তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পে নতুন মাইলফলক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে দেশটির প্রথম হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘তাইফুন ব্লক-৪’ (Tayfun Block 4)। গতকাল মঙ্গলবার (২২ জুলাই) ইস্তাম্বুলে শুরু হওয়া আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা শিল্প মেলা ‘আইডিইএফ ২০২৫’-এর উদ্বোধনী দিনে ক্ষেপণাস্ত্রটির আনুষ্ঠানিক উন্মোচন করা হয়।
তুরস্কের শীর্ষস্থানীয় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘রকেটসান’ কর্তৃক নির্মিত এই ক্ষেপণাস্ত্রটির ওজন ২,৩০০ কেজি, দৈর্ঘ্য ৬.৫ মিটার এবং এটি সর্বোচ্চ ৮০০ কিলোমিটার দূরত্বের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। এতে রয়েছে উচ্চ গতি ও উন্নত গতিশীলতা, যা একে অন্যান্য ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় বিশেষায়িত করে তোলে।
রকেটসানের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘তাইফুন ব্লক-৪ ক্ষেপণাস্ত্র দীর্ঘ পাল্লার লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসে নতুন রেকর্ড স্থাপন করেছে। ৭ টনের বেশি ওজনের এই সংস্করণে রয়েছে বহুমুখী ওয়ারহেড, যা শত্রুপক্ষের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কমান্ড সেন্টার, সামরিক হ্যাঙ্গার এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় দূর থেকে আঘাত হানতে সক্ষম।’
মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বলেন, ‘আজ আমরা শুধু প্রতিরক্ষা শিল্পের অগ্রগতিই দেখছি না, বরং একটি জাতির স্বাধীনতার পথে এগিয়ে চলার সাক্ষী হচ্ছি। এটি এমন একটি দেশের গল্প, যা নিজের আকাশে, নিজের ডানায় ভর করে দাঁড়িয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তুরস্ক বহুদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা, বৈষম্য ও কূটনৈতিক চাপ মোকাবিলা করে আজ বিশ্ব প্রতিরক্ষা বাজারে গুরুত্বপূর্ণ একটি শক্তিতে পরিণত হয়েছে।’
মেলায় রেকর্ডসংখ্যক দেশের অংশগ্রহণ
১৭তম বারের মতো আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক মেলায় এবার অংশ নিচ্ছে ৯০০-এর বেশি দেশীয় এবং ৪০০ বিদেশি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান। ৪৪টি দেশের প্রতিনিধিত্ব থাকছে এবারের আইডিইএফ-এ। চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাজ্য, কাতার, সৌদি আরব, আজারবাইজান এবং পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের কোম্পানি ও প্রতিনিধি দল অংশ নিচ্ছে মেলায়।
বিশ্বখ্যাত প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান বিএই (BAE) সিস্টেমস, রোলস-রয়েস, লকহিড মার্টিন ও এয়ারবাস ছাড়াও তুরস্কের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান বায়কার, টার্কিশ অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ (TAI), আসেলসান, হাভেলসান, এফএনএসএস, ওতোকার, এমকেই ও রকেটসান মেলায় অংশ নিচ্ছে।
মেলায় বিভিন্ন ধরনের সামরিক সরঞ্জাম প্রদর্শন। ছবি: সংগৃহীত
মেলায় প্রদর্শিত হচ্ছে বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম, যার মধ্যে রয়েছে প্রধান যুদ্ধ ট্যাংক, সাঁজোয়া যান, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা, কৌশলগত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, গাইডেড মিউনিশন এবং মানববিহীন স্থলযান।
বিমান খাতে প্রদর্শিত হচ্ছে ফিক্সড-উইং প্ল্যাটফর্ম, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম, ইউএভি (ড্রোন), উড়োজাহাজের ইঞ্জিন এবং স্যাটেলাইট। নৌখাতে রয়েছে যুদ্ধজাহাজ, সহায়ক জাহাজ, সাবমেরিন, মানববিহীন নৌযান এবং কমান্ড কন্ট্রোল প্রযুক্তি।
এছাড়া লজিস্টিক ও নিরাপত্তা প্রযুক্তি নিয়েও রয়েছে বিশেষ প্রদর্শনী, যেখানে প্রতিরক্ষা খাতে উদ্ভাবন ও আধুনিকায়নের সামগ্রিক চিত্র উপস্থাপিত হচ্ছে।
মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে ইস্তাম্বুল ফেয়ার সেন্টার, আতাতুর্ক এয়ারপোর্ট, WOW হোটেল এবং আতাকয় মেরিনা—এই চারটি ভেন্যুতে। আয়োজনে রয়েছে কেএফএ ফেয়ারস, সহযোগিতায় তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প দপ্তর (SSB) এবং তুর্কি সশস্ত্র বাহিনী ফাউন্ডেশন।
এবারের মেলায় অংশ নিচ্ছেন বিশ্বের ১০৩টি দেশের মন্ত্রী, সামরিক প্রধান ও শীর্ষ কর্মকর্তারা, যা আইডিইএফ ২০২৫-কে আন্তর্জাতিক পরিসরে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা মেলায় পরিণত করেছে। সূত্র: তুর্কি টুডে
মাহফুজ/