গত শুক্রবার ভোরে ইসরায়েলের আচমকা হামলার পর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কতটা ক্ষতি হলো তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশ কৌতূহল রয়েছে। হামলার পর ইরানের পরমাণু কর্মসূচি কতটা অক্ষত আছে তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হলেও এখন পর্যন্ত ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতি খুব একটা বেশি নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এমনকি ইরানের পক্ষ থেকেও ‘সীমিত ক্ষয়ক্ষতির’ ধারণা দেওয়া হয়েছে। তবে ইসরায়েলি হামলায় প্রকৃতপক্ষে কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইন্সটিউটের রিসার্চ ফেলো বুরসু ওজেলিক-এর বরাত দিয়ে লন্ডনের দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, পরমাণু স্থাপনায় ক্ষয়-ক্ষতির প্রকৃত অবস্থা নিরূপণ করা দুঃসাধ্য।
গত শুক্রবার ভোররাত থেকে ইসরায়েল ইরানের সামরিক নেতৃত্ব, পরমাণু বিজ্ঞানী, একাধিক সামরিক স্থাপনা এবং আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় সফল হামলা চালাতে পারলেও পারমাণবিক স্থাপনায় তাদের হামলায় তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলেই উপগ্রহের ছবিতে দেখা যাচ্ছে।
ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির পরমাণু বিশেষজ্ঞ ডেভিড অলব্রাইট বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘প্রথম দিনের লক্ষ্য ছিল চমকে দেওয়া, নেতৃত্বকে হত্যা করা, এরপর পরমাণু বিজ্ঞানীরা, এরপর আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা কমানো। কিন্তু আমরা ফোরদো বা ইস্ফাহানে কোনো দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতি দেখিনি। নাতাঞ্জে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, কিন্তু ভূগর্ভস্থ সাইটটি ধ্বংস হয়েছে এর কোনো প্রমাণ নেই।’
গত শুক্রবার জাতিসংঘের আণবিক শক্তি সংস্থার (আইইএই) প্রধান রাফায়েল গ্রোসি নিরাপত্তা পরিষদকে বলেছেন, ‘ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনায় মাটির ওপরে থাকা সমৃদ্ধকরণের পাইলট কেন্দ্রটি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং ইরান তাদের ফোরদো ও ইস্ফাহানের পারমাণবিক স্থাপনায়ও হামলা হওয়ার খবর দিয়েছে।’
গ্রোসি বলেছেন, ‘নাতাঞ্জের বৈদ্যুতিক কাঠামোও ধ্বংস হয়েছে এবং ক্যাসকেড হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় সেখানে হয়তো সেন্ট্রিফিউজগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’ তবে নাতাঞ্জের বাইরে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা বদলায়নি এবং স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানান তিনি।
সংবাদদাতারা বলছেন, নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনাই ইরানের প্রধান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র। এ স্থাপনার মধ্যে আছে বিশাল ভূগর্ভস্থ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র এবং মাটির ওপরে একটি ছোট পাইলট সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র।
ইসরায়েলের হামলার পর টেলিফোনে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘ইসরায়েলের হামলার পর ইরানের আদৌ কোনো পরমাণু কর্মসূচি আছে কি না, তা নিয়ে তিনি সন্দিহান। কেউ জানে না, কিন্তু এ ছিল বিধ্বংসী আঘাত।’
অলব্রাইট বলছেন, তিনি ইরানের পরমাণু স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে যে পর্যালোচনা দিয়েছেন, তার ভিত্তি হচ্ছে শুক্রবার তেহরানের সময় সকাল ১১টা ২০ পর্যন্ত পাওয়া ছবি। স্থাপনাগুলোর টানেলে ড্রোন দিয়ে হামলা হতে পারে, হতে পারে সাইবার হামলাও। এসবের বেশ ক্ষয়ক্ষতি হলেও ওপর থেকে তা বোঝা নাও যেতে পারে। দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনায় খুব একটা কিছু হয়নি। ইসরায়েলের হামলা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে।
অলব্রাইট বলছেন, ইরানের কাছে কী পরিমাণ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে তা অজানা। হতে পারে, ইসরায়েল পরমাণু স্থাপনাগুলোতে বড় ধরনের হামলা থেকে বিরত থেকেছে সেখানে থাকা আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের কথা ভেবে।
নাতাঞ্জের ভূগর্ভস্থ কেন্দ্রে অন্তত কয়েক হাজার সেন্ট্রিফিউজ আছে এবং সেখানে বৈদ্যুতিক সরবরাহ বন্ধ হলে ব্যাকআপ ব্যাটারি চালু হওয়ার কথা। সম্ভবত ইরান ‘নিয়ন্ত্রিত উপায়ে’ ওই ভূগর্ভস্থ কেন্দ্রের সেন্ট্রিফিউজগুলো বন্ধ করছে।
তিনি আরও বলেন, ব্যাটারি সাধারণত অনেকক্ষণ থাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা নিঃশেষ হয়ে আসবে এবং যদি অনিয়ন্ত্রিত উপায়ে সেন্ট্রিফিউজগুলো বন্ধ করা হয়, তাহলে অনেক কিছুই ঘটতে পারে।
ইরান যদিও বলছে, পারমাণবিক অস্ত্র বানানো তাদের লক্ষ্য নয়, তাদের কর্মসূচি একেবারেই শান্তিপূর্ণ। কিন্তু তেল আবিব এবং তার মিত্রদের ধারণা, তেহরান এরই মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।
মিডলবুরি ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তাররোধ বিশেষজ্ঞ জেফরি লুইস বলছেন, ‘তার ধারণা নাতাঞ্জের স্থাপনার ক্ষতি হয়েছে ‘মাঝারি ধরনের’। ইসরায়েল পাইলট জ্বালানি সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র ধ্বংস করেছে, সঙ্গে ধ্বংস করেছে কিছু সহায়ক ভবন, যেগুলো বিদ্যুৎ সরবরাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ভূগর্ভস্থ সমৃদ্ধকরণ হল, তার কাছাকাছি পাহাড়ে থাকা সুবিশাল ভূগর্ভস্থ স্থাপনা মনে হচ্ছে অক্ষতই আছে।
ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনার কেমন ক্ষতি হয়েছে, তা এখনো বোঝা যাচ্ছে না। ইরান পরমাণু অস্ত্র বানালে এই স্থাপনাটিই ব্যবহারের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে অনেকে মনে করেন। এটি মাটির অনেক গভীরে বিস্তৃত।
থিংক ট্যাংক ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসির প্রধান মার্ক ডুবোউইটজ এক পডকাস্টে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা ছাড়া ইসরায়েলের কাছে ফোরদোকে ধ্বংস করার মতো অস্ত্র নেই।’
যুক্তরাষ্ট্রের ভান্ডারে ৩০ হাজার পাউন্ড (১৪ হাজার কেজি) ওজনের শক্তিশালী বাংকার বিস্ফোরক বোমা আছে।
তিনি বলেন, ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে রাজি না হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তার বি-টু বোমারু বিমানগুলো ফরদো ধ্বংসে কাজে লাগাতে পারে। ইরানি পরমাণু সংস্থার দাবি, ফরদো পরমাণু কেন্দ্রে সামান্যই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সূত্র: জাপান টাইমস ও রয়টার্স