউ ডাইরেক্টশনস্ প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশ করেন। ক্রাসনাহোরকাইয়ের ইংরেজিতে অনূদিত অন্য চারটি উপন্যাস হচ্ছে ‘মেলানকলি অব রেজিট্যান্স’, ‘ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার’, ‘সেইয়োবো দেয়ার বিলো’ এবং ‘ব্যারন হেনখেইমস্ হোমকামিং’।
 
সাতানট্যাঙ্গোর গল্পটা এ রকম। একটি মৃতপ্রায় গ্রাম বা এস্টেট। কয়েক দিন ধরে প্রবল বর্ষণ হচ্ছে। স্থানীয় একটা কারখানা পরিত্যক্ত জমির ওপর স্থাপিত, সেখানে কোনো কাজ হচ্ছে না। পশুরা ঘর ও বস্তাবন্দি। এখানকার মানুষ ভ্রষ্টতা, প্রতারণা, যৌন যথেচ্ছাচারে লিপ্ত। মাতলামি আর যৌনবৃত্তি হচ্ছে সময় কাটানোর উপায়। তবু তারা কোনো কিছুর অপেক্ষা করে; হয়তো সেই অপেক্ষার অবসান হবে, নয় তো হবে শুরু। প্রথম বাক্যের অনবদ্য গদ্যে উন্মোচন ঘটে এ কাহিনির। সেই সঙ্গে চরিত্রগুলোর ভবিষ্যতের অন্ধকার অনুভূতির সঙ্গে লড়াই করবার ইশারাও পাওয়া যায়: ‘অক্টোবরের শেষের এক সকালে, জমিটার পশ্চিম দিকের ফাটল এবং এর লবণাক্ত মাটিতে নির্মমভাবে দীর্ঘ শরতের বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা পড়তে শুরু করার কিছুক্ষণ আগে ঘণ্টাধ্বনি শুনে ফুটাকি ঘুম থেকে জেগে ওঠে।’ এই ঘণ্টাধ্বনি ইরিমিয়াস নামের একটা চরিত্রের পুনরুত্থানের লক্ষণ, যিনি প্রায় আঠার মাস আগে এই বিশাল এলাকা থেকে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন তাকে মৃত মনে করা হতো।

এবার সে ফিরে আসছে। এভাবেই শুরু। বোঝাই যায়, গল্পটি হয় খুব সহজ অথবা খুব জটিল। পাঠক কীভাবে পড়বেন, তার অনুভব করবার ক্ষমতার ওপর সেটা নির্ভর করবে। এই বর্ণনা রূপকধর্মী, প্রতীকের অস্পষ্ট ব্যবহার, অন্ধকার ও আলো, পরিত্রাণ ও অভিশাপের বিপ্রতীপ অনুষঙ্গ গল্পটিতে বুনে দিয়েছেন ক্রাসনাহোরকাই। একটা অধ্যায়ের শিরোনাম এ রকম: ‘স্বর্গীয় সৃষ্টি? না কি হ্যালুসিনেশন?’ বৃষ্টির পাশাপাশি ধাতব রাস্তাটি এই উপন্যাসের সবচেয়ে অস্পষ্ট রূপক। সভ্যতার সঙ্গে গল্পের যেন কোনো সংযোগ নেই। প্রায় প্রতিটি চরিত্র এলাকাটি ত্যাগ করতে চায় বলে রাস্তার কথা বলে। এই সংযুক্তির মধ্য দিয়ে তারা সময়, স্থান ও ধ্বংসকে পরিমাপ করে। ধাতব রাস্তাটি কখনো ভাঙা জমির সবচেয়ে স্থিতিশীল কাঠামো হিসেবে দেখা যায় আবার কখনো কেবল হারিয়ে যাওয়া জায়গা বলে মনে হয়। একটি দৃশ্যে, মাতাল ডাক্তার, মদ খাওয়ার জন্য শুঁড়িখানায় যাচ্ছিলেন। পথে আরেক চরিত্র তরুণ এস্টি হরগোসের সঙ্গে ধাক্কা খায়। সে অল্প সময়ের জন্য তাকে আঁকড়ে ধরে। তার বাড়িতে মানুষ নেই। মানুষের সংস্পর্শ পায় না। এ কারণেই এভাবে আঁকড়ে ধরার এতটা আকুতি। এর পর সে পালিয়ে যায়: ‘সে ধাতব রাস্তায় পা রেখে অন্ধকারে চিৎকার করে বলে, এস্টি! আমি তোমার ক্ষতি করব না! তুমি কী পাগল হয়ে গেছো!

 এখনি এখানে ফিরে এসো।’ কিন্তু কোনো উত্তর মেলে না। ‘ডাক্তার পেছনে ফিরে যান এবং দেখে অবাক হন যে তিনি শুঁড়িখানা থেকে অনেক দূরে সরে গেছেন। এবার তিনি শুঁড়িখানার দিকে আসতে শুরু করেন; কিন্তু কয়েক ধাপ পরেই পুরো পৃথিবী এক মুহূর্তের মধ্যে অন্ধকারে তলিয়ে যায়। তিনি অনুভব করেন, তার পা কাদায় পিছলে যাচ্ছে।’ উল্লিখিত উদ্বৃতির মতো এই উপন্যাসে ‘অন্ধকার’ শব্দটি ৭৬ বার ব্যবহৃত হয়েছে। পুরো উপন্যাসজুড়ে এই রূপকটি ছড়ানো।

ক্রাসনাহোরকাই উপন্যাসের কাহিনি ও বর্ণনায় সর্পিল রীতি অনুসরণ করেছেন। এর কাহিনি তাই সরলভাবে এগোয় না। 

একবার মানবিক বিচ্ছিন্নতা বোধ থেকে সমষ্টিগত পরিচয়, আরেকবার সমষ্টি থেকে ব্যক্তিক পরিচয়ের মাধ্যমে আবর্তিত হতে থাকে। একবার আবদ্ধ আরেক বার সর্পিল হয়ে ওঠে। বিশৃঙ্খল সময়ের মধ্যে এবং বাইরে, উন্মাদ এবং সম্পূর্ণরূপে ক্লান্ত, এভাবে এগোতে এগোতে এক জায়গায় এসে স্থির হয়। এই যে অগ্রসর হওয়া এবং পিছিয়ে পড়া, ক্রাসনাহোরকাই এভাবে ব্যক্তিক ও সমষ্টিগত মনোবিজ্ঞানের কথা মনে করিয়ে দেন। জাক লাকাঁ এ প্রসঙ্গে বলেছেন, এই সর্পিল ঘূর্ণায়মান রীতিটি দেখিয়ে দেয় সম্পর্কের বিষয়টি কীভাবে আন্তব্যক্তিক ও আন্তমানসিক; অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিকতার সঙ্গে ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলে। এভাবেই ক্রাসনাহোরকাইয়ের প্রথম উপন্যাসটি নানা দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এটা একটা উচ্চাভিলাষী প্রকল্প। এই উচ্চাভিলাষী অন্বেষণ ঘটেছে পুনরুত্থিত চরিত্র ইরিমিয়াসের মাধ্যমে; যে ত্রাণকর্তা ও শয়তান। সে এমন একটা ভাষণ দেয় যা পুরো সম্প্রদায়কে আশার আলো দেখিয়ে একত্রিত করে। উপন্যাসের এই অংশে আবার ফ্রয়েডীয় দলগত মনস্তত্ত্বের প্রকাশ দেখি আমরা: ‘পরিস্থিতি অনুসারে, একটি গোষ্ঠী যে আবেগগুলি মেনে চলে তা উদার বা নিষ্ঠুর হতে পারে, কিন্তু সেগুলো সর্বদাই এতটা কর্তৃত্বপূর্ণ থাকে যে, তাতে কেউ ব্যক্তিস্বার্থ, এমনকি আত্ম-সংরক্ষণের স্বার্থও কেউ অনুভব করতে পারেন না।’

এই উপন্যাসে এস্তি চরিত্রের মৃত্যু এবং ইরিমিয়াসের বক্তৃতা বাসিন্দাদের একত্রিত করেছে এবং বিশেষ ধরনের গোষ্ঠী-মনস্তত্ত্ব এতে স্থান করে নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ ‘ছোট্ট শিশু’, যে ইরিমিয়াস এবং তার সহকর্মী পেত্রিনার সঙ্গে যোগ দেয়, সেও বুঝতে পারে তাকে গ্রহণযোগ্যতা পেতে হলে ব্যক্তিগত পরিচয় ত্যাগ করতে হবে এবং ‘প্রভু’কে অনুকরণ করতে হবে: ‘এটা তার কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট ছিল যে, তার নিজের সেরা বিকল্প ছিল প্রতিটি ছোট ছোট বিষয়ে ইরিমিয়াসকে বিশ্বস্ততার সঙ্গে অনুকরণ করা। কারণ এভাবে চললে সে নিশ্চিত ছিল, কোনো খারাপ চমকের মুখোমুখি তাকে হতে হবে না।’

উপন্যাসের পরিসরে দেখা যায়, শুঁড়িখানায় কখনো মাকড়সা জাল বিস্তার করেনি। বিষয়টি এমন যে, শুঁড়িখানার ওয়েটার মাকড়সাদের দিকে তাকিয়ে আছে আর মাকড়সারা তাই দেখা দিচ্ছে না, অপেক্ষায় থাকবে। এই উপন্যাসের সমস্ত চরিত্র ফুটাকি থেকে সুন্দরী ও অবিশ্বস্ত মিসেস স্মিট, ড্রাইভার থেকে অতি ধর্মপ্রাণ মিসেস হ্যালিক্স সবাই অপেক্ষা করছে। সেই অপেক্ষা একটা কিছু ঘটার। তাদের সবাইকে সে যেমন ধ্বংস করছে, তেমনি সে ত্রাণকর্তা। কিন্তু ক্রাসনাহোরকাই যেভাবে গল্প বলেন সেই গদ্যের ভঙ্গিটা সাধারণ নয়, সর্পিলভাবে অগ্রসর হয়।
 
এই উপন্যাসে একটা মাতাল নৃত্য আছে। সেটি হলো ট্যাঙ্গো, ক্রাসনাহোরকাই যাকে শয়তানি নাচ বলে আখ্যায়িত করেছেন। উপন্যাসটি লিখেছেনও এই নামে। বিশেষভাবে লক্ষ্য করার বিষয় হচ্ছে, এই নাচটি উপন্যাসের গদ্যের বর্ণনাকে বিশেষ কাঠামো দিয়েছে। এর গদ্যে যে সর্পিলতা বা ঘূর্ণয়মান ভঙ্গি দেখা যায়, তা এই নৃত্যের আবহে প্রভাবিত। এই নৃত্যের জায়গাতেই সম্প্রদায়ের মানুষ একত্রিত হয়, এস্তির মৃত্যু আর ইরিমিয়াসের প্রত্যাবর্তনের ট্রমা অনুভব করার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। এই আখ্যানের দ্বিতীয়ার্ধে অগ্র-পশ্চাৎ সর্পিলতার সঙ্গে ব্যক্তিক বিচ্ছিন্নতা এবং বিচ্ছিন্নতার পূর্ববর্তী অবস্থায় বেশ কিছু চরিত্রকে ফিরে যেতে দেখি। নৃত্যটি অন্ধকারের কৌতুক এবং পঙ্গু উদ্বেগের অনুভূতির বিমিশ্রণকে মূর্ত। একই সঙ্গে তা উদযাপন ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, আশাবাদ ও হতাশাকে তুলে ধরেছে। নাচটি আসলে একটা বিন্দু, যার আগে ছটি পর্ব এবং সেই পর্বগুলো আবার পুনরাবৃত্ত হয় পরবর্তী ছয় পর্বে। এর মধ্য দিয়েই বন্যতা, বিচার এবং মানবজাতির পরিণামটি লক্ষণীয় হয়ে ওঠে।

ইরিমিয়াস মানবিক এই সংকটের জন্য সবাইকে অভিযুক্ত করে আবার করেও না: ‘আমি নির্দিষ্টভাবে কোনো ব্যক্তিকে কোনো কিছুর জন্য দোষারোপ করছি না এবং তবুও... আমি আপনাদের এই প্রশ্নটি করতে চাই: আমরা সবাই কী দোষী নই? এই পর্বেই সম্মিলিতভাবে মানুষের দায়ী থাকার কথা উচ্চারিত হলো অথবা অস্বীকৃত হলো। এখানে এসেই উপন্যাসটি ন্যারেটিভের এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছায় যে, পরিস্থিতিকে বেকেটীয় অথবা কাফকায়েস্ক বলে মনে হতে পারে। উপন্যাসের ভাষা ও শব্দকে ক্রাসনাহোরকাই গলিয়ে দিয়ে একটা শব্দের সঙ্গে আরেকটা শব্দকে মিশিয়ে দিয়েছেন এভাবে: ‘এটাসকালছিলনাসন্ধ্যাছিলনাকেবলবহনকরাহয়েছিলগোধূলিরআলোএরকম
কিছু...’

শব্দগুলোকে বিচ্ছিন্ন করলে কথাগুলো দাঁড়ায় এ রকম: ‘এটা সকাল ছিল না, সন্ধ্যা ছিল না, কেবল বহন করা হয়েছিল গোধূলির আলো- এ রকম কিছু...’

সম্প্রদায়গত আত্মসংরক্ষণের বিষয়টি এই উপন্যাসে খোলামেলা নগ্ন ইচ্ছার কারণে গুরুত্বহীন হয়ে গেছে। এর প্রায় প্রতিটি চরিত্রই স্বার্থপর ও লোভী। গোষ্ঠীর সম্মিলিত বোধ আর নিঃসঙ্গতার টানাপোড়েন এখানে স্পষ্ট। তবে ব্যক্তিমানুষ এখানে যেন নরকবাস করে। সমাজতন্ত্রের শিকলে তারা এক অর্থে বন্দি। কিন্তু সমাধান কী? এ সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। মুক্তি পেয়েছে ভাবা যেতে পারে, আবার নাও পেতে পারে। আখ্যানের এই অস্পষ্টতা কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে দেয় না। উপন্যাসটির সুনির্দিষ্ট অর্থপূর্ণ পাঠ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। পাঠক শেষে পৌঁছান হতবুদ্ধিকর এক অবস্থায়

ক্রাসনাহোরকাইয়ের ভাষা ও শৈলীর কথাটা এখানে বিশেষভাবে বলা দরকার। তিনি দীর্ঘ বাক্য লেখেন। কমা বা সেমিকোলন ব্যবহার করে এই দীর্ঘ বাক্য রচনা করেন তিনি। তিনি মনে করেন, উপন্যাসে ব্যবহৃত ভাষা হওয়া উচিত মুখের ভাষা। আর মুখের সহজাত ভাষাভঙ্গিতে পূর্ণ যতি থাকে না। লেখাতেও তাই, বিশেষ করে উপন্যাসের বাক্য পূর্ণযতিহীন হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। তিনি লেখেনও সেইভাবে। আমি তার কয়েকটি বইয়ের বাক্যগুলো পড়ে দেখেছি। সেই বাক্যগুলো পড়ার জন্য নয়, বলার জন্য। কথিত ভাষা বলে তিনি অনেক দীর্ঘ বাক্য লেখেন। এক-একটা বাক্য প্রায় এক পৃষ্ঠাজুড়ে লিখেছেন ক্রাসনাহোরকাই। এই ভাষা বোধের দিক থেকে দুর্বোধ্য নয়, তবে অভিনব নিঃসন্দেহ। তবে আখ্যান অনির্দেশ্য থাকে, ফলে অনেকটা ছোটগল্পের মতো নানা অর্থ করা যায়। তার অন্য উপন্যাসগুলো পড়লে অবশ্য তার ভাষারীতি ও আখ্যান প্রকাশের ভঙ্গিটা বোঝা যাবে। ততদিন পর্যন্ত পাঠক হিসেবে আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে।

বই পরিচিতি মাস্টার বাড়ি

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০২:৫১ পিএম
মাস্টার বাড়ি
বই

মাস্টার বাড়ি

এস. আকরাম হোসেন

শ্রেণি: উপন্যাস

প্রকাশনী: খান প্রকাশনী

প্রকাশকাল: ২০২৫

পৃষ্ঠা: ১৫০, মূল্য: ২৫০ টাকা

এস. আকরাম হোসেন বিখ্যাত কথাশিল্পী আকবর হোসেনের গ্রামের সন্তান গ্রামে বিখ্যাত অনেক মনীষীর জন্ম বিপ্লবী বাঘা যতীন, সাহিত্যিক ললিতকুমার চট্টোপাধ্যায়, কবি শরৎশশী দেবী, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক . আজিজুল ইসলাম- গ্রামের নক্ষত্র সন্তান অভিনেতা-কবি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পৈত্রিক বাড়ি এখানে এস. আকরাম হোসেনের জন্মভাগ্য ঈর্ষণীয় -গ্রামে জন্মে এস. আকরাম হোসেন লেখক হয়ে-উঠবেন এটাই স্বাভাবিক তিনি কবিতা-গল্প-উপন্যাস লেখেন মুক্তকলাম লেখেন তাঁর লেখাতে দেশভাবনা-সমাজ-সমকাল-অর্থনৈতিক অবস্থা-প্রেম-প্রণয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ সমাজের নানান অসংগতি তিনি তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করেন এবং তা সাহিত্যগুণ সমৃদ্ধতায় উপস্থাপন করেন তাঁর ভাষা প্রয়োগের দক্ষতা ঈর্ষণীয় তাঁর উপন্যাসমাস্টার বাড়িপ্রকাশিত হয়েছে এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দদায়ক -উপন্যাসের বিষয়বস্তু-চরিত্র নির্মাণ-সংলাপ- আর্থ-সমাজচিত্র-লেখকের চিন্তা-দর্শন, সর্বোপরি শিল্পমান পাঠকমনে বিশেষ আগ্রহ তৈরি করবে এবং ভাবাবে পাঠককে মুগ্ধ-আবেশে ধরে রাখার শক্তি আছে বিশেষ করে ভাষাপ্রয়োগের কৌশলে তিনি মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেনমাস্টার বাড়িহৃদয়গ্রাহী সুখপাঠ্য গ্রন্থ হিসেবে পাঠকমনে সহজেই নিজস্ব জায়গা করে নিতে সক্ষম হবে-বিশ্বাস করি কুষ্টিয়ার কুমারখালীর গ্রামীণজীবনের নানামাত্রিক সামাজিক সমস্যা উপন্যাসটির বিষয়বস্তু গ্রামাঞ্চলে বর্তমানে সুদের ব্যবসা সংক্রামক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে সুদেও কবলে পড়ে বহু মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়ছে এসব থেকে গ্রামাঞ্চলের মানুষকে মুক্ত করে সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য উপন্যাসের নায়ক জিহাদ অক্লান্ত পরিশ্রম করছে এলাকায় সুদের ব্যবসা যারা করে তারা মূলত অসহায় মানুষদের সুদের ফাঁদে ফেলে তাদের রক্ত চুষের নেয় সুদগ্রহণকারী এসব মানুষ সুদেও চক্রাহারে ক্রমশ জীবনী শক্তি হারিয়ে ফেলে গ্রন্থটিতে শুধু সমস্যা তুলে ধরেনি, সমস্যার সমাধানও লেখক তুলে ধরেছেন সেসঙ্গে গ্রামীণ জীবনে প্রেম বিরহ যেমন আছে তেমনি দেশপ্রেমের চিত্র ফুটে উঠেছে এস. আকরাম হোসেনেরমাস্টার বাড়িনিখাদভাবে দেখা অসম্ভবরকমের খাঁটি একটি উপন্যাস আপনাকে অসম্ভব চুম্বক-আকর্ষণে ধরে রাখার অসামান্য শক্তি রয়েছে বইটির পরতে পরতে সহজ সরল ভাষায় সমাজজীবনের অসামান্য বুনন- ‘মাস্টার বাড়িউপন্যাস

বই পরিচিতি কৃষি শব্দকোষ

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০২:৪৪ পিএম
কৃষি শব্দকোষ
বই

কৃষি শব্দকোষ

মৃত্যুঞ্জয় রায়

শ্রেণি: ইংরেজি-বাংলা অভিধান

প্রকাশনী: ঐশ্বর্য প্রকাশ

প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ২০২১

পৃষ্ঠা: ৫০৩, মূল্য: ৯৫০ টাকা

 

পড়তাম ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ইংরাজী ভাষায় কৃষির মতো একটি মাটিময় কাঁচা ফসলের গন্ধমাখা বিষয়গুলো পড়তে গিয়ে কেমন যেন নিরস লাগত, দুর্বোধ্যও কৃষি পড়ে তো মূলত কৃষকদেরই পরামর্শ দিতে হবে, শিক্ষক গবেষক হবে আর কজন? সেজন্য কৃষির মতো একটা বিষয় ইংরাজীতে পড়ার ছিলাম ঘোর বিরোধী কিন্তু না পড়েই তো উপায় ছিল না শিক্ষকরা তো বাংলায় পড়ান না শেষে বাংলায় নোট করা আমিই শুরু করলাম সাথে পেলাম অনেক সুহৃদ বন্ধুদের চাকরি জীবনে এসে ভেবেছিলাম কৃষির পড়াশুনাটা বোধহয় বাংলাতেই চলছে কিন্তু আমার সে ভাবনায় ভুল ছিল আবার কৃষি ইংরাজীতে ফেরত গেছে বাংলা কি দীনহীনের ভাষা? কেবল চাষাভূষার বুলি? এসব কথা ভাবলেই মনটা বিষন্নতায় ভরে ওঠে

উচ্চশিক্ষায় এত বছর পরও কেন আমরা মধুর মতো বাংলা ভাষায় পড়তে পারছি না! পাশ করার পর তাই যা হওয়ার তাই হচ্ছে মুখস্থ বিদ্যায় আর কতটুকু কেদ্দারী করা যায়? ফলে অনেকের পেশাগত দক্ষতার অভাব ঘটছে অনেকটা তাড়না থেকে কৃষির ছাত্রছাত্রী পেশাজীবীদের জন্য লিখলাম বই এটি চাকুরিকালীন সময়ে করা সম্ভব ছিল না বিধায় মনে মনে ভেবেছিলাম, অবসরে যাওয়ার পর কাজটি ধরব অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে পিআরএল- যাওয়ার পর চার মাসের মধ্যে এটি লিখে শেষ করি, পরের চার মাসে এটি প্রকাশিত হয় এতে কৃষি সংশ্লিষ্ট তিন হাজারের বেশি শব্দের ইংরাজী থেকে বাংলা অর্থ সে সম্পর্কে খুব সংক্ষিপ্ত বর্ণনা রয়েছে বইটি পাঠক কৃষিজীবীরা সাদরে গ্রহণ করেছেন বলে আমি আনন্দিত

বই পরিচিতি দীনেশচন্দ্র সেন ও লোককাহিনির মঞ্চ-পরিবাহন

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:৪১ পিএম
দীনেশচন্দ্র সেন ও লোককাহিনির মঞ্চ-পরিবাহন
বই

ইউসুফ হাসান অর্ক

শ্রেণি: সমকালীন লোককাহিনি

প্রকাশনী: বাংলা একাডেমি

প্রকাশকাল: এপ্রিল ২০২৫

পৃষ্ঠা: ১৬৮, মূল্য: ৪৪০ টাকা

 

বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা ঐতিহ্যবাহী নাট্যমূলক পরিবেশনার অগাধ ভাণ্ডার বিবেচনার ক্ষেত্রে আমাদের মগ্নতায় এখনো দাসত্ব ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক নন্দনতত্ত্বের দৌরাত্ম্য রয়ে গেছে সংলাপমূলক দ্বন্দ্ব দৃশ্যায়নের মাধ্যমে তথাকথিতদৃশ্যকাব্যহয়ে উঠলেই তাকে বলা যাবেবিশ্বমানের নাটকীয় কিছু হলো’- ভাবনার বাইরে গিয়ে দেশজ সম্পদের স্বকীয় ঐশ্বর্যের দ্যোতনাকে যে কয়জন মানুষ উপলব্ধি করে উদ্যোগী হয়েছিলেন তার মধ্যে দীনেশচন্দ্র সেন প্রথম সারির তারই হাত ধরে এসব ঐশ্বর্যেরনাগরিকসমাজে প্রবেশ বলা যায় নগরমঞ্চে এদের পরিবাহন সে সময় থেকেই তার পর থেকে নানা মাধ্যমে পরিবাহন প্রক্রিয়া কখনো স্তিমিত, কখনো বা জোরালো গতিতে অব্যাহত রয়েছে গত শতকের নব্বইয়ের দশক থেকে লোককাহিনিগুলো পরিবাহনের আরেকটি মাত্রা নতুন করে দৃষ্টি আকর্ষণ করে নগরকেন্দ্রিক থিয়েটার মঞ্চে কাহিনিগুলো ঐতিহ্য প্রণোদিত অথচ নতুন রীতিতে মঞ্চায়িত হতে শুরু করে লোককাহিনি পরিবাহনের পাশাপাশি অভিনয়রীতি নিরীক্ষার এক বি-ঔপনিবেশিক প্রতিভঙ্গি হিসেবে বিবেচনা করা চলে ধরনের উদ্যোগগুলোকে পাশাপাশিসাংস্কৃতিক পরিবাহন’-এর এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবেও এগুলোকে বিবেচনা করা অসমীচীন নয় তাই দীনেশচন্দ্র সেনকে প্রণতি জানিয়ে লোককাহিনি পরিবাহনের এক সমকালিক প্রবণতাকে গ্রন্থে স্বীকৃতি দেওয়া গেছে লোকজ ধারার সাহিত্য পরিবেশনায়ফুইডিটি যে উদার প্রশ্রয়, তাকে গ্রহণ করে নগরকেন্দ্রিক পরিবাহন-প্রক্রিয়া তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে গ্রন্থটিতে লোককাহিনিনির্ভর তিনটি নাট্য প্রযোজনার সমুদয় বিশ্লেষণ থেকে সমকালে লোককাহিনির পরিবাহন নিরীক্ষা বিষয়ে ধারণা অর্জন সম্ভবফোকলোর’, ‘পারফরম্যান্স স্টাডিজনাট্যকলাবিষয়ের শিক্ষার্থী গবেষকদের জন্য তো বটেই, পাশাপাশি বাংলাদেশের নগরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় সংশ্লিষ্ট অভিনেতা-নির্দেশকদের জন্যও গ্রন্থটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে

সমাজবোধ ও জীবনবীক্ষা মোস্তফা কামালের বিষাদ বসুধা

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:৩২ পিএম
মোস্তফা কামালের বিষাদ বসুধা

চতুর্থ পর্ব

মাঝে পড়ালেখার কারণে শাহবাজ খানের বিদেশ অবস্থান, তাদের মধ্যে সেই সময়ে দেখা-সাক্ষাৎ ঘটেনি। যোগাযোগও ছিল না। করোনাকালীন তাদের মধ্যে হুট করেই আবার যোগাযোগ স্থাপন হয়। শাহবাজ খান ধনীপুত্র। নিজেও পিতার শিল্পসাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে। মোহিনীও শিল্পদ্যোক্তা, ধনী ব্যবসায়ী। আরেফিনের মৃত্যুর পরে  মোহিনীর জীবনে শাহবাজ খান আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠার চেষ্টা করে। কিন্তু মোহিনী অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সুকৌশলে শাহবাজ খানের ফাঁদে পা দেননি। বন্ধুত্বের সীমা লঙ্ঘন করেননি। করতেও দেননি। আরেফিন মৃত্যুবরণ করলেও মোহিনীর মস্তিষ্কের কোষে কোষে বেঁচে আছে আরেফিন। তার সঙ্গে যাপিত অসংখ্য স্মৃতি মোহিনী নিজের ভেতর লালন করেন। আরেফিন না থেকেও পুরো আরেফিনই তার জীবনে জীবন্ত হয়ে আছে। সেখান থেকে মোহিনীর মুক্তি ঘটেনি, মুক্তি ঘটাতে চানওনি। মোহিনীর ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা ও সততা তার চরিত্রকে উচ্চমার্গের করেছে। শাহবাজ খানের সঙ্গে তার বন্ধুত্বের কোনো ঘাটতি ছিল না। কিন্তু যখন তিনি জানলেন শাহবাজ খানের সঙ্গে রুবিনা নাম্মী এক কলেজছাত্রীর অনৈতিক সম্পর্ক ছিল। রুবিনাকে গুলশানে নিজে বাসা ভাড়া করে রাখতেন। রক্ষিতার মতো। অনেকটা ‘কৃষ্ণকান্তের উইলে’র জমিদার গোবিন্দলাল আর রোহিনীর অবস্থা। গোবিন্দলাল রোহিনাকে বিয়ের আশ্বাসে রক্ষিতা করে রেখেছিল এবং শেষে বিয়ে তো করেইনি, গুলি করে হত্যা করেছিল। রুবিনার ক্ষেত্রেও অনুরূপ ঘটনাই ঘটেছে। একালের ‘জমিদার’ শাহবাজ খান বিয়ের আশ্বাসে রুবিনাকে রক্ষিতা করে রেখেছিল এবং শেষে হত্যা করেছে। রুবিনার মনে রোহিনীর মতোই আশা ছিল স্বপ্ন ছিল শাহবাজ খান তাকে বিয়ে করবে, তার সংসার হবে, সন্তান হবে। কিন্তু শাহবাজ খান ছিলেন পুরোটাই ভোগবাদী মানসিকতাসম্পন্ন। সে কারণে একপর্যায়ে রুবিনাকে হত্যা করে সে। রুবিনা তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিল। অর্থাৎ ভ্রুণসহ হত্যার শিকার হয় রুবিনা। এটা মোহিনী জানার সঙ্গে সঙ্গে নিজের অফিসে জানিয়ে দেন, শাহবাজ খান যেন তার অফিসে কখনোই আসতে না পারে। তার জন্য এ অফিস নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। মোহিনীর চারিত্রিক দৃঢ়তা ও ব্যক্তিত্ব মুগ্ধ করে। কারণ তিনি রুবিনার বিষয় নিয়ে শাহবাজ খানের সঙ্গে কোনো কথা বলা বা আলোচনা করারই প্রয়োজন মনে করেননি। এরকম একজন নষ্টকীটের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব থাকতে পারে না, কোনোরকম আর যোগাযোগ হতে পারে না। তিনি মুহূর্তেই মানসিক দৃঢ়তা, সততা ও আদর্শে এরকম কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পেরেছেন। অথচ শাহবাজ খানের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছোটবেলা থেকে। শাহবাজ খান তাকে বিয়ে করে নতুন জীবন শুরুর কথা সরাসরি বলেছে। যা বিনয়ের সঙ্গে মোহিনী প্রতিবারই প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু বন্ধুত্বের জায়গাটি তো তাদের মধ্যে ছিল। শাহবাজ খানের রুবিনা হত্যার মতো জঘন্য ঘটনা জানার পরই তিনি মুহূর্তেই তার জীবন থেকে শাহবাজ খানকে উপড়ে তুলে ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন। চারিত্রিক দৃঢ়তা ও ব্যক্তিত্ব কতটা শক্তিশালী হলে মুহূর্তেই দীর্ঘদিনের বন্ধুকে এভাবে ছুড়ে ফেলতে পারা যায়, তা সহজেই অনুমিত হতে পারে। এখানে শাহবাজ খানের অর্থ-ক্ষমতা-বন্ধুত্ব কোনো কিছুই মুহূর্তের জন্যও মোহিনীকে ভাবাতে পারেনি। মোহিনী এমনই এক নির্লোভ, নির্মোহ, সত্যের ও আদর্শের ধারক হয়ে ওঠেন।

মোহিনীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু আসিফ আহমেদ। প্রখ্যাত সাংবাদিক তিনি। মোহিনীর আসিফ আহমেদের প্রতি প্রচ্ছন্নভাবে মানসিক দুর্বলতা থাকলেও কখনো তা প্রকাশ করেননি। বন্ধুত্বকে অতিক্রম করে অন্য কোনো সম্পর্কে আগাননি। আসিফ আহমেদকে তিনি বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করার কথা বলেছেন। তার পাশে সহযোগিতার হাত বাড়াতে চয়েছেন। এমনকি আসিফ আহমেদকে মাথায় রেখেই পত্রিকা প্রকাশনার কথাও ভেবেছেন। আসিফ আহমেদ তাকে না জনিয়ে অনলাইন পত্রিকা ‘ঢাকাপ্রকাশ’ করলে মোহিনীর কণ্ঠে অভিমান ও অনুযোগের প্রকাশ ঘটেছে। বন্ধুত্বের প্রতি তার যে সম্মান ও দায়িত্ববোধ তা অসাধারণ। আসিফ আহমেদ বন্ধুত্বের সীমানা কখনোই অতিক্রম করেননি। তার শান্ত-স্নিগ্ধ কিন্তু ইস্পাত কঠিন ব্যক্তিত্ব ও আত্মসম্মানবোধ মোহিনীকে সবসময়ই মুগ্ধ করেছে। বন্ধু হয়েও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, আত্মসস্মানবোধ এবং হৃদয়গত উপলব্ধি- মোহিনী চরিত্রে অপূর্ব সুঘ্রাণ তৈরি করেছে। আরেফিনের দরিদ্র পরিবারের প্রতি তার যে দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ তা বাঙালি নারীর চিরকালীন যে ব্যক্তিক-সৌন্দর্য ও দায়িত্ববোধ তা চমৎকারভাবে লেখক তুলির আঁচড়ের মতো কয়েকটা টানেই জীবন্ত করে এঁকেছেন। আরেফিনের বাবা আলী আকবর যখন অফিসে এসে মোহিনীকে না পেয়ে ফিরে গেছেন, রেখে গেছেন অসহায় আকুতিভরা পত্র, সেই পত্র পড়ে মোহিনীর ভেতর যে মানসিক কষ্ট-যন্ত্রণা হয়েছে, নিজের ভেতর বেদনার্ত আর্তনাদ হয়েছে, মানসিক কষ্টে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। অফিসের কর্মকর্তার প্রতি তার এ বিষয়ে নির্মোহ আচরণ এবং দ্রুত দ্বিগুণ পরিমাণে টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন। এর ভেতর দিয়ে মানবিক ও দায়িত্বশীল মোহিনীকে পাই। বাঙালির নারীর জীবনে স্বামী-পরিবার যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা মোহিনী চরিত্রে পরিলক্ষিত হয়। তিনি ধনীকন্যা। নিজেও ধনী শিল্পোদ্যোক্তা। স্বামী মৃত। নিজে কখনো শ্বশুরবাড়ি যাননি। তিনি অনায়াসে এসব এড়িয়ে চলতে পারতেন। তিনি তা করেননি। বরং আরেফিনের মৃত্যুর পর থেকেই তার পরিবারের দায়িত্ব বহন করছেন। তিনি জানেন আরেফিনের টাকাতেই সংসার চলত। আরেফিনের মৃত্যুতে পরিবারটা অসহায়। তাই তিনি নিজেই বাড়ির যেন পুত্রবধূ নয়, নিজেই সংসারের দায়িত্ব পালনে আরেফিন হয়ে ওঠেন। মোহিনী যেন ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র প্রমীলাকেই মনে করিয়ে দেয়। স্বামী মেঘনাদ যখন বিপদগ্রস্ত তখন তিনি চুপ থাকতে পারেননি। তিনি মুহূর্তেই যুদ্ধসাজে তৈরি হয়ে স্বামী মেঘনাদকে উদ্ধারের জন্য ছুটে গেছেন। মোহিনীর প্রেক্ষিত ভিন্ন। কিন্তু দায়িত্বের জায়গা অনেকখানিই এক। বিশেষ করে বাঙালি নারীর কাছে স্বামীর পরিবার বিপদগ্রস্ত হওয়া মানে সে বিপদ তার নিজেরই। সেখানে তার হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার উপায় নেই। শ্বশুরবাড়ির প্রতি বাঙালি নারীর হৃদয়সত্য ও দায়িত্ববোধে মোহিনী চরিত্র অসামান্য হয়ে উঠেছে।

মোহিনী দেড় বছরের ব্যবধানে বাবা মোহসীন আহমেদ ও মা আনোয়ারা বেগমকে হারিয়ে দিশেহারা। বাবা মৃত্যুর আগে স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ও কন্যা মোহিনীর সঙ্গে আলোচনা করে ‘আনোয়ারা-মোহসীন ট্রাস্ট’ গঠন করেন। মোহিনী সে ট্রাস্টের প্রধান। নিজের কোম্পানিও ট্রাস্টের অন্তর্ভুক্ত করেন। যাতে তাদের মৃত্যুর পরে কোম্পানিগুলো কোনো সমস্যার শিকার না হয়ে স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে। ট্রাস্ট থেকে মানবকল্যাণমূলক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। হাসপাতাল থেকে শুরু করে প্রকাশনাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। করোনায় বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে সাহায্য নিয়ে দাঁড়ানোর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেন। কারণ তিনি জানেন মৃত্যু অবধারিত। আরেফিন ও বাবা-মায়ের মতো একদিন তাকেও চলে যেতে হবে। সে কারণে উপার্জিত অর্থ মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। ব্যক্তি মোহিনী নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেননি। ভেবেছেন দেশের অসহায় মানুষের কথা। নিজেকে নিজেই অতিক্রম করার অসাধারণ চরিত্র মোহিনী।

উপন্যাসের মোহিনীর গুরুত্ব বিবেচনা করে যে বিষয়টি ভাবনায় আসে তা হলো, প্রধান চরিত্র মোহিনী হওয়া সত্ত্বেও কিছু অধ্যায়ে মোহিনীবাদেই স্বতন্ত্র গতিতে এগিয়েছে।   

চলবে...

গল্প সুন্দর পুরুষ

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১১:৫৬ এএম
সুন্দর পুরুষ
অলংকরণ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

‘অ, মাও, শ্মশান থুইয়া..’
সত্যিই এবার বিগড়ে যায় মীনাক্ষীর গলা, মেয়ের প্রতি চেঁচিয়ে ওঠে, ‘ওই মাইয়া, মড়া আছে শ্মশানে? বইয়া থাহুম।’
‘মনে অয় দ্যাশে মড়া কইমা গেছে।’ কথা শেষ করে হাসে সপ্তদশী মেয়ে শচী। অপ্রয়োজনীয় হাসি। এমন হাসির কোনো অর্থ খুঁজে না পেয়ে মীনাক্ষীর রাগ হয়, ‘এ্যাই মাইয়া হাসনের কী হইল? রূপ খুলতাছে তর। মাইয়া, ঐ রূপের বড়াই তর বাপেও করতো।’ 
চুপ মারে রূপবতী শচী। শ্মশান ঘাটের পাশেই অপেক্ষায় ছিল মা আর মেয়ে। জগৎসংসারে মা ছাড়া কেউ নেই ওর। মাকে কষ্ট দেওয়া কী ঠিক! প্রশ্ন জাগে। নিস্তেজ গাং ধরে তাকায়। মনে মনে ভাবে একজন পুরুষকে তো মন দেওয়া হয়ে গেছে। তাকে মা কী মেনে নেবে–এমন প্রশ্নও শচীকে ভাবায়। চৈত্রেরকাল বলে গরমটা খুব তেজি ছিল। কিন্তু হঠাৎ ফুরফুরে হাওয়া আর মরারোদে আদুরে আদুরে হয়ে উঠল সেই রৌদ্রতেজ। এখানেই বাড়িঘর, ঠিকানা। বেড়ে উঠেছে মীনাক্ষীর একমাত্র মেয়ে শচীও। 
শবদেহ এলে শ্মশানপুরোহিতের ডাক পড়ে। শাস্ত্রীয় বিধান দেওয়া হয়। ভোর-সকালে এ বাড়িতে একটা চক্কর দেওয়া নিয়ম যেন তার। কখনো কখনো খবর দিতে হয়, রামচন্দ্র পুরোহিত আসেন, শাস্ত্রীয় আচারপালিত হয়। এরপর মৃতের সৎকার। নানা কাজকর্ম শেষে অর্থকড়ি মেলে। এদিয়েই সংসার চলে মীনাক্ষী আর শচীর। সপ্তাহ দুয়েক ধরে শবদেহ কম আসছে। আয়রুজি কম। ঘরে চাল-তেল নেই।
‘এমুনডা হইতাছে কী কারণে?’ পুরোহিত রামচন্দ্রের কাছে হেতু জানতে চেয়েছিল মীনাক্ষী। সঠিক জবাব নদিতে পারেননি উঠানে জলচৌকিতে বসা রামচন্দ্র। বিড়ি টানেন আর ধোঁয়া ছাড়েন ওপরের দিকে।
প্রসঙ্গ পাল্টায় মীনাক্ষী। পেছনের পাড়ায় রামচন্দ্রের ঘর। তার একমাত্র সন্তান অনন্ত। সবাই ডাকে ছোট ঠাকুর। অনন্তের ব্যাপারে রামচন্দ্রকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে মীনাক্ষী বলে, ‘দিনকাল যেমুন পড়ছে। নয়া নয়া অসুখ ধরা পড়তাছে। পোলাডা য্যান সাবধানে থাহে!’
‘আমার পোলা মানুষ হয় নাই, জানোয়ার হইছে। রেপ কেইসের মামলায় হে পয়লা নম্বর আসামি। আর আমি সর্বস্বান্ত।’ একটু থামেন রামচন্দ্র। খানিকটা গর্ব তার চোখমুখে। ‘হুনো, পোলা ছিল আগুনের গোল্লা। এসএসসি-ইন্টারমিডিয়েটে জিপিএ ফাইভ পাইছিল। ইস্কুলের মাস্টরেরা কইল সার্থক জনম আমার। হে নাকি ডাক্তর- এনজিনিয়ার অইব। ওহ্, মাই, হেই পোলা ডাক্তরি পরীক্ষায় চান্স পাইল না, এনজিনিয়ারিংয়ে না। বাড়িতে আইয়া খালি কান্দে।’ আবার থামেন রামচন্দ্র। ‘বিড়িটা নিইব্যা গ্যাছে। গ্যাসলাইট লগে নাই? দিয়াশলাই আছে?’
ঘর থেকে গ্যাসলাইটার এনে হাতে দেয় মীনাক্ষী। রামচন্দ্র বিড়ি ধরিয়ে বললেন, ‘পোলারে হ্যাসকালে কইলাম, ঢাকায় ভর্তি হ। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়। ভার্সিটি থেইকা পাস দিলেও দাম আছে। এহনতো কলেজ-ভার্সিটি বন্ধ। পোলার কামাই খাইমু এমন আশা আর করি না।’ সরল-স্বীকারোক্তির পরে সাবধান-সতর্ক করে রামচন্দ্র বললেন, ‘কিছুদিন থেইকা নাকি তোমার বাড়ি আসতেছে। সাবধানে থাইকো।’
“হ আসে। পোলাডা বিষ্ণুর মতো চেহারা, কতো সুন্দর। আর কী য্যান সুন্দর গানের গলা। ‘প্রিয়তমা’ সিনেমার গান গাইল। মিডা গলা। সুন্দর ভাষায় কথা কয়। সিনেমার নায়কের মতন ভাষা। আমার মাইয়া শচীর লগে কথা কয়। ম্যালা কথা কয়।” তৃপ্তিমাখা কণ্ঠ মীনাক্ষীর।
‘কী অত কথা?’ উত্তরের জন্য নারীমুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন রামচন্দ্র। 
‘যাই কন, পোলা নাই আমার। আমি বুজি। পোলা অইল বংশের খুডা। মরতে অইবো না! মুখে আগুন দিবো ক্যাডা? মুখাগ্নি করব ক্যাডা?’ 
রামচন্দ্র চলে গেলে স্নানে আসার পর থেকেই আজ সাম্প্রতিক স্মৃতিকথা মনে উদয় হচ্ছিল মীনাক্ষীর। নদীর জলে গলা পর্যন্ত ডুবে আছে ও। কানে বেজে উঠল স্বামীর আরও নানা কথা। মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে বলত, ‘কেমুন সুর্মাটানা তুমার চক্ষু, অতো সৌন্দর্য ক্যান তুমার মুখে।’ কী উন্মাদনা ছিল স্বামীর। মায়ার মানুষ ছিল, আদরমাখা গলা। হঠাৎ মরে গেল। চিতাতে রাখা শবদেহে আগুন ধরাতে ধরাতে মরে গেল স্বামী। লোকে বলল, ‘অ্যাতো মদ গিলেছে যে, মাগনা মদে মরেছে।’ ডাক্তার বলল, ‘হার্ট অ্যাটাকে।’ সবগুলো শব্দ একে একে মনে পড়ল মীনাক্ষীর। ‘তোমার সুয়ামি মদে মরেছে।’ কেউ যেন তাকে কানে কানে বলে যাচ্ছে এসব। এরপর বিধবা হওয়ার শব্দটি আড়াল করা হয়। রামচন্দ্রের পরামর্শ ছিল, শাঁখ না ফেলার, সিঁদুর না মোছার। মানুষ নানাকথা বলবে, শ্মশানে বিধবাদের কর্ম তো হতেই পারে না। মৃত্যু মানুষের হবেই, সকলেরই। আত্মা ও অন্তর পরিষ্কার রাখলেই অন্তরাত্মা পবিত্র। সেখানেই ঈশ্বর, প্রভু। তুমি চাইলে তুমিও সৃষ্টিকর্তাকে পাবে। মানুষকে তুমি তুষ্ট করলেই স্বয়ং প্রভু তুষ্ট। আত্মা খুশি তো জগৎখুশি। রামচন্দ্রের বিচক্ষণতা তাকে আস্থাশীল করে তোলে, কখনো বা মনে হয় এই লোকটিই তীর্থস্থানের পূজারি। 
দাঁড়িয়ে থাকা মেয়ে শচীর দিকে একপলক তাকিয়ে ফের মাথা ভেজাতে শ্মশান ঘাটে আরও কয়েকটি ডুব দেয় মীনাক্ষী। শরীর ভেজা তবু পানি ছিটাবে। টলটল পানি নদীতে, স্বচ্ছ কালো জল যেন। নিজের হৃষ্টপুষ্ট শরীর দেখে। বুক সামলাতে কাপড় টানে। দেহ নিয়ে কল্পনা করাও পাপকর্ম। এরপর সূর্যের দিকে তাকায়। নিরুত্তাপ সূর্য। বেলা গড়িয়ে বিকেল কিনা। 
উপশহর এলাকায় থিতু হয়ে থাকা শ্মশান ঘাটের অদূরের বাড়িটিতেই জীবনের বড় সময় ধরে আছে মীনাক্ষী। বিয়ের পর কত কিছু বদলে গেছে এখানকার। আগে ছিল নদী। এখন মাটি ভরে ভরে নদীভরাট হয়ে শুকিয়েছে। দূরের দিকে ছোটখাটো খাল। পাশে থাকা কচুরিপানা ভর্তি খালটার এখন অস্তিত্ব নেই। আর দখলবাজদের অত্যাচারে স্রোতধারা নদী হয়েছে সরু। নাম জানা না জানা সারসার গাছ ছিল পাড় ঘেঁষে। এসবের কিছু আছে তবে বড়গাছগুলো রাতের অন্ধকারে অনেকদিন আগেই কেউ কেটে নিয়ে গেছে। হিন্দুদের শ্মশানের জায়গা দখল হয়ে কাঠচিড়াইয়ের কারখানা। জমজমাট দোকান আনোয়ার টি স্টল লেখা। খানিকটা দূরে হোমিওপ্যাথির দাওয়াইয়ের দোকান ছিল, এটি এখন হয়েছে অ্যালোপ্যাথিক ওষুধের দোকান।
আকারে ছোট হয়ে আসছে শ্মশান। বিয়ের সাড়ে ১৮ বছরে অনেক বদলে গেছে দুনিয়া। মেয়ে স্কুল বাদ দিয়েছে গত সন। মা-মেয়ের ছোট সংসার। দুশ্চিন্তা ছিল না শচীর জন্য। কিন্তু মেয়ের প্রতি সেই মুগ্ধভাবটা আর যেন নেই এখন। 
স্নান সেরে নদীর পাড়ে ওঠে মীনাক্ষী। গামছা জড়িয়ে নেয় বুকে। এদিক-ওদিক তাকায়। পিঠছেঁড়া ব্লাউজ বদলায়। স্বামী গত হওয়ার পর থেকে সতীত্ব টিকিয়ে রাখতে একযুগ ধরে পৃথিবীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে হচ্ছে মীনাক্ষীর। হিন্দু-মুসলমান পুরুষরা একসঙ্গে মিলেমিশে গিলে খেতে চায় শরীরটা। জাতপাত যায় না। তখন ছোটগোত্রের প্রশ্নও ওঠে না। কাঁখে এক কলস পানি নিয়ে ঘরমুখো হাঁটতে শুরু করে। অদূরেই ছাপরাঘর। ঠিকানা বলতেই এই ভিটে-বাড়ি। চোট্ট এক চিলতে উঠান। বাড়ির কোণে একজোড়া হাঁস। হেলেদোলে দূর্বাঘাসে খাবার খোঁজে। মুহূর্তেই মনোযোগ সরে যায়, কণ্ঠে বিরক্তি ঝরে মীনাক্ষীর, হাঁসগুলোর ওপর সকল রাগ। ‘দিনভর গাঙে খাইলে–হেরপরও পেট ভরে না!’ 
ঘরে ঢুকতে যাবে তখনই মীনাক্ষীর মনে কী যেন নড়ে উঠল। শচীর দিকে চোখ নেচে বেড়ায়। কোনোদিন না হলেও আজ হঠাৎ কঠিনতর ভাবনায় মন বিষিয়ে ওঠে। বিয়ে দেওয়া চাই মেয়েটার। 
‘মাও, কী হইচে?’
মায়ের জবাব না পেয়ে শচীর চোখে-মুখে অকারণ হাসি।
মীনাক্ষীর কণ্ঠ কঠিন, ‘ওই মাইয়া হাসস ক্যান? বয়স অইতাছে না। বিয়া দিতে অইব না তোরে? ট্যাকা পামু কই, ক্যাডা দিব?’
মিঠে করে হেসে শচী বলল, ‘ট্যাকা দেওনের মাইনষের অভাব অইব?’
‘কইলি কী? মাইয়ার সাঅস, কী?’ গোখরা সাপের মতো ফুঁসে ওঠে মীনাক্ষী। 
এখন বিকেল। চুপ মেরে ঘরের বারান্দায় মাটিতেই বসে পড়ে শচী। লম্বা ডাগর হাত দুটি নাচায়। টানাটানা চোখে তাকিয়ে থাকে। একটু পর বলে, ‘মাও, যাইগা লও এ্যাইহান থেইকা।’
মীনাক্ষী ঘাড় ঘুরিয়ে বড়বড় চোখে তাকায়। ‘মাইয়া, কী কইলি তুই?’
‘হ, ঠিক কইচি। দিনকাল বদলাইছে না? শ্মশানে কেউ পইড়া থাকে, কও?’
গামছা দিয়ে চুল শুকোচ্ছিল মীনাক্ষী। মুখ ঘুরিয়ে তীব্র আপত্তিমাখা কণ্ঠে বলল, ‘কই যামু, কই যামু?’
‘ভাল্লাগে না।’
‘কইলি অইব? এ্যাইডা তর বাপের ঠিকানা, এ্যাইখানেই রুটি-রুজি। আমাগো ঘরবাড়ি।’ 
‘ভাল্লাগে না, সমাজ নাই, জ্ঞাতিগোতী নাই। ক্যাডা আছে, এ্যাইখানে?’ 
চমকে ওঠে মীনাক্ষী। কয়েক মাস থেকেই মেয়ের কথাবার্তা, আচরণ, পোশাক পরার কায়দা, চলাচল সবকিছুর একটা পরিবর্তন লক্ষ করছিল। মেয়ের কথায় ভীষণ বিরক্ত হয়ে মীনাক্ষী বলে, ‘যাগা তুই, যেইদিকে চোখ যায়, যা! আমারে মুক্তি দে।’
‘হ, যামু।’ 
মোবাইলে চটুল বাজনা আর গান বেজেই চলেছিল। মীনাক্ষী অনুমান করে নিশ্চয়ই শচীর কর্ম। ছোট ঠাকুরের সঙ্গে মেশামেশি করে মেয়ের মাথা গেছে। চঞ্চলতা বেড়েছে। লাউয়ের ডগার মতো হাত নেড়ে হাতপাখার বাতাস খায় শচী। 
আড়চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কাপড় বদলা, আমার লগে আয়।’ 
তাৎক্ষণিক জবাব দেয় না শচী। 
বালিশের তলায় থাকা কভারের রং ওঠা, গ্লাসভাঙা, ছোট মোবাইল ফোনটি হাতে এনে কোমরে গুঁজে নেয় মীনাক্ষী। দৃষ্টিতে পড়তেই কাপড়ের ছেঁড়া অংশ ঘুরিয়ে গুছিয়ে পরে। নিজের সাজগোজ বলতে সরিষার তেল মাথার চুল লেপ্টে মাখা। গায়ে আঁটসাঁট হয়ে থাকা ব্লাউজটি টেনেটুনে ঠিক করে। এরপর মুখে জর্দাপান ঢুকিয়ে মীনাক্ষী বলল, ‘শচী কই, আমার লগে আয়।’
‘এহন, কই যামু?’
‘তর ডানা মেলছে না, পাখা ছাটুম। পায়ে বেড়ি লাগামু।’
শচী জানে কোথায় যাবে মা। এখন পাশের ভাঙাহাটে যাবে। কমদামের ছোট মাছ, বাসি লাউ, পচা কচুরলতি আনতে যাবে। 
ঘণ্টাখানেক পর বাজার সেরে ঘরে ফিরে মীনাক্ষী। বিকেল গড়িয়ে গেছে কখন, খেয়াল নেই। দরজায় পা রেখেই মীনাক্ষী ডাক পাড়ে মেয়েকে, ‘শচী, অরে শচী?’
অবাক হয় শচীর আওয়াজ না পেয়ে। 
‘শচী গেলি কই?’
চারদিকেই যেন নিস্তব্ধতা। শুধু মাথার ওপর দিয়ে একজোড়া কাক ওড়ে গেছে।
‘শচী?’
ঘরের কোণে কাঁথা জড়ানো বস্তুর দিকে তাকায় মীনাক্ষী। চুলগুলো দেখে অনুমান হয় শচীই হবে। কেউ কী কাঁথার ভেতর ওর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। চৈত্রকালে কাঁথা কেন! চোখের ভুল হতে পারে। নানান জিজ্ঞাসা মনে তার। 
উঠানের কাপড় তুলে ঘরে আনতে যাবে তখনই কেউ যেন মীনাক্ষীকে ফাঁকি দিয়ে কুঁড়েঘর থেকে বের হয়েই দৌড় দেয় সড়কের দিকে। নিমিষে চলে যাওয়া মানবটির গড়ন যেন পরিচিত।
‘ক্যাডা? ক্যাডা যাও?’ মীনাক্ষীর উচ্চকণ্ঠ।
পরিষ্কার চোখে ধরা পড়ে যে, এ লোকটি অনন্ত, ছোট ঠাকুর; রামচন্দ্র ঠাকুরের ছেলে। বুঝতে কষ্ট হয় না, কী হয়েছে। কেন এসেছিল ছোট ঠাকুর। 
হাতের ঝাড় রেখে ঘরে ঢোকে মীনাক্ষী। ‘ছোড ঠাকুর ক্যান আইছিলো, শচী?’ 
ছোট ঠাকুরের সঙ্গে লুকোচুরি খেলার সময়ে মা এসে পড়েছে; এমন মুখভঙ্গি করে কিংবা এটা বোঝাতেই শচী বলল, ‘লুকাইন্যা খেইল খেলছিলাম।’
ভীষণ চমকে গিয়ে অবাক হয়ে দেখল মেয়েকে। এলোমেলো চুল আর ঘর্মাক্ত কিশোরীর চোখ-মুখের দিকে তাকিয়ে নির্ভুলভাবে বলে দিতে পারে এই লুকোচুরির 
অর্থ কী। এরপর জোরে জোরে কেঁপে কেঁপে চিৎকার 
করে মীনাক্ষী বলল, ‘শচী, নিজের এমন সর্বনাশ করলি ক্যান?’
মাথা নিচু করে নিরুত্তর থাকে শচী। অতীব সুন্দরী মেয়ের এমন মুখভঙ্গি অসহ্য ঠেকে। মীনাক্ষী খেয়াল করে দরদর ঘাম মেয়ের শরীরে। এই ঘাম পশুর ওপর নৃশংস ছুরি চালানো রক্তের মতোই মনে হয় মীনাক্ষীর।