নারীদের স্তনের নানা সমস্যা নিয়ে সচেতনতা দিন দিন বাড়লেও এখনো অনেকেই কিছু সাধারণ অবস্থাকে ঘিরে অযথা আতঙ্কে ভোগেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো ফাইব্রোঅ্যাডেনোমা—স্তনের একটি অকল্যাণকর (benign) টিউমার, যা বিশেষ করে তরুণ বয়সী নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। যদিও এটি ক্যান্সার নয় এবং সাধারণত ক্ষতিকরও নয়, তবে এর উপস্থিতি অনেক নারীকেই মানসিকভাবে ভীত করে তোলে। তাই এই অবস্থাটি সম্পর্কে জানা এবং সচেতন হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।
ফাইব্রোঅ্যাডেনোমা কী?
ফাইব্রোঅ্যাডেনোমা হলো স্তনের টিস্যুতে তৈরি একটি কঠিন, মসৃণ এবং সাধারণত ব্যথাহীন গাঁট বা গুটি। এটি সাধারণত গোলাকার কিংবা ডিম্বাকৃতি হয় এবং হাত দিয়ে নড়ানো যায়। অনেক সময় একে ‘ব্রেস্ট মাউস’ বলেও উল্লেখ করা হয়, কারণ এটি চামড়ার নিচে সহজে সরে যায়। এই ধরনের টিউমার সাধারণত ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে দেখা যায়, তবে যেকোনো বয়সেই এটি হতে পারে।
কেন হয়
এর সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ এখনো নির্ধারিত হয়নি। তবে ধারণা করা হয়, নারীদের শরীরে প্রজননকালীন সময়ে হরমোন—বিশেষ করে ইস্ট্রোজেনের প্রভাবে স্তনের টিস্যু অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে ফাইব্রোঅ্যাডেনোমা তৈরি হতে পারে। হরমোনের ওঠানামা, পারিবারিক ইতিহাস এবং স্তনের স্বাভাবিক গঠনগত পরিবর্তনও এই অবস্থার জন্য আংশিকভাবে দায়ী হতে পারে।
লক্ষণ ও শনাক্তকরণ
ফাইব্রোঅ্যাডেনোমা সাধারণত কোনো ব্যথা বা অস্বস্তির কারণ হয় না। অধিকাংশ সময় এটি হঠাৎ করেই আবিষ্কৃত হয়, যেমন নারীরা গোসলের সময় বা পোশাক পরিবর্তনের সময় স্তনে একটি ছোট গাঁট অনুভব করেন। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো —
• ছোট থেকে মাঝারি আকারের মসৃণ গুটি
• হাত দিয়ে চামড়ার নিচে নড়ানো যায়
• সাধারণত ব্যথাহীন
• মাসিকের আগে কিছুটা ফুলে যেতে পারে
• একাধিক গাঁট থাকতে পারে
তবে শুধুমাত্র হাত দিয়ে গাঁট অনুভব করে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয় যে এটি ফাইব্রোঅ্যাডেনোমা কি না। এজন্য প্রয়োজন হয় যথাযথ চিকিৎসকের পরামর্শ ও কিছু পরীক্ষার।
পরীক্ষা ও নির্ণয়
চিকিৎসক প্রথমে শারীরিকভাবে স্তন পরীক্ষা করেন। এরপর প্রয়োজন হতে পারে —
• আল্ট্রাসোনোগ্রাফি: অল্পবয়সী নারীদের জন্য উপযুক্ত চিত্রগ্রহণ পদ্ধতি
• ম্যামোগ্রাম: বয়স ৪০ ঊর্ধ্ব নারীদের ক্ষেত্রে প্রয়োগযোগ্য
• এফএসএসি (Fine Needle Aspiration Cytology): সূক্ষ্ম সূঁচ দিয়ে গাঁট থেকে কোষ সংগ্রহ করে পরীক্ষা
• কোর বায়োপসি: টিস্যুর ছোট অংশ নিয়ে প্যাথলজিতে পাঠানো হয় নিশ্চিত হওয়ার জন্য
এই পরীক্ষাগুলোর মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায়, গাঁটটি সত্যি ফাইব্রোঅ্যাডেনোমা কিনা এবং তা ক্যান্সারের ঝুঁকিপূর্ণ কি না।
ফাইব্রোঅ্যাডেনোমার ধরন
ফাইব্রোঅ্যাডেনোমার কয়েকটি প্রকারভেদ রয়েছে —
• সাধারণ ফাইব্রোঅ্যাডেনোমা (Simple fibroadenoma): সবচেয়ে সাধারণ, ক্যান্সারের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
• জটিল ফাইব্রোঅ্যাডেনোমা (Complex fibroadenoma): এতে কিছু পরিবর্তিত কোষ থাকে, তবে এখনো অকল্যাণকর।
• জুভেনিল ফাইব্রোঅ্যাডেনোমা (Juvenile fibroadenoma): কিশোরীদের মধ্যে দেখা যায়, কখনো দ্রুত বাড়ে।
• বড় ফাইব্রোঅ্যাডেনোমা (Giant fibroadenoma): আকারে অনেক বড় হয় (৫ সেমি বা তার বেশি), যা স্তনের সৌন্দর্য ও কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
• ফিলোডস টিউমার (Phyllodes tumor): দেখতে অনেকটা ফাইব্রোঅ্যাডেনোমার মতো হলেও দ্রুত বাড়ে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে।
চিকিৎসা
ফাইব্রোঅ্যাডেনোমা যদি ছোট থাকে এবং উপসর্গ সৃষ্টি না করে, তাহলে সাধারণত অপসারণের প্রয়োজন হয় না। চিকিৎসক ৬ মাস বা ১ বছর পরপর পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিতে পারেন। তবে নিচের পরিস্থিতিতে অস্ত্রোপচার করা হতে পারে —
• গাঁটটি দ্রুত আকারে বড় হচ্ছে
• গাঁটে ব্যথা বা অস্বস্তি হচ্ছে
• গাঁটের গঠন সন্দেহজনক মনে হচ্ছে
• রোগীর মানসিক অস্বস্তি থাকছে
• গাঁটটি সৌন্দর্যহানিকর বা দৈনন্দিন কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে
অপারেশনের মাধ্যমে গাঁটটি সম্পূর্ণভাবে তুলে ফেলা হয়। এটি একটি ছোট এবং তুলনামূলকভাবে নিরাপদ অস্ত্রোপচার, যার পর সুস্থ হয়ে ওঠা সহজ হয়।
ফাইব্রোঅ্যাডেনোমা ও ক্যান্সারের সম্পর্ক
এটি গুরুত্বপূর্ণভাবে জানার বিষয় যে ফাইব্রোঅ্যাডেনোমা স্তন ক্যান্সার নয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি ক্যান্সারে রূপান্তরিত হয় না। তবে জটিল বা বড় আকারের কিছু ফাইব্রোঅ্যাডেনোমা, বিশেষত complex ও phyllodes tumor, অল্পমাত্রায় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই গাঁটের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ ও পর্যবেক্ষণ জরুরি।
সচেতনতা ও আত্মবিশ্বাস
স্তনের যেকোনো পরিবর্তন বা গাঁট নতুন করে অনুভব করলে ভয় না পেয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। অধিকাংশ সময় এটি ক্ষতিকর কিছু নয়, বরং সময়মতো সঠিক ব্যবস্থা নিলে উদ্বেগ ও জটিলতা—দুটিই কমে।
নারীদের উচিৎ মাসে অন্তত একবার নিজের স্তন নিজে পরীক্ষা করা এবং কোনো অস্বাভাবিকতা দেখলে দেরি না করে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা। এই সামান্য অভ্যাসটি ভবিষ্যতের বড় বিপদ এড়াতে পারে।
সূত্র: হেলথ লাইন


