ইসরায়েলি বোমা হামলায় প্রতিনিয়ত গাজায় মারা যাচ্ছেন ফিলিস্তিনিরা। হামলায় অনেক শিশুর বাবা-মা মারা গেছেন। আবার আহত অনেক শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এসব শিশুর অবস্থা খুবই করুণ। একেবারে হাড্ডি চর্মসার অবস্থা তাদের। এরকম শত শত শিশুকে এখন বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ছে। চিকিৎসকরা বলেছেন, ইসরায়েল গাজায় বেবি ফর্মুলা (নবজাতক ও ছোট শিশুদের খাওয়ানোর জন্য এক ধরনের দুধ) পৌঁছাতে বাধা দিচ্ছে। দুধের অভাবে এই হাড্ডিসার শিশুদের বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। গাজার বাসিন্দারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, দুধের তীব্র ঘাটতির মধ্যে শত শত শিশু এখন মৃত্যুঝুঁকিতে রয়েছে।
খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান ডা. আহমেদ আল-ফাররা বলেন, তার ওয়ার্ডে মাত্র এক সপ্তাহের জন্য প্রয়োজনীয় শিশু ফর্মুলা অবশিষ্ট ছিল। ডাক্তারদের কাছে থাকা শিশুদের জন্য বিশেষায়িত ফর্মুলা ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। তিনি নিয়মিত ফর্মুলা ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। তার তত্ত্বাবধানে থাকা শিশুদের মধ্যে এটির ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে।
চিকিৎসক আল-ফাররা ফোনে গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে আমি ভাষায় বর্ণনা করতে পারছি না। এই মুহূর্তে, আমাদের কাছে মাত্র এক সপ্তাহের বেবি ফর্মুলা আছে। কিন্তু আমাদের হাসপাতালের বাইরের শিশুরা কোনো দুধ পাচ্ছে না। এটা খুবই ভয়াবহ।’
ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েল সব কিছু আটকে দেওয়ায় গাজায় শিশু ফর্মুলার মজুত কমে গেছে। বিতর্কিত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সমর্থিত বেসরকারি সংস্থা গাজা হিউম্যানিটেরিয়ান ফাউন্ডেশনের (জিএইচএফ) মাধ্যমে যে খাদ্য সহায়তা আসছে তাতে শিশুর ফর্মুলা অন্তর্ভুক্ত নয়।
আল-নুসাইরাত শরণার্থী শিবিরে বসবাসকারী পাঁচ সন্তানের মা ২৭ বছর বয়সী হানা আল-তাওয়েল বলেন, ‘তিনি নিজে পর্যাপ্ত খাবার না পাওয়ায় শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারছেন না। তার ১৩ মাস বয়সী শিশুর জন্য দুধ খুঁজে পেতে তাকে রীতিমতো সংগ্রাম করতে হচ্ছে।’
দ্য গার্ডিয়ানকে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের জন্মের পর থেকেই দুধের সমস্যা শুরু হয়। কারণ অপুষ্টি এবং দুর্বলতার কারণে আমি আমার শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারিনি। চিকিৎসকরা তাকে বলেছেন যে, তার ছেলে অপুষ্টির কারণে অন্য শিশুদের তুলনায় ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে, যারা ইতোমধ্যেই তার বয়সে কথা বলতে এবং হাঁটতে শুরু করেছে।’
হানা আল-তাওয়েল আরও বলেন, ‘আমি যখন ঘুমাতে যাই তখন আমার পাশে একটা ছোট রুটির টুকরা রাখার চেষ্টা করি। কারণ আমার ছেলে প্রায়ই খাবারের জন্য ঘুম থেকে জেগে ওঠে। সন্তানদের জন্য আমার দুঃখ ও ভয় হয়। আমার আশঙ্কা, তারা ক্ষুধা, তৃষ্ণা এবং রোগে মারা যাবে।’
স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের মতে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইতোমধ্যেই ৬৬ জন ফিলিস্তিনি শিশু অনাহারে মারা গেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অভিযোগ করেছে যে, ইসরায়েল গাজার বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে অনাহারকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। এটি আসলে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ‘গণহত্যা চালানোর’ একটি কৌশল।
তবে গাজা উপত্যকায় মানবিক সহায়তা সমন্বয়ের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ‘কোগ্যাট’ জানিয়েছে, তারা গাজা উপত্যকায় ফর্মুলাসহ শিশুখাদ্য প্রবেশে কোনো বাধা দিচ্ছে না। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে গাজায় ১,৪০০ টনেরও বেশি শিশুখাদ্য সরবরাহ করা হয়েছে।
তবে বাস্তবে এর প্রতিফলন নেই। এই অবস্থায় গাজায় চিকিৎসকরা তাদের ব্যক্তিগত লাগেজে শিশু ফর্মুলার পৃথক ক্যান প্যাক করতে বাধ্য হচ্ছেন। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ চিকিৎসার জন্য গাজায় প্রবেশ করা একজন আমেরিকান চিকিৎসকের লাগেজ থেকে ১০টি শিশু ফর্মুলার ক্যান জব্দ করেছে। শেষ পর্যন্ত তারা বেবি ফর্মুলার সব ক্যান বাজেয়াপ্ত করে।
ফিলিস্তিনি-জার্মান চক্ষু সার্জন চিকিৎসক ডায়ানা নাজ্জাল বলছেন, গাজায় অনেক চিকিৎসাকর্মী চিকিৎসা সরবরাহের পরিবর্তে প্রোটিন বার এবং বাদামের মতো ক্যালোরি-ঘন খাবার দিয়ে তাদের ব্যাগ ভর্তি করছেন। তারা সেগুলো শিশুদের সরবরাহ করছেন।
গাজায় খাদ্যসংকট তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেবি ফর্মুলা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রায় ৫ লাখ মানুষ ভয়াবহ খাদ্যসংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন। বাকিরা তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
খবরে বলা হয়েছে, যেসব মা নিজেরাই মারাত্মক অপুষ্টিতে ভোগেন তারা বুকের দুধ খাওয়াতে সক্ষম নন। এসব ক্ষেত্রে ফর্মুলার চাহিদা বেড়ে যায়। বাজারে এর সামান্য সরবরাহ থাকায় দামও অত্যধিক। এক ক্যান ফর্মুলার দাম প্রায় ৫০ ডলার, স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ১০ গুণ বেশি।
খান ইউনিসে বাস্তুচ্যুত তিন সন্তানের জননী ২৫ বছর বয়সী নুরহান বারাকাত গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘আমি এক মাস আমার সন্তানকে স্বাভাবিকভাবে বুকের দুধ খাওয়াতে পেরেছিলাম। কিন্তু খাবারের অভাবে আমি আর চালিয়ে যেতে পারিনি। আমি জানি, বুকের দুধ খাওয়ালে মা এবং শিশুর মধ্যে শক্তিশালী বন্ধন গড়ে ওঠে। কিন্তু এই অবস্থায় আমি কী করতে পারি?’
গত জুনের শেষের দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম ঘেব্রেয়েসাস বলেন, প্রতিদিন গাজার হাসপাতালে প্রায় ১১২ জন শিশুকে অপুষ্টির চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হচ্ছে। অপুষ্টি এমন একটি সমস্যা, যা তিন বছর বয়সের আগে দেখা দিলে তা শিশুর বিকাশগত সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
চিকিৎসকরা বলেছেন , শিশুদের মৃত্যু গাজার আসন্ন খাদ্যসংকটের একটি উদ্বেগজনক লক্ষণ। কেননা, ছোট্ট শিশুরা অপুষ্টির প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকে। আন্তর্জাতিক গ্রুপ আভাজের মাধ্যমে সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা একটি মেডিকেল প্রতিনিধিদলের সদস্য ডা. থায়ের আহমেদ বলেন, ‘যখন আপনি দেখবেন শিশুরা মারা যেতে শুরু করেছে, তখন আতঙ্ক তৈরি হবে। খাদ্যসংকটে শিশুরাই প্রথম মারা যায়।’
চিকিৎসকরা ইসরায়েলি ত্রাণ অবরোধকে খাদ্য ঘাটতির জন্য দায়ী করেছেন। কারণ ইসরায়েল কয়েকটি ত্রাণ ট্রাক ছাড়া বাকি সব ট্রাককে এই অঞ্চলে প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। মানবিক সহায়তা প্রদানকারীরা বলছেন, ক্ষুধার্তদের জন্য যে পরিমাণ খাদ্যের প্রয়োজন সরবরাহ তার চেয়ে অনেক কম। জাতিসংঘের সংস্থাগুলো বলছে, গাজার মৌলিক চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন কমপক্ষে ৫০০ ট্রাক খাদ্যের প্রয়োজন। কিন্তু সেখানে প্রায়শই ৫০টির বেশি ট্রাক ঢুকতে দেয় না ইসরায়েল। তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান।