ব্রিটিশ-সমর্থিত ইরানের শাহবিরোধী আন্দোলনের দুই নেতা ১৯৭৮ সালের অক্টোবরে একটি বৈঠকে বসেন বিপ্লবের শেষ পর্যায়ের পরিকল্পনা করতে। বৈঠকটি হয়েছিল প্যারিসের উপশহর ন্যুফলে-লো-শ্যাতোতে। এই দুই নেতার মধ্যে মিল ছিল খুব সামান্য। তবে তাদের জাতীয়তা, বয়স ও শাহকে ক্ষমতা থেকে সরানোর সংকল্প ছিল অভিন্ন। করিম সানজাবি ছিলেন সেকুলার লিবারেল ‘ন্যাশনাল ফ্রন্ট’-এর নেতা এবং আইন বিষয়ের অধ্যাপক। অপরজন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। যিনি ১৯৬০-এর দশক থেকে ইরানি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধাচারী প্রধান শিয়া ধর্মীয় নেতা ছিলেন।
সানজাবি একটি খসড়া ঘোষণাপত্র নিয়ে প্যারিসে যান। যেখানে লেখা ছিল- এই বিপ্লব হবে ‘গণতান্ত্রিক ও ইসলামি’ ভিত্তিতে। কিন্তু পরে তিনি ইতিহাসবিদদের জানান, খামেনি নিজ হাতে সেখানে তৃতীয় একটি মূলনীতি যুক্ত করেন। সেটি হলো- ‘স্বাধীনতা’।
ইরানের ঔপনিবেশিক শোষণের ইতিহাস থেকে উৎসারিত এই ‘স্বাধীনতার’ নীতি- যা বর্তমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্রবিরোধে আপাতদৃষ্টিতে এক জটিল প্রশ্নের ব্যাখ্যা দেয়। আর তা হলো- কেন ইরান জেদ ধরে পারমাণবিক ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার চায়। দুই দশক ধরে পশ্চিমাদের সঙ্গে এই ইস্যুতে তাদের আলোচনা থেমে থেমে চলেছে। যা শেষ পর্যন্ত ২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসনের অধীনে স্বাক্ষরিত জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশনের (জেসিপিওএ) মাধ্যমে নিষ্পত্তি পায়। কিন্তু ২০১৮ সালে ট্রাম্পের একতরফাভাবে সেই চুক্তি বাতিল ও এরপর ইসরায়েল এবং এখন আমেরিকার সামরিক হামলা এই বিরোধকে আবারও চাঙ্গা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রর চোখে বিষয়টি অনেকটা এমন- ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণ চেষ্টার পেছনে গুপ্তভাবে পারমাণবিক বোমা তৈরির উদ্দেশ্য আছে। যদিও দেশটির সর্বোচ্চ নেতা এই ধরনের অস্ত্রকে ‘ইসলামবিরোধী’ বলে ফতোয়া দিয়েছেন। তবে এটিকে অনেক আমেরিকান ধোঁয়াশা বলে মনে করেন। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, ‘বেসামরিক পারমাণবিক শক্তির চাহিদা এক জিনিস, কিন্তু উচ্চ পর্যায়ের সমৃদ্ধিকরণ চাওয়া, বিশেষ করে যখন কেউ নিরস্ত্রীকরণ চুক্তির নিয়ম লঙ্ঘন করে, এটা সম্পূর্ণ ভিন্ন।’
তবে কেন ইরান এই উচ্চ পর্যায়ের সমৃদ্ধির পথে গেল?
ইরান বলেছে, এটি ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের চুক্তি বাতিলের পাল্টা প্রতিক্রিয়া। যেখানে চুক্তিভঙ্গ করে ইরানকে নিষেধাজ্ঞা থেকে যে স্বস্তি দেওয়ার কথা ছিল, তা দেওয়া হয়নি। ইউরোপের সঙ্গেও বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে ইরানের রাজনীতিতে বিশ্বাস জন্মায় যে, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাসযোগ্য নয় এবং ইরান প্রতারিত হয়েছে।
স্বাধীনতা- জাতীয় পরিচয়ের মূল স্তম্ভ
ভালি নাসরের নতুন বই ‘ইরানস গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজি’তে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে বুঝতে হলে দেশটির ঔপনিবেশিক অতীত ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে বোঝা জরুরি। ১৯ ও ২০ শতকে ব্রিটিশ এবং রুশ প্রভাব, ১৯৫৩ সালে মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের সিএআই প্ররোচিত পতন- সবকিছু ইরানিদের মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত করে দেয়। যার সার কথা- ইরানকে নিজের ভবিষ্যৎ নিজেকেই রচনা করতে হবে।
একটি পশ্চিমা ধারণা, কিন্তু এখন জাতীয় গর্ব
আশ্চর্যজনকভাবে, ইরানে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রথম আনেন মার্কিন ও ব্রিটিশরাই। ‘অ্যাটমস ফর পিস’ নামে একটি কর্মসূচির অধীনে শাহ ২৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিকল্পনা করেন। তখনো বিষয়টি পশ্চিমা আধুনিকতার প্রতীক ছিল। কিন্তু ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর খোমেনি এটিকে পশ্চিমা ভোগবাদ ও নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেন। ‘ঘারবজাদেগি’- পশ্চিমমোহ-এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে প্রকল্প বাতিল করা হয়। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই ইরানে বিদ্যুৎ সংকট, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও ইরাকের রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের পরিপ্রেক্ষিতে গোপনে আবার শুরু হয় পারমাণবিক কর্মসূচি। ১৯৯০-এর দিকে ইরান ঘোষণা করে, ২০০৫ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ পারমাণবিক শক্তি থেকে উৎপন্ন হবে। হাশেমি রাফসানজানি বিজ্ঞানীদের আহ্বান জানান দেশে ফিরে আসতে। এই কর্মসূচি তখন পরিণত হয় ‘জাতীয় গৌরবে’। ২০০২ সালে বিরোধী দলের এক ফাঁস ও সম্ভবত ইসরায়েলি গোয়েন্দা মোসাদের মাধ্যমে জানা যায়, ইরানে দুটি গোপন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র রয়েছে- নাতাঞ্জ ও কাশানে। যদিও ইরান তখন বলেছিল, এগুলো অপারেশনাল নয় বলে আইএইএকে জানানোর প্রয়োজন ছিল না।
শুরু হয় দীর্ঘ কূটনৈতিক লড়াই
২০০৩-২০০৫ সালে ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা হয়। ইরান সাময়িকভাবে পরমাণু সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখলেও এই স্থগিতাদেশকে ‘স্বেচ্ছাকৃত আত্মবিশ্বাস তৈরির পদক্ষেপ’ হিসেবে দেখা হয়, কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা নয়। ২০০৫ সালে মাহমুদ আহমাদিনেজাদ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ইরান তার অবস্থান আরও শক্ত করে। তিনি বলেন, ‘আমাদের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি দরকার- বিদ্যুৎ, চিকিৎসা ও কৃষিতে ব্যবহারের জন্য।’
পরমাণু প্রযুক্তি: গর্ব, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক মর্যাদার প্রতীক
জাতিসংঘের আণবিক সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ আল বারাদি বলেন, ইরান প্রকৃতপক্ষে পারমাণবিক সক্ষমতা চায় তার আঞ্চলিক প্রভাব ও মর্যাদা অর্জন এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য। হাসান রুহানিও ওয়াশিংটন পোস্টে বলেন, ‘পারমাণবিক জ্বালানির মালিকানা শুধু শক্তি বৈচিত্র্যের জন্য নয়, বরং এটি ইরানি জাতির সম্মান ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক।’
তবে কি এই কর্মসূচি ইরানের জন্য আত্মঘাতী হলো?
যদি এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতা অর্জন হয়, তাহলে এর জন্য ইরান চূড়ান্ত মূল্য দিয়েছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং সামরিক হামলার মধ্য দিয়ে। তবুও আত্মনির্ভরতা ও আত্মমর্যাদা অর্জনের স্বপ্ন আজও দেশটির পরমাণু কর্মসূচির কেন্দ্রে রয়ে গেছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ বলেছেন, ইরান তাদের পরমাণু কর্মসূচি এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার ক্ষেত্রে ‘শূন্য থেকে শুরু করছে।’ গতকাল মঙ্গলবার দ্য জেরুজালেম পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্মোট্রিচ বলেন, এই যুদ্ধ একটি ব্যতিক্রমী সাফল্য। তারা (ইরান) এখন পারমাণবিক কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র দুই ক্ষেত্রেই শূন্য থেকে শুরু করছে। তবে আমি মনে করি না তারা এই কর্মসূচিগুলো আবার শুরু করার সাহস দেখাবে। কারণ তাতে তাদের যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি হতে হবে।
লেখক: দ্য গার্ডিয়ানের ডিপ্লোম্যাটিক এডিটর