যুক্তরাজ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্যারিবীয় সাগরে সন্দেহভাজন মাদকবাহী নৌযানের বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি করা স্থগিত করেছে। কারণ, লন্ডন আশঙ্কা করছে যে তাদের দেওয়া তথ্য ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র প্রাণঘাতী হামলা চালাতে পারে—যা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে তারা মনে করে। একাধিক সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে সংবাদ মাধ্যম সিএনএনকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ গোয়েন্দা সহযোগিতায় বড় ধরনের ভাঙন সৃষ্টি করেছে এবং লাতিন আমেরিকা অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনি বৈধতা নিয়ে বাড়তে থাকা সন্দেহকে স্পষ্ট করেছে।
সূত্রগুলো জানায়, বহু বছর ধরে যুক্তরাজ্য ক্যারিবীয় অঞ্চলের কিছু ভূখণ্ডে গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা করে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করে আসছিল। তাদের সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের কোস্টগার্ড সন্দেহভাজন মাদকবাহী জাহাজ আটক, তল্লাশি ও জব্দ করত। এই তথ্য সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডাভিত্তিক ‘জয়েন্ট ইন্টারএজেন্সি টাস্ক ফোর্স সাউথ’-এ পাঠানো হতো, যা মাদক পাচার ঠেকাতে আন্তর্জাতিক অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করে।
কিন্তু সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্র এসব নৌযানের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী হামলা শুরু করার পর থেকে যুক্তরাজ্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে যে তাদের গোয়েন্দা তথ্য হয়তো এসব হামলার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ব্যবহার করা হতে পারে। সূত্রগুলো জানায়, ব্রিটিশ কর্মকর্তারা বিশ্বাস করেন যে যুক্তরাষ্ট্রের এসব হামলা—যাতে এখন পর্যন্ত ৭৬ জন নিহত হয়েছেন—আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে। প্রায় এক মাস আগে থেকেই যুক্তরাজ্য গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া স্থগিত করেছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার টার্ক গত মাসে বলেছিলেন, এসব হামলা আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী এবং “বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড” হিসেবে গণ্য হতে পারে। সূত্রগুলো জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যও এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত।
এই বিষয়ে ওয়াশিংটনে ব্রিটিশ দূতাবাস ও হোয়াইট হাউস কোনো মন্তব্য করেনি। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের একজন কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, “গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে আমরা প্রকাশ্যে কথা বলি না।”
সেপ্টেম্বরের আগে যুক্তরাষ্ট্রে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হতো আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও কোস্টগার্ডের মাধ্যমে। তখন পাচারকারীদের অপরাধী হিসেবে বিচার করা হতো—যে প্রক্রিয়াকে যুক্তরাজ্য সমর্থন করেছিল।
কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে, মাদক পাচারকারীরা “শত্রু যোদ্ধা” এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে “সশস্ত্র সংঘাতে” লিপ্ত, তাই তাদের হত্যা করা আইনসিদ্ধ। প্রশাসনের পাঠানো এক স্মারকে বলা হয়েছে, এই অভিযান “আন্তর্জাতিক সশস্ত্র সংঘাত আইন” মেনে চলছে।
তবে আন্তর্জাতিক আইনের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ মাদক পাচারকারীদের ক্ষেত্রে ওই আইন প্রযোজ্য নয় এবং কোনো গোষ্ঠীকে “সন্ত্রাসী সংগঠন” হিসেবে ঘোষণা করা মানেই প্রাণঘাতী হামলার অনুমোদন নয়। সিএনএন জানিয়েছে, যেসব নৌকা যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ধ্বংস হয়েছে, তার কয়েকটি তখন স্থির অবস্থায় ছিল বা ফিরে যাচ্ছিল—যা “তাৎক্ষণিক হুমকি”র যুক্তিকে দুর্বল করে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল অ্যালভিন হোলসি এসব হামলার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের সঙ্গে উত্তপ্ত বৈঠকে পদত্যাগের প্রস্তাব দেন। তিনি ডিসেম্বর মাসে দায়িত্ব ছাড়বেন।
প্রতিরক্ষা দপ্তরের আইনজীবীরাও এই হামলার বৈধতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে, যদিও হেগসেথের মুখপাত্র দাবি করেছেন যে কোনো আইনজীবী আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি করেননি।
অন্যদিকে, কানাডাও—যা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কোস্টগার্ডের সঙ্গে ক্যারিবীয় অঞ্চলে মাদকবিরোধী অভিযানে সহযোগিতা করে আসছে—এই সামরিক হামলা থেকে নিজেদের দূরে রেখেছে। সূত্রগুলো বলেছে, কানাডা ‘অপারেশন ক্যারিবিয়ান’ চালিয়ে যাবে, তবে তাদের গোয়েন্দা তথ্য কোনো প্রাণঘাতী হামলায় ব্যবহার করা যাবে না।
কানাডার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গত মাসে এক বিবৃতিতে বলেন, “অপারেশন ক্যারিবিয়ান কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রের কোস্টগার্ডের সঙ্গে সমন্বিতভাবে পরিচালিত হলেও, এটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং স্বতন্ত্র।” সূত্র: সিএনএন
মাহফুজ/