গাজায় ইসরায়েল ক্ষুধাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে- এমন অভিযোগ আগে থেকেই করে আসছে জাতিসংঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন সহায়তা সংস্থা। এরই মধ্যে সেখানে ক্ষুধায় মারা যেতে শুরু করেছে মানুষ। শিশুরাও বাদ যাচ্ছে না। এমন একটি সময় খবর এসেছে যে গাজায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সহায়তা সংস্থা গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের (জিএইচএফ) বিতরণ কেন্দ্র ঘুরে দেখবেন আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ।
শুক্রবার (১ আগস্ট) গাজায় জিএইচএফের সহায়তা বিতরণ কেন্দ্রে যাওয়ার কথা ছিল উইটকফের। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি সেখানে যাননি। তার সফরের আগে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লিয়াভিট জানান, উইটকফ শুধু বিতরণ কেন্দ্র ঘুরেই দেখবেন না, কথা বলবেন স্থানীয় গাজাবাসীর সঙ্গেও। পাশাপাশি গাজার জন্য আরও সহায়তা পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়েও আলাপ করবেন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে।
পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে গোটা বিষয় সম্পর্কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও সফরের পরপরই অবহিত করবেন উইটকফ। এমন একটি দিনে উইটকফের এ সফর হচ্ছে, যার এক দিন আগেই গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ৫০ জন ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে। নিহত ফিলিস্তিনিদের মধ্যে রয়েছে শিশুরাও। ক্ষুধায় আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে অবরুদ্ধ উপত্যকাটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এই দুজনসহ গাজায় ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে মৃতের সংখ্যা ১৫৪-তে গিয়ে দাঁড়াল। নিহতদের মধ্যে ৮৯ জন শিশু।
গাজায় সহায়তা সংগ্রহে গিয়ে মৃত্যুর ঘটনাও আগের মতোই ঘটছে। শুক্রবারও খান ইউনিসের মোরাগ করিডরের কাছে খাবার সংগ্রহে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন দুই ফিলিস্তিনি। এ ছাড়া ইসরায়েলি হামলায় আহত হয়েছেন ৭০ জনেরও বেশি।
উইটকফ বৃহস্পতিবার (৩১ জুলাই) ইসরায়েল সফরে যান। সেখানে পা রাখার কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি দেখা করেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে। নেতানিয়াহুর দপ্তর থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বরাবরই দাবি করে আসছেন যে গাজায় ক্ষুধার বিষয়টি অসত্য। তবে চলতি সপ্তাহে বিপরীত বক্তব্য শোনা যায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মুখে। তিনি বলেন, অবরুদ্ধ উপত্যকাটি সত্যিকার অর্থেই ক্ষুধার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
জাতিসংঘ ও স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা গত কয়েক মাস ধরেই সতর্ক করেছেন যে মানবিক সহায়তায় ইসরায়েলি অবরোধের কারণে গাজায় ক্ষুধা বাড়ছে। চলতি সপ্তাহে তারা জানিয়েছে, দুর্ভিক্ষ এখন শুরু হচ্ছে। এদিকে গতকাল এক প্রতিবেদনে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) জানিয়েছে, ইসরায়েলের বেসামরিকদের বিরুদ্ধে ক্ষুধাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার আসলে ‘যুদ্ধাপরাধ’।
এইচআরডব্লিউর সংকট ও সংঘাতবিষয়ক সহযোগী বেলকিস উইলি বলেন, ‘ইসরায়েলি বাহিনী ফিলিস্তিনি বেসামরিকদের যে শুধু স্বেচ্ছায় ক্ষুধায় ভোগাচ্ছে তা নয়, বরং ইসরায়েলি সেনারা প্রায় প্রতিদিনই গুলি চালাচ্ছে গাজাবাসীর ওপর, যে সময়টিতে তারা হন্যে হয়ে খাবার খুঁজছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ইসরায়েলি বাহিনী ও বেসামরিক ঠিকাদাররা ত্রুটিপূর্ণ ও সামরিকী ধাঁচের একটি সহায়তা বিতরণব্যবস্থা নিয়ে এসেছেন, যা বিতরণ কেন্দ্রগুলোকে নিয়মিতই রক্তস্রোতে পরিণত করে।’
অধিকার গোষ্ঠীটি বিশ্বের দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, তারা যাতে ইসরায়েলের ওপর চাপ প্রয়োগ করে ফিলিস্তিনি বেসামরিকদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র প্রয়োগ বন্ধে। এ ছাড়া গাজায় সহায়তা প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞাও তুলে নেয়। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে জিএইচএফের সহায়তা বিতরণব্যবস্থা স্থগিত করার আহ্বানও জানিয়েছে তারা।
গাজায় সহায়তা ঢুকতে না দেওয়া ও ইসরায়েলের চলমান হামলায় ক্ষুব্ধ হয়ে সর্বশেষ যুক্তরাজ্য, কানাডা ও পর্তুগাল চলতি সপ্তাহে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেবে বলে জানিয়েছে। গত সপ্তাহে প্রথমে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেন, ফ্রান্স আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেবে। এর আগে একই ধরনের সিদ্ধান্ত জানায় স্পেন, নরওয়ে ও আয়ারল্যান্ড।
নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৃহস্পতিবার জেরুজালেমে এক বৈঠকের পর জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়েডফুল বলেন, গাজার মানবিক বিপর্যয় কল্পনাতীত। সূত্র: আল-জাজিরা