এখন আমি আমার চিন্তাভাবনা দিয়ে কম্পিউটার নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। আর মনে হচ্ছে আমি এখন ইচ্ছামত চলতেও পারি!- বলছেন একজন টেট্রাপ্লেজিক রোগী, যিনি চীনের প্রথম ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেস চিকিৎসার ইন-ম্যানুয়ান ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অংশ নিয়েছেন। এটি একটি ইনভেসিভ ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস (BCI) ডিভাইস ।
এই প্রযুক্তির মাধ্যমে রোগী শুধু চিন্তা করে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন বিভিন্ন ধরনের যন্ত্র। আর সেই প্রযুক্তি এবার গবেষণাগার থেকে পৌঁছে গেছে হাসপাতালের ওয়ার্ডে। বেইজিংয়ের থিয়ানথান হাসপাতালে চালু হয়েছে চীনের প্রথম বিসিআই ক্লিনিক্যাল ওয়ার্ড।
বিসিআই এমন এক প্রযুক্তি, যা মানব মস্তিষ্কের বিদ্যুৎতরঙ্গ শনাক্ত করে সেটাকে ডিজিটাল সংকেতে রূপান্তর করে। আর এতে করে রোগী চিন্তা করেই শরীরের প্যারালাইজড অংশ চালাতে পারেন বা নড়াচড়া করতে পারেন যান্ত্রিক কোনও অঙ্গ।
রবিবার (২৯ জুন) চীনের বিজ্ঞান একাডেমির সাংহাই-ভিত্তিক সেন্টার ফর এক্সিলেন্স ইন ব্রেন সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স টেকনোলজি (CEBSIT) সুত্রে গ্লোবাল টাইমস জানায়, ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের হুয়াশান হাসপাতালের সহযোগিতায়, কেন্দ্রটি ৫ মার্চ, ২০২৫ তারিখে হাই-থ্রুপুট ওয়্যারলেস ইনভেসিভ বিসিআই- দেশটির প্রথম ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালু করেছে।
ন্যূনতম অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে, তারা ২৫ মার্চ টেট্রাপ্লেজিয়া আক্রান্ত রোগীর শরীরে চীনের প্রথম ওয়্যারলেস ইনভেসিভ বিসিআই সিস্টেম সফলভাবে স্থাপন করেছে।
এই কেন্দ্রের এক বিবৃতি অনুসারে, অস্ত্রোপচার পরবর্তী মাত্র দুই থেকে তিন সপ্তাহের প্রশিক্ষণের পর, রোগী তার মন দিয়ে ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হন, দক্ষতার সাথে রেসিং গেম, দাবা এবং অন্যান্য প্রোগ্রাম পরিচালনা করেন।
CEBSIT-এর মতে, এই সাফল্যের ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের (নিউরালিংক) পর, চীন বিশ্বের দ্বিতীয় দেশ হিসেবে BCI প্রযুক্তির ক্লিনিকাল ট্রায়াল পর্যায়ে প্রবেশ করেছে ।
কেন্দ্রের মতে, ট্রায়ালে জড়িত এক রোগী ১৩ বছর আগে একটি উচ্চ-ভোল্টেজ বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনায় তার চারটি অঙ্গ হারিয়েছিলেন। গবেষণা দলের মতে, ২০২৫ সালের মার্চ মাসে ডিভাইসটি স্থাপনের পর থেকে, এটি তার মস্তিষ্কে স্থিরভাবে কাজ করছে, আজ পর্যন্ত কোনও সংক্রমণ বা ইলেকট্রোড ব্যর্থতার খবর পাওয়া যায়নি।
গবেষকদের মতে, মূলত নিউরোসায়েন্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানকে এক সুতোয় গেঁথেছে বিসিআই প্রযুক্তি। মানুষের প্রতিটি চিন্তাই মাথায় একধরনের বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি করে, যা বিসিআই সিস্টেম শনাক্ত করে এবং সেটাকে ডিভাইস নিয়ন্ত্রণের ভাষায় অনুবাদ করে।
এই প্রযুক্তি এখন শুধু হাত-পা নয়, কথা বলার ক্ষমতা ফেরাতেও কাজ করছে। যদিও এখনও এটি গবেষণা পর্যায়ে রয়েছে।
গবেষকরা আরও বলেন, ‘আমরা চলাফেরা ও কথা বলার ক্ষেত্রে ভালো ফলাফল দেখছি। তবে এখনও এটি গবেষণার পর্যায়ে—চূড়ান্ত প্রয়োগে সময় লাগবে।’
বিসিআই প্রযুক্তি শুধু হাসপাতালেই সীমিত নয়—এর পেছনে কাজ করছে চিকিৎসা সামগ্রী নির্মাতারাও। পূর্ব চীনের চিয়াংসু প্রদেশের রিশেনা নামের একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে এক অভিনব নিউরাল স্টিমুলেটর, যা রোগীর মাথায় বসানোর পর স্মার্টফোন অ্যাপেই ব্রেইনওয়েভ মনিটরিং সম্ভব।
নতুন নিউরাল স্টিমুলেটর এমনভাবে ডিজাইন করা যে, একবার বসানোর পর রোগীকে হাসপাতালে থাকার দরকার নেই। শুধু মোবাইল অ্যাপে ব্রেইনওয়েভ রেকর্ড করে ক্লাউডে আপলোড করলেই হবে—ডাক্তাররা সেখান থেকেই বিশ্লেষণ করে চিকিৎসা ঠিক করে দিতে পারবেন।
মানব মস্তিষ্কের বিদ্যুৎতরঙ্গ শনাক্ত করে সেটাকে ডিজিটাল সংকেতে রূপান্তর করে এই প্রযুক্তি।
সুলতানা দিনা/