উরুগুয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসে ‘পেপে’ মুজিকা ৮৯ বছর বয়সে মারা গেছেন। হোসে ‘পেপে’ মুজিকা বিশ্বজুড়ে বামপন্থীদের কাছে কিংবদন্তি একজন গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে পরিচিত । এছাড়া তাকে ‘বিশ্বের দরিদ্রতম প্রেসিডেন্ট’ হিসেবেও অভিহিত করা হয়।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (১৩ মে) দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইয়ামান্ডু ওরসি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন।
খাদ্যনালির ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ এক বছর পর চলতি মে মাসের শুরুতে তাকে প্যালিয়েটিভ কেয়ারে রাখা হয়।
১৯৩৫ সালের ২০ মে জন্মগ্রহণকারী মুজিকা ১৯৬০-এর দশকে কিউবা বিপ্লবে অনুপ্রাণিত হয়ে ‘মুভিমিয়েন্টো দে লিবারাসিওন ন্যাসিওনাল-টুপামারোস’ (এমএলএন-টি) নামে একটি শহুরে গেরিলা গোষ্ঠীর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।
১৯৭২ সালে পুনরায় গ্রেপ্তার হওয়ার আগে তিনি একবার জেল থেকেও পালান। ১৯৮৫ সালে উরুগুয়ের সামরিক শাসনের অবসানের পর সাধারণ ক্ষমায় মুক্তি পাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ১৩ বছর কারাগারে কাটান। এ সময় তাকে অনেক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে এবং এর অর্ধেকেরও বেশি সময় তিনি একটি ছোট্ট সেলে বন্দী ছিলেন। মাসে মাত্র কয়েকবার ব্যায়াম করার জন্য তাকে বাইরে বের হতে দেওয়া হতো।
সেই অন্ধকার প্রকোষ্ঠে, যেখানে কোনো বই বা অন্য কোনো সঙ্গ ছিল না, সেই স্মৃতি রোমন্থন করে মুজিকা জানান, তিনি সেখানে চিন্তা করতে শিখেছিলেন।
কারামুক্তির পর মুজিকা রাজনীতিতে যোগ দেন। তিনি ডেপুটি ও সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৫ সালে উরুগুয়ের বামপন্থী জোট ‘ফ্রেন্তে আম্প্লিও’র প্রথম সরকারে তিনি পশুসম্পদ, কৃষি ও মৎস্যমন্ত্রী নিযুক্ত হন। ২০০৯ সালের নভেম্বরে তিনি ৫৩ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালে মুজিকার নেতৃত্বে উরুগুয়ের অর্থনীতিতে দারিদ্র্যের হার কমে আসে এবং বেকারত্বও নিম্ন পর্যায়ে ছিল। ৩০ লাখের বেশি জনসংখ্যার দেশটিতে ক্ষমতা ছাড়ার সময় মুজিকার অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তা ছিল প্রায় ৭০%।
মার্কসবাদী-লেনিনবাদী গেরিলা গোষ্ঠী ‘তুপামারোস’ থেকে মূলধারার রাজনীতিতে মুজিকার যাত্রা লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তার জনপ্রিয়তার মূলে তাঁর সরল দার্শনিক চিন্তাভাবনা।
উরুগুয়ের সীমানা পেরিয়ে ‘পেপে’ মুজিকা আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন প্রথাবিরোধী নেতৃত্ব ও বিনয়ের প্রতীক হিসেবে। কেবল তার গেরিলা অতীত বা গর্ভপাত, গাঁজা ও সমকামী বিয়ের বৈধতা এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান থেকে শরণার্থীদের পুনর্বাসনের মতো প্রগতিশীল নীতির জন্যই নয়, বরং তার অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপন এবং ভোগবাদ ও বৈশ্বিক বৈষম্যের তীক্ষ্ণ সমালোচনার জন্যও তিনি বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেন।
উরুগুয়ের বর্তমান রাষ্ট্রপতি ইয়ামান্দু ওরসি এক্স হ্যান্ডলে এক শোকবার্তায় বলেন, ‘গভীর দুঃখের সঙ্গে আমরা আমাদের কমরেড পেপে মুজিকার প্রয়াণের খবর জানাচ্ছি। প্রেসিডেন্ট, রাজনৈতিক কর্মী, পথপ্রদর্শক এবং নেতা। প্রিয় বন্ধু, আপনাকে আমরা খুব মিস করব।’
বলিভিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস তার ‘অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞাকে স্মরণ করেন। ব্রাজিল সরকার তাকে ‘আমাদের সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানবতাবাদী’ হিসেবে অভিহিত করে শোক প্রকাশ করেছে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, ‘মুজিকা একটি উন্নত বিশ্বের জন্য বেঁচে ছিলেন।’ গুয়াতেমালার বার্নার্ডো আরেভালো তার শোকবার্তায় তাকে ‘নম্রতা এবং মহত্ত্বের উদাহরণ’ হিসেবে তুলে ধরেন।
২০১০-১৫ সালের মেয়াদে মুজিকা তার বেতনের বেশির ভাগ অংশ দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান করে ‘বিশ্বের দরিদ্রতম প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে খ্যাতি পান। তিনি স্যান্ডেল পরে সরকারি অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন এবং মন্টেভিডিওর উপকণ্ঠে তার ছোট্ট খামারে বসবাস করতেন। বাড়িতে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ বলতে ছিল ১৯৮৭ সালের একটি ফক্সওয়াগন বিটল গাড়ি।
২০২০ সালে রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার পরেও তার সেই ‘চাকরা’ বা ক্ষুদ্র খামার বামপন্থী রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক এবং অনুরাগীদের তীর্থস্থানে পরিণত হয়।
মুজিকা ভোগবাদের সংস্কৃতির ফলে পৃথিবীর পরিবেশের যে ক্ষতি হয়, তার কঠোর সমালোচক ছিলেন। তিনি একবার বলেন, ‘আমরা আত্মঘাতী সমাজ তৈরি করেছি। আপনার কাজ করার সময় আছে, কিন্তু বাঁচার সময় নেই।’
২০২৪ সালের মে মাসে মুজিকার ক্যানসার ধরা পড়ে। মুজিকার স্ত্রী লুসিয়া তোপোলানস্কি বেঁচে আছেন। গেরিলা যোদ্ধা থাকার সময় লুসিয়ার সঙ্গে মুজিকার পরিচয়। এই দম্পতির কোনো সন্তান নেই। মৃত্যুর আগে তিনি সেই খামারে, তার পোষা কুকুরের পাশে সমাহিত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে গেছেন। সূত্র: গ্লোবাল টাইমস এবং রয়টার্স
সুলতানা দিনা/