অনেকটা চোখের পলকেই সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক দখল করে নিল বিদ্রোহীরা। পতন ঘটল বাশার আল-আসাদ সরকারের। সেই সঙ্গে অবসান ঘটল তার ২৩ বছরের স্বৈরশাসনের। রাজধানী দামেস্কসহ সিরিয়ার বড় শহরগুলো এতদিন বাশার আল-আসাদ সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তবে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের বড় অংশ সশস্ত্র বিদ্রোহী, জিহাদি এবং কুর্দিপন্থি এসডিএফের নিয়ন্ত্রণে থেকে যায়। বিদ্রোহীরা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ইদলিব, উত্তরাঞ্চলের হামা এবং পশ্চিমের আলেপ্পো দখলের পর পতন ঘটে রাজধানী শহরের। প্রশ্ন হচ্ছে, আসাদের এই পতনের পর দামেস্ক কী তার রাজনৈতিক গুরুত্ব হারাবে এবং ইতিহাসের অংশ হয়ে যাবে?
বিশ্বের প্রাচীনতম শহর দামেস্ক ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের জন্য চতুর্থতম পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত। যাকে ইসলামে আস-শাম নামে ডাকা হয়। কবির ভাষায় যেটি জেসমিনের শহর। স্থানটিকে আরব বিশ্ব ও ভূমধ্যসাগরীয় এলাকার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বর্তমানে শহরটিতে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের বসবাস।
সিরিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত দামেস্ক শহর একটি বিশাল মহানগরের কেন্দ্র। ২০০৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এখানকার জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২৭ লাখ। প্রাচীন এই শহরটি সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ২ হাজার ২৩০ ফুট ওপরে লেবানন পর্বতমালার পূর্ব পাদদেশে অবস্থিত। এর ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে বারাদা নদী।
খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দে এখানে প্রথম জনবসতি গড়ে ওঠে। ৬৬১ সাল থেকে ৭৫০ সাল পর্যন্ত এটি উমাইয়া খিলাফতের রাজধানী ছিল। আব্বাসীয় রাজবংশের বিজয়ের পর ইসলামি শাসনের মূলকেন্দ্র হিসেবে ইরাকের বাগদাদে স্থানান্তরিত করা হয়। ফলে শহরটির গুরুত্ব ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে। তবে আইয়ুবিদ ও মামলুকের আমলে এর গুরুত্ব ফিরে আসে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের ৮ বছর পর ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাপী বসবাসযোগ্য স্থানগুলোর র্যাঙ্কিংয়ে ১৪০টি শহরের মধ্যে সবচেয়ে কম বসবাসযোগ্য শহর হিসেবে পরিচিতি পায় দামেস্ক। বর্তমানে শহরের আয়তন ১০৫ বর্গকিলোমিটার (৪১ বর্গমাইল), যার মধ্যে ৭৭ বর্গকিলোমিটার (২০ বর্গমাইল) শহরের অংশ এবং জাবাল কাশিউন শহরের বাকি অংশ।
দামেস্কের পুরোনো শহরটি প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত। বারাদা নদীর দক্ষিণ তীরে এর অবস্থান। ১৯ শতকে শহরটিকে উপেক্ষা করে জাবালে কাশিউনের ঢালে কিছু গ্রাম প্রতিষ্ঠিত হয়। মধ্যযুগীয় আন্দালুসিয়ান শেখ ও দার্শনিক ইবনে আরাবির মাজারকে কেন্দ্র করে আল-সালিহিয়াহ পাড়া গড়ে ওঠে। এই নতুন এলাকাগুলো প্রাথমিকভাবে কুর্দি সৈন্যরা এবং অটোমান সাম্রাজ্যের ইউরোপীয় অঞ্চল থেকে আসা মুসলিম শরণার্থীদের দ্বারা বসতি গড়ে উঠেছিল, যা খ্রিষ্টান শাসনের অধীনে ছিল। তারা আল-আকরাদ (কুর্দি) এবং আল-মুহাজিরিন (অভিবাসী) নামে পরিচিত ছিল।
১৯ শতকের শেষের দিক থেকে পুরোনো শহরের পশ্চিমে ও বারাদাকে ঘিরে গড়ে ওঠা আল-মারজেহ এলাকায় আধুনিক প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে উঠতে শুরু করে। দামেস্কের কেন্দ্রীয় স্কয়ারের নাম আল-মারজেহ। যার মধ্যে সিটি হলও ছিল। বিচার আদালত, ডাকঘর ও রেলওয়ে স্টেশনগুলো দক্ষিণে সামান্য উঁচু জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। নতুন শহরের বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র ধীরে ধীরে এই এলাকার উত্তর দিকে সরে গেছে।
২০ শতকের দিকে বারাদা নদীর উত্তর দিকে নতুন এক শহরতলির উদ্ভব হয়। ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৭ সালে দামেস্কের ইয়ারমুতে হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে আশ্রয় দেওয়া হয়। ২০ শতকের শেষের দিকে উন্নয়নের কিছু প্রধানক্ষেত্র ছিল উত্তরে, পশ্চিম মেজেহ পাড়ায় ও সম্প্রতি উত্তর-পশ্চিমে ডুমারের বারাদা উপত্যকা বরাবর। উত্তর-পূর্বে বারজেহ পাহাড়ের ঢাল। প্রধান শহরের দক্ষিণে কিছু দরিদ্র এলাকা সরকারি অনুমোদন ছাড়াই নির্মিত হয়েছে।
সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মঞ্চে দামেস্কের বেশ গুরুত্ব ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বরাবর ‘খেলুড়ে’ নেতা ছিলেন হাফিজ আল-আসাদ। ১৯৭৩ সালে মিসর-ইসরায়েল যুদ্ধে তিনি মুসলিম মিত্র কায়রোর পক্ষে অবস্থান নেন। প্রায় দুই দশক পর ১৯৯১ সালে তিনিই আবার ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় অংশ নেন। ইসরায়েলের দখলে থাকা গোলান মালভূমি পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টায় ভূমিকা রাখেন। ইরাকের নেতা সাদ্দাম হোসেনকে ‘দীর্ঘদিনের শত্রু’ মনে করতেন হাফিজ। ১৯৯০-৯১ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধে সিরিয়া বাগদাদের বিপক্ষে ছিল। তিনি এ যুদ্ধে পশ্চিমা জোটকে সমর্থন দিয়েছিলেন।
টানা ২৯ বছর ক্ষমতায় থেকে ২০০০ সালের ১০ জুন দামেস্কে মারা যান হাফিজ। এর মধ্য দিয়ে সিরিয়ায় আসাদ পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্মের শাসনের সূচনা হয়। ওই বছরের ১৭ জুলাই প্রেসিডেন্ট পদে বসেন তার ছেলে বাশার আল-আসাদ। সিরিয়ার সরকারব্যবস্থা পুরোপুরি জনপ্রতিনিধিত্বমূলক না হলেও পরিস্থিতি বিবেচনায় বাশার আল-আসাদ একচ্ছত্রই সিরিয়ার রাজনৈতিক ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি লেবাননে সেনা পাঠিয়েছিলেন। যদিও ২০০৫ সালে সিরিয়া লেবানন থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়। বাশার আল-আসাদ ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সিরিয়ার আবহমান বৈরী সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটান। তবে মার্কিন নীতির সমর্থক আরব রাষ্ট্রগুলো বিশেষত সৌদি আরবের সঙ্গে সিরিয়ার সম্পর্কের তেমন উন্নতি হয়নি। ইরানের সঙ্গে সিরিয়ার ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্ক মধ্যপ্রাচ্যে তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকেই প্রতিফলিত করে। ২০০৫ সালে লেবাননের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরি হত্যাকাণ্ডের পর লেবাননে রক্তক্ষয়ী রাজনৈতিক সংকট দেখা দিলে তিনি ইতিবাচক ভূমিকা রাখেন।
ভবিষ্যতে মধপ্রাচ্যের রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে দামেস্কের কী ভূমিকা হবে, তা বলা মুশকিল। ক্ষমতা দখলকে কেন্দ্র করে সেখানে স্বার্থের কোনো সংঘাত দেখা দেয় কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষকরা শঙ্কিত। এ জন্য আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। অন্যদিকে ক্ষমতার পালাবদলে সেখানে যদি স্থিতিশীলতা ফিরে আসে তা হলে গৃহযুদ্ধের ধকল কাটিয়ে দামেস্ক আবার তার গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করতে পারবে। সূত্র: আল-জাজিরা ও বিবিসি