যুদ্ধ-বিধ্বস্ত গাজায় মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনাকারী বিতর্কিত সংস্থা গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিচ্ছে। সংস্থার পরিচালক এবং ইসরায়েলের দুটি সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। গত মাসে যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পরই তারা গাজায় তাদের কাজ স্থগিত করেছিল।
গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক জন অ্যাক্রি এক বিবৃতিতে বলেছেন, “আমরা আমাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিচ্ছি, কারণ আমরা গাজার বাসিন্দাদের কাছে সহায়তা পৌঁছানোর একটি উন্নত উপায় দেখানোর মিশনে সফল হয়েছি।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসরায়েলের দুটি সূত্র জানায়, অ্যাক্রি নিশ্চিত করার আগেই সংস্থাটির কার্যক্রম বন্ধের পরিকল্পনার কথা জানায়।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে শুরু, কিন্তু ছিল বিশৃঙ্খলা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমর্থনপুষ্ট এই সংস্থাটি গত মে মাসের শেষের দিকে দক্ষিণ গাজা এবং কেন্দ্রীয় গাজায় বেশ কয়েকটি স্থানে মানবিক সহায়তা বিতরণ শুরু করেছিল। তবে, এই বিতরণ প্রচেষ্টা দ্রুত বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে। সীমিত খাদ্যদ্রব্য পাওয়ার আশায় ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিরা ত্রাণ বিতরণের স্থানগুলোতে ভিড় জমাতেন।
জাতিসংঘের তথ্য অনুসারে, গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের সাইটগুলোর কাছাকাছি বা সেখানে যাওয়ার পথে ২ হাজার ১০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি সহায়তা নিতে গিয়ে নিহত হয়েছেন।
জিএইচএফ গাজার আরও বেশিসংখ্যক স্থানে তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করেছিল, কিন্তু সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়িত হয়নি। অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর সংস্থাটি তাদের কার্যক্রম স্থগিত করে দেয়, যখন যুক্তরাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মানবিক সহায়তা বিতরণের মূল মাধ্যম হিসেবে পুনরায় জাতিসংঘের ওপর নির্ভরশীল হয়।
জিএইচএফ দাবি করেছে, তারা গাজার ফিলিস্তিনিদের কাছে মোট ১৮৭ মিলিয়নেরও বেশি খাবার সরবরাহ করেছে।
বিতরণের সময় সহিংসতা ও বিতর্ক
জিএইচএফ মূলত জাতিসংঘের ভূমিকা প্রতিস্থাপনের জন্য তৈরি করা হয়েছিল, একই সঙ্গে ইসরায়েলের এই দাবি মেনে চলার জন্য যে এই সহায়তা যেন হামাসের হাতে না পৌঁছায়। যদিও ইসরায়েল হামাসের বিরুদ্ধে ত্রাণ চুরির অভিযোগ করেছিল, তবে মার্কিন সরকারের অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনায় হামাসের চুরির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
জিএইচএফ জানিয়েছিল যে তারা ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে, তবে নিরাপত্তা দেবে বেসরকারি সামরিক ঠিকাদাররা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছ থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করার অভাব এবং ফিলিস্তিনিদের জন্য উচ্চ ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগের কারণে জাতিসংঘ জিএইচএফ-এর কার্যক্রমে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।
জাতিসংঘের পূর্ববর্তী পদ্ধতির মতো শত শত বিতরণ কেন্দ্রের পরিবর্তে জিএইচএফ এর কেন্দ্রগুলো সংখ্যায় অনেক কম ছিল। ফলে ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিদের বিশাল জনতাকে নির্দিষ্ট কিছু স্থানে ভিড় করতে বাধ্য হতে হয়েছিল।
এছাড়াও, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করেছেন যে জুনে দক্ষিণ গাজার রাফাহতে জিএইচএফ এর একটি সহায়তা কেন্দ্রের কাছে একাধিক দিনে ইসরায়েলি বাহিনী গুলি চালিয়ে কয়েক ডজন বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করেছে।
মিশ্র প্রতিক্রিয়া
জিএইচএফ এর কার্যক্রম বন্ধের প্রতিক্রিয়ায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি মুখপাত্র টমি পিগট বলেন, ‘‘জিএইচএফ আমাদের এবং আমাদের অংশীদারদের সঙ্গে মূল্যবান শিক্ষণীয় বিষয়গুলো ভাগ করে নিয়েছে।’’ তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় এক পোস্টে বলেন, ‘‘জিএইচএফ এর এই মডেল, যেখানে হামাস আর ত্রাণ লুট করে লাভবান হতে পারেনি, তা হামাসকে আলোচনার টেবিলে আনতে এবং যুদ্ধবিরতি অর্জনে বড় ভূমিকা পালন করেছে। গাজার বাসিন্দাদের তারা যা কিছু দিয়েছেন তার জন্য আমরা তাদের ধন্যবাদ জানাই’’
তবে হামাস জিএইচএফ এর কার্যক্রম বন্ধের বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা এটিকে ইসরায়েলের সঙ্গে অংশীদারত্বে ‘‘ক্ষুধা তৈরি’’ করা একটি প্রকল্পের জন্য ‘‘একটি প্রাপ্য পদক্ষেপ’’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
হামাস এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, এই সংস্থাটি গাজায় প্রবেশের পর থেকেই দখদার বাহিনীর নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠেছিল। তারা এমন বিতরণ পদ্ধতি অবলম্বন করেছিল যার সঙ্গে মানবিকতার কোনো সম্পর্ক ছিল না। রুটির একটি টুকরো পাওয়ার চেষ্টায় থাকা আমাদের ফিলিস্তিনি জনগণের ক্ষুধার্তদের মর্যাদাহানিকর এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।
হামাস আন্তর্জাতিক আইনি সংস্থাগুলোকে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে জিএইচএফ এর ‘‘অপরাধের’’ জন্য জবাবদিহি করার আহ্বান জানিয়েছে। সূত্র: সিএনএন
মাহফুজ/