কাতারের দোহায় ইসরায়েলের হামলার পর গালফ অঞ্চলে নতুন অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুর রহমান বিন জাসিম আল থানি এরই মধ্যে বলেছেন, ওই হামলার বিরুদ্ধে গালফ অঞ্চলের অন্যান্য রাষ্ট্রের ‘সামষ্টিক প্রতিক্রিয়া’ জানাতে হবে। এরই মধ্যে আরব দেশগুলোর নেতারা কাতারের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন।
বুধবার (১০ সেপ্টেম্বর) মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কাতারের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করছি। পুরো গালফ অঞ্চলই ঝুঁকির মুখে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চাই এমন কিছু হোক, যা ইসরায়েলকে এই দমননীতি চালিয়ে যেতে নিরুৎসাহিত করবে।’
তিনি সরাসরি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দিকে অভিযোগের আঙুল তোলেন। শেখ মোহাম্মদের ভাষায়, নেতানিয়াহু গোটা অঞ্চলকে ‘অরাজকতার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন’।
আল-জাজিরার প্রতিবেদক চার্লস স্ট্র্যাটফোর্ড বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি যে কাতারে একটি আঞ্চলিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। আমরা জেনেছি যে দেশগুলো নিজেদের আইনি দল মোতায়েন করেছে। তারা নেতানিয়াহুকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের জন্য বিচারের মুখোমুখি করতে সব ধরনের আইনি প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখছে।’
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ফোনে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির সঙ্গে কথা বলেন এবং প্রকাশ্যে ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, ‘এই হামলা অগ্রহণযোগ্য। আমি এর নিন্দা জানাচ্ছি। কাতারের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তায় ফ্রান্স অটল।’
প্রসঙ্গত, গত মঙ্গলবার দোহায় হামাসের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক লক্ষ্য করে ইসরায়েলি সেনারা হামলা চালায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত গাজা যুদ্ধবিরতি আলোচনা নিয়েই ওই বৈঠক চলছিল। ইসরায়েলি হামলায় অন্তত সাতজন নিহত হন। তবে হামাস দাবি করেছে, তাদের নেতৃস্থানীয়রা অক্ষত আছেন। কাতারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের দুই নিরাপত্তা কর্মকর্তা প্রাণ হারিয়েছেন।
লেবাননের হিজবুল্লাহ নেতা নাঈম কাসেম এক বিবৃতিতে বলেন, কাতারে ইসরায়েলি হামলা মূলত গালফ দেশগুলোকে হুমকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে চালানো হয়েছে। তার ভাষায়, ‘আমরা কাতারের পাশে আছি, যাদের ওপর আক্রমণ হয়েছে। একই সঙ্গে আমরা ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের সঙ্গেও আছি।’ তিনি বলেন, ইসরায়েলের এই তৎপরতা মূলত তথাকথিত ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ গড়ার পরিকল্পনারই অংশ। এই ধারণা অনুযায়ী, চরমপন্থি ইসরায়েলিরা পশ্চিম তীর, গাজা, লেবানন, সিরিয়া, মিসর ও জর্ডানের কিছু অংশকে নিজেদের ভবিষ্যৎ ভূখণ্ড হিসেবে ধরে থাকে।
এদিকে এসবের মধ্যেও গাজায় ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ অব্যাহত আছে। গত বুধবার এক দিনেই অন্তত ৭২ জন নিহত হয়েছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা ৬৪ হাজার ৬৫০ ছাড়িয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনী এখন গাজা সিটি দখলের অভিযান আরও জোরদার করেছে। ওই স্থানে ১০ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনির বসবাস।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বলেন, দোহায় হামলা আসলে গাজায় শান্তি-প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করার জন্যই চালানো হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বৈঠকের খবর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ভালোভাবেই জানা ছিল। কিছুই গোপন ছিল না।
তিনি আরও যোগ করেন, নেতানিয়াহু যা করেছেন, তাতে করে এখন যে ২০ জন ইসরায়েলি বন্দি গাজায় জীবিত আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, তাদের মুক্তির সম্ভাবনাও ধ্বংস হয়ে গেল।
এদিকে আগের অবস্থানই ধরে রেখেছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। জাতিসংঘের সমালোচনাসহ বিশ্বের নেতৃস্থানীয়দের সমালোচনার মুখেও নেতানিয়াহু পাল্টা হুমকি দিয়ে চলেছেন।
গত বুধবার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বলেন, সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেওয়া কাতার ও সব রাষ্ট্রকে আমি বলতে চাই, হয় আপনারা তাদের বের করে দিন, আর না হয় তাদের বিচারের আওতায় আনুন। কারণ আপনারা যদি তা না করেন, তাহলে আমরা করব।’
ইসরায়েল হামাসের অনেক শীর্ষস্থানীয় সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাদের গত দুই বছরে হত্যা করেছে। এ রকম নেতাদের মধ্যে হামাসের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা ইয়াহিয়া সিনাওয়ার, সামরিক কমান্ডার মোহাম্মেদ দেইফও রয়েছেন। এ ছাড়া ইরানের রাজধানী তেহরানে হামলা চালিয়ে রাজনৈতিক প্রধান ইসমাইল হানিয়াহকেও হত্যা করেছে ইসরায়েল। সূত্র: আল-জাজিরা