নাৎসি নেতা অ্যাডলফ হিটলার সম্ভবত ‘ক্যালম্যান সিনড্রোম’ নামের একটি বিরল জিনগত রোগে ভুগতেন—গতকাল বৃহস্পতিবার এমনটাই জানিয়েছেন গবেষক ও ডকুমেন্টারি নির্মাতারা। হিটলারের রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে এ ধারণা পাওয়া যায়।
ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের মতে, এ রোগে বয়ঃসন্ধির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে এবং এর ফলে অণ্ডকোষ নামতে দেরি হওয়া বা খুব ছোট যৌনাঙ্গের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
গবেষকেরা আরও জানিয়েছেন, এই পরীক্ষায় হিটলারের ইহুদি বংশধর হওয়ার দাবি পুরোপুরি বাতিল হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারকে ব্যঙ্গ করে নানা গান রচিত হয়েছিল, যেখানে তার শারীরিক গঠনের কথা বলা হতো। তবে এসবের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছিল না। নতুন গবেষণার ফলাফল এখন প্রথমবারের মতো তার যৌন বিকাশ নিয়ে দীর্ঘদিনের সন্দেহকে শক্ত ভিত্তি দিচ্ছে।
পটসডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অ্যালেক্স কাই বলেন, “হিটলার কেন জীবনে মহিলাদের সঙ্গে সবসময় অস্বস্তিতে থাকতেন, অথবা কেন তিনি সম্ভবত কখনও নারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে যাননি—এর কোনো পরিষ্কার ব্যাখ্যা আগে পাওয়া যায়নি। এখন যদি তিনি ক্যালম্যান সিনড্রোমে ভুগে থাকেন, তবে তা হয়তো এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে।”
গবেষণার ফলাফল তুলে ধরে শনিবার প্রচার হতে যাওয়া নতুন ডকুমেন্টারিতে, যার নাম “Hitler's DNA: Blueprint of a Dictator”।
গবেষকেরা রক্তের নমুনাটি পেয়েছেন সেই সোফা থেকে নেওয়া একটি কাপড়ের টুকরো থেকে—যেখানে হিটলার আত্মহত্যা করেছিলেন।
পরীক্ষায় পাওয়া গেছে, হিটলারের ক্যালম্যান সিনড্রোম থাকার “উচ্চ সম্ভাবনা” রয়েছে। তবে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান তাদের সমালোচনামূলক প্রতিবেদনে বলেছে—গবেষণা দলটি হিটলারের জীবিত আত্মীয়দের কাছ থেকে নতুন ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়েছে, কারণ আত্মীয়রা গণমাধ্যমের নজর এড়াতে চান।
ডিএনএ পরীক্ষায় আরও দেখা গেছে, অটিজম, স্কিজোফ্রেনিয়া ও বাইপোলার ডিসঅর্ডারের ঝুঁকির ক্ষেত্রে হিটলারের স্কোর ছিল “অত্যন্ত উচ্চ”—শীর্ষ এক শতাংশের মধ্যে। তবে গার্ডিয়ানের মতে, এই ধরনের “পলিজেনিক রিস্ক স্কোর” ব্যবহার করে ব্যক্তিগত ঝুঁকি নির্ধারণ নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে অস্বস্তি আছে।
লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক্স ইনস্টিটিউটের ডেভিড কার্টিস বলেন, “পলিজেনিক রিস্ক স্কোর আসলে পুরো জনগোষ্ঠী নিয়ে ধারণা দেয়, ব্যক্তিকে নিয়ে নয়। স্কোর বেশি হলেও কোনো ব্যক্তি ওই রোগে আক্রান্ত হবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই।”
গবেষণা দল জোর দিয়ে বলেছে—হিটলারের মধ্যে এসব বৈশিষ্ট্য থাকলেও তা তার যুদ্ধংদেহী মনোভাব বা নাৎসি নীতির কোনো ব্যাখ্যা বা অজুহাত হতে পারে না।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ৫ কোটির বেশি মানুষ মারা যায়, যার মধ্যে ৬ মিলিয়ন (৬০ লাখ) ইহুদিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়।
গবেষণা প্রকল্পে যুক্ত জেনেটিসিস্ট টুরি কিং বলেন, হিটলারের জিনগত বৈশিষ্ট্য এমন ছিল, যা নাৎসিরাই “অযোগ্য” বলে গণ্য করে গ্যাসচেম্বারে পাঠাত। কারণ হিটলার বা তার নাৎসি পার্টি মূলত একটি আদর্শ, সবল এবং শ্রেষ্ঠ একটি জার্মান জাতি তৈরি করতে চেয়েছিল, ফলে সেখানে এরকম সিনড্রোম বা রোগ তারা গ্রহণ করতো কি না সন্দেহ থেকে যায়।
তিনি বলেন, “হিটলার নিজেই যদি নিজের ডিএনএ দেখতে পারতেন, হয়তো নিজেকেই গ্যাসচেম্বারে পাঠাতেন।”
ইহুদি বংশধর হওয়ার দাবি বাতিল
ডিএনএ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হিটলারের দাদির মাধ্যমে তার ইহুদি বংশধর হওয়ার যে গুঞ্জন ছিল, তা ভিত্তিহীন।
নির্মাতারা জানান, “ডিএনএ পরীক্ষায় পাওয়া ওয়াই ক্রোমোজোম হিটলারের পিতৃপরিচয়ের সঙ্গেই মিলে গেছে। যদি ইহুদি বংশধর হওয়ার ঘটনা সত্য হতো, তবে এই মিল পাওয়া যেত না।”
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ ২০২২ সালে ইউক্রেনে হামলা ন্যায্যতা প্রমাণ করতে এই ভিত্তিহীন দাবি করেছিলেন যে—হিটলারের নাকি ইহুদি বংশ ছিল। ক্রেমলিন তখন ইউক্রেনকে “ডিনাৎসিফাই” বা নাৎসিমুক্ত করার অজুহাত তুলে আক্রমণ চালায়, যদিও দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি একজন ইহুদি।
এই গবেষণা এখন সেই দাবিকেও সম্পূর্ণ অবাস্তব প্রমাণ করেছে। সূত্র: এএফপি, সিবিএস নিউজ
মাহফুজ/