‘যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে,/ সব সংগীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া,/ যদিও সঙ্গী নাহি অনন্ত অম্বরে,/ যদিও ক্লান্তি আসিছে অঙ্গে নামিয়া,/ মহা-আশঙ্কা জপিছে মৌন মন্তরে,/ দিক্-দিগন্ত অবগুণ্ঠনে ঢাকা-/ তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,/ এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা...’
আমাদের সমাজের কীর্তি-পুরুষরা সুদূরে পাড়ি জমালে, আমার মনে রবীন্দ্রনাথের ‘দুঃসময়’ কবিতার প্রথম এই কয় চরণ বারবার বেজে ওঠে, কেন বেজে ওঠে তা আমি জানি না? মনে হয়, এক এক করে সব পাখাই যেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে আমাদের।
একটি দেশ যখন ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিক্ষা নিয়ে চলমান নদীর মতো ছুটে চলে এবং এ ক্ষেত্রে যারা সবচেয়ে বেশি অগ্রসরমান ও নেতৃত্বের আসনে থাকেন, তাদের অসময়ে চলে যাওয়ায় যেন অন্ধ এবং একই সঙ্গে পাখা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো। রবীন্দ্রনাথের এই কবিতার হয়তো অন্য মর্মও আছে কিন্তু আমি কীর্তিমানদের চলে যাওয়ার সময় বড় আশ্রয় পাই এ কবিতায়। আজ বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায়ও এ কবিতা আমাকে দারুণভাবে সহায়তা করল। করল যখন শিক্ষাবিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের কীর্তিমান শিক্ষক, কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক, প্রাবন্ধিক, গবেষক, শিল্পসমালোচক, মিষ্টিভাষী বাঙালি, চমৎকার বক্তা, আড্ডাপ্রাণ ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম আমাদের ছেড়ে চিরতরে পাড়ি জমালেন সুদূরের সীমানায়। মনটা খুব বিষণ্ন, ভারী এবং ভিজে গেল তার অন্তিমযাত্রার খবরটা পেয়ে...
তার সুহৃদরা সবাই জানি, কয়েকদিন আগে হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক, অতঃপর ল্যাবএইড হাসপাতাল, তার পর লাইফসাপোর্ট, তার পর ফিরে আসা না আসার তুমুল লড়াই। কয়দিন পর লাইফসাপোর্ট খুলে দেওয়া হলো, নিঃশ্বাস নিতে পারলেন নিজের ইচ্ছায় কিন্তু কিছু ঘণ্টা পর চিকিৎসকরা আবার লাইফসাপোর্টে নিয়ে গেলেন তাকে। তার পর ক্রমশঃ অবনতি। এরপর গত ১০ অক্টোবর-২০২৫ দুপুর গড়িয়ে বিকেলের পাটে বৃষ্টিস্নাত সূর্য যখন, যখন শরতের মলিন রোদ, আমাদের অনেকের স্যার, অনেকের মনজু ভাই, বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক, ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম চলে গেলেন পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে। অথচ এই সময়ে তার চলে যাওয়ার মোটেই কথা ছিল না, বরং তার মতো স্মার্ট, শিক্ষিত, পণ্ডিত, অমায়িক মানুষের আরও কিছুটা সময় সমাজে সরব থাকা জরুরি ছিল। কারণ, খেয়াল করুন, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, নামটি কারোর মুখে উচ্চারিত হওয়ার পর পরই আমরা চোখের সামনে আনি এমন একজন ব্যক্তিকে, যেমন আনি অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, ড. আহমদ শরীফ, ড. আনিসুজ্জামান, কবি শামসুর রাহমান, যতীন সরকার, আহমদ ছফা প্রমুখ ব্যক্তিত্বদের। এই শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক আমার কাছে ছিলেন একজন অভিভাবক ও অগ্রজ চিরচেনা লেখক। দেখা হলেই বা ফোন করলেই এত সুন্দর করে বলতেন, শি হা ব...। আমাকে বড় ভাই কিংবা পিতার মতো স্নেহ করতেন, পছন্দ তো বটেই, অসম্ভব পছন্দ করতেন।
সর্বশেষ কথা হয়েছে ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে। এর আগে আগস্ট মাসে হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করলে, বললেন, শিহাব আমি ইউএসএ-তে আছি সেপ্টেম্বরের ১৮/১৯ তারিখে ফিরব, তখন ফোন করো। ফোন কললাম ২৯ তারিখ বিকেলে, বললেন, বলো। বললাম, স্যার চন্দ্রাবতী সাহিত্য পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে আপনাকে কমিটির আহ্বায়ক আমার মাধ্যমে প্রধান অতিথি হওয়ার আমন্ত্রণ ও অনুমতি কামনা করছে। শুনে তিনি উত্তর দিলেন, শিহাব তুমি তো জানোই- এই সময়টাতে কোনো প্রকার অনুষ্ঠানে যাই না, একটু গুটিয়েই আছি, চুপচাপ থেকে কিছু নিয়মিত কাজ করছি। তবে তুমি আমার প্রিয় একজন মানুষ, আমি তোমার জন্য অনুষ্ঠানে যাব, তারিখ জানিও। আর একটা কথা, দেখছই তো এখন মব হচ্ছে, যাতে এরকম কোনো আক্রোশে না পড়ি... তুমি যোগাযোগ করো, ভালো থেকো। আপনিও... এই শেষ কথা, আর কোনো কথা হবে না, কোনো দিনই...
২.
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথিতযশা শিক্ষকদের একজন ছিলেন, পাশাপাশি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চালু হওয়ার পর বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পারটাইম শিক্ষকতা করেছেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসরের পর ইউল্যাবে যোগদান করেন। আমার সঙ্গে পরিচয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বিভাগীয় কক্ষে। আমি পড়তাম তার পাশের বিভাগ বাংলা বিভাগে। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে স্যারের কাছে যেতাম। তার কাছ থেকে সাহিত্যের আলোচনা, শিক্ষা নিয়ে, শিল্প নিয়ে এবং দেশ-রাজনীতি নিয়ে কথা শুনতাম। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ পক্ষের একজন তুখোড় মানুষ। মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধু আর বাংলাদেশের সমাজ, মানুষ নিয়ে তার ভাবনা ছিল প্রবল। বিশেষ করে এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তার ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, উদ্যোগ ছিল স্বচ্ছ, সুন্দর, আধুনিক ও দেশভাবনার ফসল। তার সরাসরি ছাত্ররা তাকে খুব মান্য করেন, কারণ তিনি যেমন পাঠদানে, তেমনি আলাপচারিতায় ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে ছিলেন অনন্য একজন মানুষ। তিনি ছিলেন জ্ঞানানুরাগী ও সজ্জন একজন মানুষ। তিনি ছিলেন মনেপ্রাণে, আন্তরিকতায়, পাঠে, কথনে একজন আধুনিক মানুষ। সময়কে খুবই গুরুত্ব দিতেন।
যে কাজ যে সময়ে করা দরকার, সে সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে এবং করতেনও। বলতেন, আমার ওখানে এই কাজের জন্য যেতে হবে এবং চলেও যেতেন। এই কর্মঠ মানুষটি শুধু বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীরই একজন অপরিহার্য হয়ে উঠেছিলেন।
৩.
১৯৫১ সালে সিলেটে জন্ম নেওয়া সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ছিলেন প্রখ্যাত লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর নাতি। সিলেটে এইচএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়ে, সেখান থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করে কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি লেখালেখি শুরু করেন ষাটের দশকে।
নন্দনতত্ত্ব, প্রবন্ধ, গবেষণা, ছোটগল্প, উপন্যাস ও শিল্প সমালোচনা মিলিয়ে তার গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় কুড়িটি। পেয়েছেন একুশে পদক ও বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান মারা যাওয়ার পর তিনি বেঙ্গল গ্রুপের সাহিত্য পত্রিকা কালি ও কলম-এর উপদেষ্টা সম্পাদক হন। তিনি নিয়মিত লেখালেখি করেছেন। ছিলেন একজন মুক্তচিন্তার জগতের লেখক।
মূলত ছোটগল্প রচনায় প্রসিদ্ধ ছিলেন। ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত একটি গল্প দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও দীর্ঘ সময় স্ব-ইচ্ছায় বিরতি দেন গল্প লেখায় এবং আবার পুরোদমে গল্প লিখতে শুরু করেন। তার গল্পের বিষয়-আশয় ও দক্ষতা এবং কারুকাজ নিয়ে তারই সতীর্থ কথাসাহিত্যিকদের মতে, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম সত্তরের দশকে মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা, স্বপ্নভঙ্গের বেদনা, সামরিক শাসনের দুঃসহ বাস্তবতা, দারিদ্র্য, বেকার সমস্যা, নারী নির্যাতন, সন্ত্রাস প্রভৃতির প্রভাবই উপজীব্য হয়েছে তার ছোটগল্পে। অনেকেই তাকে প্রধানত শিক্ষক ও শিক্ষাবিদ হিসেবেই বড় করে দেখেছেন কিন্তু অন্যদিকে লেখকরা তাকে একজন শক্তিমান ছোটগল্প লেখক হিসেবেই স্বীকৃতি দিয়েছেন। কথাসাহিত্যিক মঈনুল আহসান সাবের বলেছেন, ‘জাদুবাস্তবতা চমৎকারভাবে তার লেখায় কাজ করে। আমি গল্পের কথাই বলি মূলত। আমার মনে হয় গল্পেই তিনি সবচেয়ে বেশি সফল হয়েছেন। জাদুবাস্তবতা একেবারে যখন আমাদের দেশে চর্চা শুরু হয়নি তখন তিনি সেটার চর্চা শুরু করেন’।
৪.
সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের চেহারার সঙ্গে আমার চেহারার নাকি অনেক মিল- সুহৃদ অনেকেই বলেছেন। সে যাই হোক, তবে তিনি আমাকে দারুণ স্নেহ করতেন, এটি দিবালোকের মতো সত্য। সেই আশির দশক থেকে ৫ অক্টোবর ২০২৫ সালের সীমানা পর্যন্ত এই স্নেহের হাত আমার মাথায় উত্থিত ছিল। এটা কোনো ন্যাকামি করে বলছি না। আমাকে তিনি বকাও দিতেন কোনো কোনো সময়। ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ে পড়াকালীন স্যারের সঙ্গে সম্পর্কের কথা আগে উল্লেখ করেছি। তবু একটু বলি- স্যার প্রচণ্ড দেশপ্রেমিক ও রাজনীতিসচেতন মানুষ ছিলেন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়কালীন দেশে জেঁকে বসেছিল স্বৈরাচারী শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ- আমরা স্বৈরচারবিরোধী ছিলাম উভয়েই। তাই নিবিড়ভাবে এ নিয়ে আলোচনা, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সমর্থন এবং গণতান্ত্রিক পথ আবিষ্কারের কথা বলতাম। প্রগতিশীল ধারার লেখক হিসেবে আমরা এ কণ্ঠস্বর ধারণ করতেই পারি। তিনি এ কঠিন সময়কে উপজীব্য করে গল্পও লিখেছেন। দ্বিতীয়ত: মনে পড়ল, তাঁর ‘কাচ ভাঙ্গা রাতের গল্প’ নিয়ে আমি একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম। আমি মূলতঃ কবিতা লিখি, স্যার লেখেন কথাসাহিত্য। কবিতা পড়া ও বোঝার অসম্ভব ও অসাধারণ মেধা ছিল তার। নিজের কথা কী বলব? তিনি আমার কবিতা খুবই পছন্দ করতেন। কবিতা নিয়ে সমালোচনাও করতেন, বলতেন এ জায়গাটা ভালো লেগেছে, এ জায়গাটা নিয়ে ভাবতে পারো। স্মৃতিতে একটি ঘটনা থেকে যাবে, তা হলো, আমার ৬২টি কবিতার ইংরেজি অনুবাদগ্রন্থ প্রকাশ পাবে বলে স্যারকে একদিন বললাম, আমার একটি কবিতা অনুবাদ করে দেন না স্যার, যেন আবদার। তাৎক্ষণিক বললেন, দাও ছোট একটি কবিতা। দিলাম, সঙ্গে সঙ্গে তিনি সেটির অনুবাদ করে দিলেন। উল্লেখ্য, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বাংলাদেশের সাহিত্যের অনুবাদ নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে অনেক কথা বলেছেন। বিশেষ করে বাংলা ভাষায় অসংখ্য খ্যাতিমান লেখক-কবি থাকা সত্ত্বেও উপযুক্ত ও বিশ্বমানের অনুবাদ না হওয়ায় বিশ্ব দরবার ও পুরস্কারে আমরা অবহেলিত হয়েছি।
সত্যি, ব্যতিক্রমী, বিরল ও একনিষ্ঠ এক নান্দনিক মানুষ সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের শূন্যতা বিরাজ করবে আমাদের সাহিত্য-অঙ্গন, বিশ্ববিদ্যালয়-অঙ্গন, দেশ-বিদেশের মঞ্চ, মিডিয়া, সেমিনার-সভা-অনুষ্ঠান, সর্বোপরি বাংলাদেশের হৃদয়ে।