ইরান-ইসরায়েল চলমান উত্তেজনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতি বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছে আন্তর্জাতিক মহল। এই আলোচনায় জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কয়েকটি দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র সক্রিয় ভূমিকা রাখছে বলে জানা গেছে। এই আলোচনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধ করা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরমাণু চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অগ্রগতি অর্জন করা।
সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় শুক্রবার (২০ জুন) ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনায় বসতে যাচ্ছেন জার্মানি, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। জার্মান কূটনৈতিক সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে। সূত্রটি জানায়, প্রথমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিক কাজা কালাসের সঙ্গে জেনেভায় জার্মানির স্থায়ী মিশনে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যৌথ বৈঠক করবেন তারা।
যুদ্ধ থামানো এবং পারমাণবিক উত্তেজনা হ্রাসের জন্য একটি নতুন কূটনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে জেনেভা আলোচনার মধ্য দিয়ে। তবে এই আলোচনা কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সদিচ্ছা ও বাস্তব সিদ্ধান্তের ওপর।
এদিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ আজ একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছে আল-জাজিরা। মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ নিয়ে জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছে নিরাপত্তা পরিষদ।
জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি কোনো আলোচনায় থাকছে না। তবে কাতার ও ওমানের মাধ্যমে ‘ব্যাক চ্যানেল’ বা গোপন সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে।
এই আলোচনা মূলত ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক চুক্তির ভিত্তিতে নতুন একটি সমঝোতা তৈরির লক্ষ্যেই এগোচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৮ সালে ওই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যান। এরপর ইরান ধীরে ধীরে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বাড়িয়েছে, যা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
এদিকে কাতার ও ওমানও এই আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে কাতার সম্প্রতি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক দফায় আলোচনায় বসেছে বলে জানা গেছে। ওমানের রাজধানী মাসকাটেও কয়েকটি ‘গোপন বৈঠক’ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
জানা গেছে, নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক আয়োজনের অনুরোধ জানায় ইরান। দেশটির অভিযোগ, ইসরায়েল যে বিমান হামলা চালিয়েছে, তা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের সুস্পষ্ট উদাহরণ এবং এতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়িত। এই অভিযোগের ভিত্তিতে ইরান দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপ কামনা করছে।
ইরানের আবেদনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে নিরাপত্তা পরিষদের প্রভাবশালী সদস্য চীন ও রাশিয়া। তাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে পাকিস্তানও। এই তিন দেশের যৌথ সমর্থনেই দ্রুত বৈঠক আহ্বানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈঠকে ইসরায়েল-ইরানের সামরিক উত্তেজনা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে ঘিরে নতুন কূটনৈতিক উত্তাপ সৃষ্টি হতে পারে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বড় ধরনের সংঘাত দেখা দিতে পারে। এতে বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটতে পারে। এ কারণেই পশ্চিমা দেশগুলো চায়, যুদ্ধ থামুক এবং কূটনীতির মাধ্যমে ইরানকে পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করতে রাজি করানো হোক।
বিশ্ব রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘এখন সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি আলোচনার মাধ্যমে ইরানকে রাজি করানো না যায়, তাহলে সংঘাত আরও ভয়াবহ হতে পারে।’
এদিকে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস জানিয়েছেন, তিনি এ আলোচনাকে স্বাগত জানান এবং আশা করছেন, সব পক্ষ কূটনৈতিক সমাধানের জন্য আন্তরিক হবে।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে চীন, রাশিয়া ও তুরস্কও মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনার জন্য আলোচনার পক্ষে মত দিয়েছে। ফলে একটি আন্তর্জাতিক সহমতের ভিত্তিতে আলোচনার পথ সুগম হতে পারে।
১৩ জুন ইসরায়েল হঠাৎ করে ইরানের অভ্যন্তরে কয়েকটি সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালায়। লক্ষ্যবস্তু ছিল ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও গবেষণা কেন্দ্র। ইসরায়েলের দাবি, এগুলো ইরানের আগ্রাসনের প্রস্তুতি ঘাঁটি।
প্রতিশোধ নিতে দেরি করেনি ইরান। পাল্টা জবাবে তারা শতাধিক ড্রোন ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ইসরায়েলের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ও শহরে আঘাত হানে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলা এই পাল্টাপাল্টি হামলায় দুই দেশের বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন, ধ্বংস হয়েছে অসংখ্য অবকাঠামো।
এর আগেও গত ১৩ জুন এই ইস্যুতে একবার জরুরি বৈঠকে বসেছিল নিরাপত্তা পরিষদ। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি পরিষদটি। বরং এর পরেই সংঘাত আরও বেড়েছে। এবার ইরানের পক্ষ থেকে সরাসরি অভিযোগ আসায় এবং নতুন করে সমর্থন জুটে যাওয়ায় আলোচনায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে।
ইসরায়েল-ইরান দ্বন্দ্ব শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পারমাণবিক শক্তিধর দুটি দেশের সরাসরি সংঘর্ষে যেভাবে উচ্চ-প্রযুক্তির অস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক পরিসরে নতুন সামরিক প্রতিযোগিতার আশঙ্কাও তৈরি করছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস এর আগে দুই পক্ষকেই সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানালেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। ইতোমধ্যে তেলের দাম বেড়েছে ৭ শতাংশের বেশি। বিশ্ববাজারে নিরাপত্তাহীনতা ও সরবরাহ চেইনের আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা শঙ্কিত।
ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার মধ্যে এই নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। যুদ্ধ বিরতির কোনো প্রস্তাব আসবে, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে আরও তর্ক বাড়বে-সবই নির্ভর করছে আজকের আলোচনার ফলাফলের ওপর।