গ্রিনল্যান্ডের জনগণকে ‘আত্মনিয়ন্ত্রণ’ গ্রহণ করার এবং ১৭২১ সাল থেকে দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণকারী ডেনমার্কের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
শুক্রবার (২৮ মার্চ) গ্রিনল্যান্ড সফরকালে তিনি দ্বীপটির জনগণকে এই আহ্বান জানান বলে জানিয়েছে বিবিসি।
এ ছাড়া ভ্যান্স গ্রিনল্যান্ডের জনগণকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ডেনমার্কের কাছ থেকে দ্বীপটি দখল করার জন্য সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘চীন ও রাশিয়াকে গ্রিনল্যান্ডে অনুপ্রবেশে করতে দিয়ে ডেনমার্ক স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলটিকে ঝুঁকিতে ফেলছে। এ সময় তিনি বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই দ্বীপটির জনগণকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চু্ক্তি করার আহ্বান জানান।’
এই দ্বীপ পরিদর্শনকালে ভ্যান্স যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জোর করে দ্বীপটি দখলের সাম্প্রতিক হুমকিগুলোকে প্রশমিত করার চেষ্টা করেন।
এ সময় তিনি অভিযোগ করেন যে, ডেনমার্ক ৩০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে দ্বীপটির মালিক হলেও তারা আধা স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলটিকে রক্ষা করার জন্য পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করেনি।
অন্যদিকে চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, গ্রিনল্যান্ডের অধিকাংশ জনগণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিরোধিতা করে।
এদিকে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্র অসম্মান করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন দ্বীপটির প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে ডেনমার্কের রাজা ফ্রেডেরিক যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এ বিষয়ে ডেনমার্কের রাজা এক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘আমরা এক পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাস করছি। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, গ্রিনল্যান্ডের প্রতি আমার ভালোবাসা এবং গ্রিনল্যান্ডের জনগণের সঙ্গে আমার সংযোগ অক্ষুণ্ন রয়েছে।’
ভ্যান্স এবং তার স্ত্রী মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য গ্রিনল্যান্ডে ছিলেন। শুধু দ্বীপটির পিটুফিক স্পেস বেস পরিদর্শন করেন তারা।
ভ্যান্স ভ্রমণের এই সুযোগটি ব্যবহার করে ডেনমার্ককে উদ্দেশ করে বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ডের জনগণকে রাশিয়া, চীন এবং অন্যান্য দেশের আক্রমণ থেকে নিরাপদ রাখতে হবে।’
৫৭ হাজার জনসংখ্যার এই দ্বীপে অব্যবহৃত প্রচুর খনিজ ও তেলের মজুত রয়েছে। তিনি এই অঞ্চলের রুট এবং খনিজ পদার্থের প্রতি আগ্রহ দেখান।
ভ্যান্স বলেন, ‘আমরা মনে করি, এই অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি চুক্তি করতে সক্ষম হব।’
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমরা আশা করি গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অংশীদারত্ব বেছে নেবে, কারণ আমরাই পৃথিবীতে একমাত্র জাতি, যারা তাদের সার্বভৌমত্ব এবং তাদের নিরাপত্তাকে সম্মান করি। তাদের নিরাপত্তা ও আমাদের নিরাপত্তা একই সূত্রে গাথা।’
ভ্যান্স বলেন, ‘অঞ্চলটির স্থলভাগে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি সম্প্রসারণের তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা নেই, তবে নৌ জাহাজ এবং সামরিক বরফ ভাঙা জাহাজসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করবে যুক্তরাষ্ট্র।’
ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেনমার্ককে উদ্দেশ করে বলেন, ‘ডেনমার্কের প্রতি আমাদের বার্তা খুবই সহজ। ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ডের জনগণের জন্য ভালো কাজ করেনি। তারা গ্রিনল্যান্ডের জনগণ ও অবিশ্বাস্য এই সুন্দর ভূমির নিরাপত্তায় কম বিনিয়োগ করেছে।’
ভ্যান্সের ও তার স্ত্রীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইক ওয়াল্টজ এবং জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট সফরসঙ্গী ছিলেন।
এর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন ‘সমগ্র বিশ্বের শান্তি নিশ্চিতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড দরকার। দ্বীপটির জলপথে সর্বত্র চীনা এবং রাশিয়ান জাহাজ রয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য আমাদের গ্রিনল্যান্ডের খুব প্রয়োজন।’
এদিকে গ্রিনল্যান্ডের একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে শিল্পী কার্লাইন পুলসেন বলেন, ‘কিছু বলার অনেক উপায় আছে। কিন্তু আমার মনে হয় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেভাবে বলছেন, তা সঠিক উপায় নয়।’
দ্বীপটির নাগরিক নিনা বলেন, ‘আমি যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্টের এই সফর নিয়ে উদ্বিগ্ন।’
ওই নারীর মেয়ে অনিতা বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ডে ভ্যান্সের এই সফর অনেক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে এবং অনেক মানুষ চিন্তিত।’
গ্রিনল্যান্ড তার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ বিষয় পরিচালনা করে, কিন্তু দ্বীপটির পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতির সিদ্ধান্ত নেয় ডেনমার্ক। সাম্প্রতিক নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ছয়টি প্রধান দলের মধ্যে পাঁচটি ডেনমার্ক থেকে স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেছেন।
এদিকে কয়েকদিন আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেন যে, ‘তিনি গ্রিনল্যান্ডের জন্য ট্রাম্পের পরিকল্পনাকে গুরুতর বলে মনে করেন।’
দ্বীপটির স্বাধীনতাপন্থি দলের রাজনীতিবিদ কুপানুক ওলসেন বিবিসিকে বলেন, ‘এই অঞ্চলটি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে। আমরা আবার উপনিবেশিত হওয়ার ভয় পাচ্ছি। আমরা গত ৩০০ বছর ধরে ডেনমার্কের অধীনে একটি উপনিবেশ হিসেবে আছি, এখন আরেকজন উপনিবেশকারী আমাদের প্রতি আগ্রহী।’
আলাস্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কটিক নিরাপত্তার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ট্রয় বাউফার্ড বিবিসিকে বলেন, ‘ট্রাম্প ভূ-রাজনীতি বা কূটনীতির চেয়ে বরং এই অঞ্চলে তিনি যা চান তা অর্জনের জন্য তার ব্যবসায়িক বুদ্ধির ওপর নির্ভর করছেন।’
অধ্যাপক বাউফার্ড বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের শেষ লক্ষ্য হলো গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে অনেক বেশি শক্তিশালী সম্পর্ক স্থাপন করা।’ সূত্র: বিবিসি
সুমন/