ভারত ও পাকিস্তান ২০১৯ সালেও একবার সামরিক সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে চলে আসে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা দেখেন যে দুই দেশই পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওকে মাঝরাতে ঘুম থেকে জাগানো হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি দুই দেশের সঙ্গেই আলাদাভাবে কথা বলেন।
দুইপক্ষকেই বোঝানোর চেষ্টা করেন যে অন্যপক্ষ পারমাণবিক অস্ত্রের প্রস্তুতি নিচ্ছে না। তার সে চেষ্টা সফল হয়েছিল। প্রাথমিক ডামাডোলের পর সে সংঘাত থেমে যায়। তবে ছয় বছর পর পরমাণু শক্তিধর দুই দেশের মধ্যে আবার উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে।
এবারের সংঘাতে হিসাব অনেকটাই বদলে গেছে। ভারত ও পাকিস্তান কার কাছ থেকে অস্ত্র কিনছে, সে বিষয়েও এসেছে পরিবর্তন। এমনকি কে কার গুরুত্বপূর্ণ সামরিক মিত্র, সেটিরও ভিন্ন এক রূপ দেখা যাচ্ছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন বলছে, ভারতকে সাম্প্রতিক সময়ে অতীতের দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকতে দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমের কাছ থেকে ভারত শত শত কোটি ডলারের অস্ত্র কিনছে। এর আগে ভারত অস্ত্র সবচেয়ে বেশি কিনত রাশিয়ার কাছ থেকে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, দেশটি রাশিয়ার কাছ থেকে স্বল্প দামের অস্ত্র কেনা ব্যাপক হারে কমিয়ে দিয়েছে। অথচ রাশিয়া স্নায়ুযুদ্ধের আমল থেকেই ভারতের মিত্র।
অন্যদিকে পাকিস্তান দীর্ঘ সময় ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ছায়াতলে। কিন্তু আফগানিস্তানে যুদ্ধের পর পাকিস্তানের গুরুত্ব যেন কমে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। পাকিস্তানও এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে সাড়া দিয়ে অস্ত্র কিনছে না। বরং দেশটি এখন নিজেদের সামরিক রসদের বড় অংশই কিনছে চীনের কাছ থেকে।
এ বিষয়গুলো দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই দেশের সর্বশেষ উত্তেজনাকে নতুন একটি মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রকে সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে চীনের মোকাবিলা করতে গিয়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে। অন্যদিকে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের যত কাছে গিয়েছে, ততই পাকিস্তানের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলেছে বেইজিং।
আবার এই সময়টিতেই ভারত ও চীনের সম্পর্কে ব্যাপক অবনতি হতে দেখা গেছে। বিশেষ করে বিগত কয়েক বছরে এটি প্রকট হয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে তো আগে থেকেই এক ধরনের শীতল যুদ্ধ চলছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে আসার পর তা আরও বড় হয়েছে। বাণিজ্যযুদ্ধই শুরু হয়ে গেছে দুই দেশের মধ্যে।
কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সিনিয়র ফেলো ও সাবেক কূটনীতিক অ্যাশলে টেলিস বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন ভারতের সুরক্ষা স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে চীনকে তুলনামূলকভাবে একই ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে।
ভারতের সঙ্গে যে যুক্তরাষ্ট্রের নৈকট্য এবং রাশিয়ার সঙ্গে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা দেখলেই স্পষ্ট হয়। গত ২২ এপ্রিল কাশ্মীরে ভারতীয় পর্যটকদের ওপর হামলা হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের সঙ্গে কথা হয় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির।
ট্রাম্প প্রশাসনের কাছ থেকে সহযোগিতার দৃঢ় আশ্বাস পান তিনি। হামলার পর মোদিকে অন্যান্য দেশের নেতাও ফোন করেন। কিন্তু সে তালিকায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের অনুপস্থিতি অনেকেরই চোখ এড়ায়নি। তবে পুতিন-মোদি যে একেবারেই কথা বলেননি, তা নয়। ওই হামলার এক সপ্তাহ পর রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রথমে কথা বলেন। আর পুতিন-মোদির অবশেষে কথা হয় চলতি সপ্তাহে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরাশক্তিদের আচরণের প্রভাব সরাসরি সামরিক সংঘাতে দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন আমেরিকার সিনিয়র ফেলো লিন্ডসে ফোর্ড বলেন, ভারত ও পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সংঘাত দেখে এ রকম মনে হতে পারে যে– ভারত লড়ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় প্ল্যাটফর্ম নিয়ে, আর অন্যদিকে পাকিস্তান লড়ছে চীনের প্ল্যাটফর্মকে সঙ্গে নিয়ে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোর আগে স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের হিসাব দক্ষিণ এশিয়া প্রভাব রেখেছে। ভারতের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পর্ক ভালো ছিল। ভারতের সামরিক বাহিনীর রসদের দুই-তৃতীয়াংশই ছিল মস্কো থেকে আসা অস্ত্র ও গোলাবারুদ।
অন্যদিকে আফগানিস্তানে সোভিয়েতদের পরাজিত করতে হাত মিলিয়েছিল পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৮০-এর দশকে এ সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে গোলাবারুদ ও রসদও বৃদ্ধি করেছিল পাকিস্তান। বেশ কয়েকটি এফ-১৬ও হাতে পেয়েছিল সে সময়।
স্নায়ুযুদ্ধের পর ১৯৯০-এর দশকে ভারত, পাকিস্তান দুই দেশই পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে। এমনকি পাকিস্তান অর্থ দেওয়া সত্ত্বেও বেশ কয়েকটি এফ-১৬ হাতে পায়নি।
তবে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে হামলা হওয়ার পর পাকিস্তানের সুদিন ফিরে আসে। আবারও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হওয়ার সুযোগ পায় তারা। এবার তারা যুক্তরাষ্ট্রের ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ সঙ্গী হয়। কিন্তু পরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দুই দিকেই হাওয়া দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কমতে শুরু করে পাকিস্তানের গুরুত্ব। এ সময় তারা চলে যায় চীনের দিকে।
২০০০-এর মাঝামাঝি সময়েও পাকিস্তানের অস্ত্রের মাত্র ৩৮ শতাংশ আসত চীন থেকে। গত চার বছরে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্যে উঠে এসেছে বিষয়টি।
অন্যদিকে ভারত এ সময়ের মধ্যে রাশিয়ার কাছ থেকে অস্ত্র কেনা অর্ধেকেরও বেশি কমিয়েছে। ২০০৬ থেকে ২০১০ পর্যন্ত ভারতের প্রধান অস্ত্রের ৮০ শতাংশ আসত রাশিয়ার কাছ থেকে। গত চার বছরে সেটি কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৮ শতাংশে। এখন ভারত অস্ত্র আমদানি করে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও ইসরায়েলের মতো মিত্রদের কাছ থেকে।
পাকিস্তান শুধু এফ-১৬-এর ক্ষেত্রেই ছাড় পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের এ-সংক্রান্ত কর্মসূচির পরিসর বাড়িয়েছে। সেটির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কিছু সুবিধা পাচ্ছে দেশটি।
২০১৯ সালে ভারত ও পাকিস্তানের সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের যেসব কর্মকর্তা কাছ থেকে দেখেছেন, তারা অনেকটাই উদ্বিগ্ন। কারণ মানবসৃষ্ট ভুল যে কত দ্রুত সবকিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে, তা জানেন তারা। তারা মূলত ভারত ও পাকিস্তানের অতি-জাতীয়তাবাদ নিয়েই বেশি শঙ্কিত। সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস