যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের নেতৃত্বকে নতুন করে সতর্কবার্তা দেওয়ার পর দেশটির সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করবে এবং কৌশলগত অবকাঠামো ও জনসম্পদ সুরক্ষায় থাকবে। চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ঘিরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে এই বক্তব্য এলো।
আজ শনিবার আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইরানের সেনাবাহিনী ইসরায়েল ও “শত্রুভাবাপন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী”কে দেশের জননিরাপত্তা বিনষ্ট করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করে।
বিবৃতিতে বলা হয়, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে শুরু হওয়া সাম্প্রতিক সাম্প্রতিক বিক্ষোভ দমনে সরকার যখন জোরালো পদক্ষেপ নিচ্ছে, তখন এসব শক্তি পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে চায়। এই বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “সর্বোচ্চ সেনাপতির নির্দেশনায় সেনাবাহিনী অন্যান্য সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে, অঞ্চলজুড়ে শত্রুদের তৎপরতা পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি দৃঢ়ভাবে জাতীয় স্বার্থ, দেশের কৌশলগত অবকাঠামো এবং জনসম্পদ রক্ষা করবে।”
ইরানের অভিজাত বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) (যারা সেনাবাহিনী থেকে আলাদাভাবে কাজ করে) শনিবার সতর্ক করে জানায়, ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের অর্জন ও দেশের নিরাপত্তা রক্ষা একটি “লাল রেখা”; রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এমনটাই জানায়।
এর আগে শনিবারই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইরানের জনগণের প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। বিক্ষোভ দমনে ইরানি কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার পর তিনি এই বক্তব্য দেন।
“যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাহসী জনগণের পাশে আছে,” রুবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন।
রুবিওর এই পোস্ট আসে কয়েক ঘণ্টা পরই, যখন ট্রাম্প ইরানের নেতাদের নতুন করে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “তোমরা যদি গুলি চালানো শুরু করো, আমরা-ও গুলি চালানো শুরু করব।”
ট্রাম্প বলেন, ইরানের নেতারা “বড় বিপদে” পড়েছেন বলে মনে হচ্ছে এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে সামরিক হামলার আগের হুমকিও তিনি পুনরায় দেন। তিনি বলেন, “আমার মনে হচ্ছে, মানুষ এমন কিছু শহরের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে, যেগুলো কয়েক সপ্তাহ আগেও কেউ কল্পনা করেনি।”
গত ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে ইরানের বিভিন্ন শহরে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব বিক্ষোভে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে দেশ শাসন করে আসা ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার অবসানের দাবিও জোরালো হয়েছে।
শনিবার রাতেও অস্থিরতা অব্যাহত থাকে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, তেহরানের পশ্চিমে কারাজ শহরে “দাঙ্গাকারীরা” একটি পৌর ভবনে আগুন দিয়েছে—রয়টার্স এ তথ্য জানায়।
প্রেস টিভি শিরাজ, কুম ও হামেদান শহরে বিক্ষোভে নিহত বলে দাবি করা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জানাজা ও দাফনের ফুটেজ সম্প্রচার করে।
রয়টার্স জানায়, ইরানের বাইরে থেকে সম্প্রচারিত ফার্সি ভাষার টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে প্রকাশিত ভিডিওতে উত্তরাঞ্চলের তাবরিজ ও পূর্বাঞ্চলের মাশহাদ শহরে নতুন বিক্ষোভে বিপুল মানুষের অংশগ্রহণ দেখা গেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি শুক্রবার বিক্ষোভকারীদের “ভাঙচুরকারী” ও “নাশকতাকারী” বলে আখ্যা দেন।
প্রেস টিভিতে সম্প্রচারিত এক ভাষণে তিনি বলেন, ট্রাম্পের হাত “এক হাজারের বেশি ইরানির রক্তে রঞ্জিত” যা ইঙ্গিত করে গত জুনে ইসরায়েলের ইরানে চালানো হামলার দিকে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দেয় এবং নিজেও হামলায় অংশ নেয়।
খামেনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন, “অহংকারী” এই মার্কিন নেতা (ট্রাম্প) একদিন ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের আগে ইরান শাসন করা রাজতান্ত্রিক শাসকদের মতোই ক্ষমতাচ্যুত হবেন।
তিনি বলেন, “সবাই জানে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র শত শত হাজার সম্মানিত মানুষের রক্তের বিনিময়ে ক্ষমতায় এসেছে; নাশকতাকারীদের সামনে এটি কখনোই পিছু হটবে না।”
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি শুক্রবার লেবানন সফরে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে, তারা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকে বিভাজনমূলক ও সহিংস রূপ দেওয়ার জন্য সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র এই অভিযোগকে “ভ্রান্ত কল্পনা” বলে উড়িয়ে দেন। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/