ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার ১২ দিনের যুদ্ধ শেষ হয়েছে গত মঙ্গলবার (২৪ জুন)। ওইদিন সকালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি ‘পূর্ণ যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর হয়েছে বলে ঘোষণা দেন। সেই থেকে যুদ্ধ আপাতত বন্ধ রয়েছে। যুদ্ধের সময় ইসরায়েল সংবাদ ও ক্ষয়ক্ষতি প্রকাশের ওপর এক ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। কিন্তু যুদ্ধবিরতির পর ক্ষয়ক্ষতির যে খবর আসছে তা খুবই ব্যাপক ও ভয়াবহ। ইরানের হামলায় হওয়া ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ইসরায়েলের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১২ দিনের যুদ্ধে ইরান পাল্টা হামলা হিসেবে ইসরায়েলে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। তেল আবিব ও উপকূলীয় শহর হাইফাকে লক্ষ্য করে বেশির ভাগ হামলা চালানো হয়। মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলেও হামলা চলে। এর মধ্যে প্রথম ও শেষ দিনের হামলা ছিল ব্যাপক। হামলায় শত শত বহুতল ভবন মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়। কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র বিদ্যুৎ কেন্দ্রে আঘাত করায় বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটে। দক্ষিণ ইসরায়েলে প্রায় ৮ হাজার মানুষ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। কয়েকটি রেল স্টেশনেরও ক্ষতি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। টানা কয়েকদিন ইসরায়েলিরা স্বাভাবিক জীবন বাদ দিয়ে বাংকারে আশ্রয় নেন। ইরানের ব্যাপক ও দৃঢ় হামলায় নেতানিয়াহু সরকার ভয় পেয়ে যায়। বাধ্য হয়ে তারা যুদ্ধবিরতিতে যাওয়ার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে সহযোগিতা চায়। এর পরই ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, যুদ্ধ বন্ধের পর থেকেই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষয়ক্ষতির চিত্র বেরিয়ে আসছে। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মঙ্গলবার পর্যন্ত ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের সরাসরি আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৩৯ হাজার মানুষ ক্ষতিপূরণ দাবি করে আবেদন করেছেন।
ইসরায়েলি পত্রিকার বরাত দিয়ে গতকাল বুধবার তুরস্কের আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, ইসরায়েলি কর দপ্তরের অধীন ক্ষতিপূরণ তহবিলে এখন পর্যন্ত ৩৮ হাজার ৭০০টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ভবনের ক্ষতির জন্য ৩০ হাজার ৮০৯টি আবেদন, যানবাহনের ক্ষতির জন্য ৩ হাজার ৭১৩টি এবং যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সামগ্রীর ক্ষতির জন্য ৪ হাজার ৮৫টি আবেদন জমা পড়েছে।
পত্রিকাটি আরও জানিয়েছে, ‘অনুমান করা হচ্ছে আরও হাজারও ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেগুলোর জন্য এখনো কোনো ক্ষতিপূরণের আবেদন জমা দেওয়া হয়নি।
অবকাঠামোগত ক্ষতি ছাড়াও ১২ দিনের এই যুদ্ধে ইসরায়েল আর্থিকভাবেও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। যুদ্ধে তাদের ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের খবরে বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহে ইসরায়েল খরচ করেছে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার। এতে প্রতিদিন যুদ্ধে ব্যয় করতে হয়েছে ৭২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এর মধ্যে কেবল ইরানে হামলা চালাতেই ব্যয় হয়েছে প্রতিদিন ৫৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার। আর ১৩ কোটি ২০ লাখ ডলার খরচ হয়েছে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও সামরিক বাহিনীকে সচল রাখার জন্য। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, অ্যান্টি মিসাইল সিস্টেমে প্রতিদিন ইসরায়েলকে খরচ করতে হয়েছে, ১ কোটি থেকে প্রায় ২০ কোটি ডলার পর্যন্ত।
আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব প্যালেস্টাইনের ফাইন্যান্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাসের আব্দেল করিম আনাদোলু বার্তা সংস্থাকে বলেন, ‘যুদ্ধ কেবল ইসরায়েলের সামরিক ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেনি, এই যুদ্ধ দেশের উৎপাদন ব্যবস্থাতেও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। আর সেই হিসাব করলে ইসরায়েলের যুদ্ধের ক্ষতি ২০ বিলিয়ন ডলারের ওপরে যাবে।
আব্দেল করিম মত প্রকাশ করেন যে, এই যুদ্ধের ফলে ইসরায়েলের বাজেট ঘাটতি ৬ শতাংশের বেশি হবে। আর যখন ক্ষতিপূরণের দরখাস্তগুলোর দাবি পূরণ শুরু হবে তখন ইসরায়েলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও অবনতি ঘটবে। যুদ্ধ শুরুর প্রথম সপ্তাহে ইসরায়েল ১০ হাজারের বেশি লোককে অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে। এতেও বেশ ব্যয় হয়েছে।
আব্দেল করিম বলেন, আগামী বাজেটে ঘাটতি মোকাবিলায় তেল আবিব সরকার তিনটি কৌশল নিয়েছে। এতে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সরকারি ব্যয়ে লাগাম টানতে পারেন নেতানিয়াহু। তিনি কর বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে পারেন। ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রেও কৃচ্ছ্র সাধন করতে পারেন।
ইসরায়েলের অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রতিরক্ষা খাতের বাজেটে বড় ধরনের টান পড়েছে। অন্যান্য খাত থেকে অর্থ সরিয়ে ৮৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত থেকে অন্তত ২০ কোটি ডলার স্থানান্তর করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ইসরায়েলের ব্যবসা ও বিনিয়োগ খাতেও যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে। এর ফলে দেশটির প্রবৃদ্ধির গতি আরও ধীর হয়ে যেতে পারে। বেকারত্ব আরও বাড়তে পারে এবং দারিদ্র্যের হার আরও বেড়ে যেতে পারে।
গত ১৩ জুন থেকে ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় বিমান হামলা শুরু করে। ইসরায়েলের দাবি , ইরান নাকি পারমাণবিক বোমা তৈরির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে, যদিও ইরান দৃঢ়ভাবে এই দাবি অস্বীকার করে আসছে। এর জবাবে ইরানও পাল্টা ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে ওঠে যে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হস্তক্ষেপ করে এবং গত রবিবার ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালায়। টানা ১২ দিনের যুদ্ধের পরে মঙ্গলবার সকালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান যে, ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছেছে।