জার্মানি অবশেষে ইসরায়েল নির্মিত অ্যারো–৩ (Arrow 3) ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করতে যাচ্ছে। দীর্ঘ পরিসরের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় সক্ষম এই অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবারই প্রথম ইসরায়েলের বাইরে ব্যবহৃত হতে যাচ্ছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে ইসরায়েলি পত্রিকা জেরুজালেম পোস্ট।
প্রায় ৩.৬ বিলিয়ন ডলারের এই চুক্তির আওতায় জার্মানি গত কয়েক বছর ধরে ইসরায়েল থেকে উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি কেনার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরায়েল–হামাস যুদ্ধের সময় আরোপিত দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর বার্লিনের সঙ্গে তেল আবিবের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গতি পেয়েছে।
২০২৪ সালের শেষ দিকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ-এ একটি উচ্চস্তরের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৈঠকে ইসরায়েল মিসাইল ডিফেন্স অর্গানাইজেশন, জার্মান প্রকল্প প্রধান কর্নেল কার্স্টেন কপার এবং ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ ক্ষেপণাস্ত্র ও মহাকাশ বিভাগের প্রধানসহ এলবিট সিস্টেমস ও জার্মান প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনার উদ্দেশ্য ছিল ২০২৫ সালের শেষের আগেই অ্যারো–৩ সম্পূর্ণরূপে জার্মানিতে মোতায়েন নিশ্চিত করা।
দীর্ঘ-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে তৈরি
অ্যারো–৩ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ উদ্যোগে তৈরি একটি উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। অ্যারো–২ ও অ্যারো–৩ উভয় ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মিলে গঠিত এই নেটওয়ার্ক শত্রুপক্ষের দীর্ঘ-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বায়ুমণ্ডলের বাইরে থেকেই ধ্বংস করতে সক্ষম। এর প্রধান নির্মাতা ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ।
চুক্তিটি ২০২৩ সালে সই হলেও, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময় অ্যারো–৩ এর অসাধারণ কার্যকারিতার কারণে এর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় বলে দাবি করে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ।
২০২৪ সালের ১৩–১৪ এপ্রিল, ইরান ইসরায়েলের দিকে নিক্ষেপ করা ১২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় সবগুলোই অ্যারো–৩ সফলভাবে ধ্বংস করে।
তবে একই বছরের ১ অক্টোবর, ১৮০টি ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে কয়েক ডজন নেভাতিম ও তেল–নফ ঘাঁটিতে আঘাত হানে। যদিও বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল আগেই ঘাঁটি খালি করে ফেলেছিল এবং ক্ষতি সীমিত রাখতে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ‘অনুমতি দিয়ে’ পড়তে দেওয়া হয়েছিল। তবুও অ্যারো–৩–এর সামগ্রিক কার্যকারিতা উচ্চমানের ছিল।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতেও সিস্টেমটি উচ্চ সফলতা দেখায়। ইরানের ৫৫০টি ক্ষেপণাস্ত্রের বেশিরভাগই আকাশেই ভূপাতিত হয়—যদিও ২৮ জন ইসরায়েলি নিহত হন, সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম ছিল।
অ্যারো-৩ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আঘাত হানার পাল্লা প্রায় ২ হাজার ৪০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
এটি ইসরায়েলের বহু-স্তরীয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের সর্বোচ্চ স্তর এবং দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরে বাধা দেওয়ার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। ১০০ কিলোমিটারের বেশি উচ্চতায় লক্ষ্যবস্তুকে আটকাতে পারে এ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
এটি হাইপারসনিক গতিতে (শব্দের গতির পাঁচ গুণের বেশি) লক্ষ্যবস্তুর দিকে ছুটে চলতে সক্ষম।
ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ উৎপাদন
অ্যারো–৩ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও উৎপাদনে ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ প্রধান ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে। কমান্ড ও কন্ট্রোল সিস্টেম তৈরি করছে এলবিট সিস্টেমস। আর ইন্টারসেপ্টর মিসাইল তৈরিতে সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে রয়েছে ইসরায়েলের টোমার ও রাফায়েল অ্যাডভান্সড সিস্টেমস। যুক্তরাষ্ট্রের মিসাইল ডিফেন্স এজেন্সি (MDA) যৌথ অংশীদার হওয়ায় চুক্তি বাস্তবায়নে ওয়াশিংটনের অনুমোদনও প্রয়োজন ছিল।
২০১৩ সাল থেকেই আলোচনার শুরু, তবে জার্মানি–ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র তিন পক্ষের দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক পরিবর্তন ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এটি বারবার বিলম্বিত হয়েছে।
ইউরোপে প্রথম কৌশলগত প্রতিরক্ষা স্তর
জার্মানিতে অ্যারো–৩ মোতায়েনকে ইউরোপের জন্য একটি বড় কৌশলগত মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাশিয়ার সম্ভাব্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি মোকাবিলায় এটি জার্মানির প্রতিরক্ষা বেষ্টনীকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাবে। একই সঙ্গে ন্যাটোর সামগ্রিক এয়ার ডিফেন্স স্থাপনায় এটি যুক্ত হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন স্তর।
অ্যারো–৩–এর মোতায়েন ইউরোপে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষায় এক নতুন যুগের সূচনা করবে—এমনই ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। সূত্র: দ্য জেরুজালেম পোস্ট
মাহফুজ/