চীনের নেতা শি জিনপিং এবং কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি উভয়েই তাদের পণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর ঘোষণা দিয়েছেন, যা দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন কাটিয়ে নতুন শুরুর ইঙ্গিত দিচ্ছে। শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর এ ঘোষণা আসে।
কার্নি সাংবাদিকদের জানান, চীন আগামী ১ মার্চের মধ্যে কানাডীয় ক্যানোলা তেলের ওপর শুল্ক ৮৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার পরিকল্পনা করেছে।
অন্যদিকে, অটোয়া চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির (EV) ওপর ৬.১ শতাংশ হারে ‘মোস্ট-ফেভারড-নেশন’ ট্যাক্স বা বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত দেশের শুল্ক আরোপ করতে সম্মত হয়েছে।
কয়েক বছরের বৈরী সম্পর্ক এবং পাল্টা-পাল্টি শুল্ক আরোপের পর এই চুক্তিটি একটি বড় ধরনের সাফল্য। শি জিনপিং এই সম্পর্কের ঘুরে দাঁড়ানোকে স্বাগত জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, এটি কার্নির জন্যও একটি বিজয়, কারণ প্রায় এক দশকের মধ্যে তিনি প্রথম কানাডীয় নেতা হিসেবে চীন সফর করলেন।
ট্রাম্পের অনিয়মিত শুল্ক নীতির কারণে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার ফলে কার্নি কানাডার বাণিজ্যকে তার বৃহত্তম অংশীদার আমেরিকার বাইরে বহুমুখী করার চেষ্টা করছেন। এই চুক্তির ফলে আমেরিকার ঘরের পাশেই কানাডায় চীনা বিনিয়োগ আরও বাড়তে পারে।
কার্নি নিজেও এই চুক্তির পেছনে ট্রাম্পের শুল্ক নীতির প্রভাব রয়েছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা আমেরিকার অন্যতম প্রধান মিত্রকে তার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে ঠেলে দিয়েছে।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন যে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চীনের সঙ্গে কানাডার সম্পর্ক আরও ‘পূর্বাভাসযোগ্য’ হয়ে উঠেছে এবং বেইজিংয়ের সঙ্গে আলোচনা ‘বাস্তবসম্মত ও সম্মানজনক’ ছিল।
তবে তিনি এটিও স্পষ্ট করেছেন যে অটোয়া সব বিষয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে একমত নয়। প্রেসিডেন্ট শি’র সঙ্গে আলোচনায় তিনি কানাডার ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমানাগুলো তুলে ধরেছেন, যার মধ্যে মানবাধিকার, নির্বাচনে হস্তক্ষেপের উদ্বেগ এবং নিরাপত্তার প্রয়োজনে ‘গার্ডরেইল’ বা সুরক্ষাকবচ রাখার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।
চীনের মানবাধিকার রেকর্ড সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “আমরা পৃথিবীকে যেমন আছে তেমনভাবেই গ্রহণ করি, আমরা যেমনটা চাই তেমনভাবে নয়।”
পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, কার্নির এই সফর বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর জন্য একটি উদাহরণ হতে পারে, যারা ওয়াশিংটনের শুল্ক নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর বিপরীতে, শি জিনপিং দেখানোর চেষ্টা করছেন যে চীন একটি স্থিতিশীল বিশ্ব অংশীদার এবং তিনি আরও বাস্তবমুখী বা বেইজিংয়ের ভাষায় ‘উইন-উইন’ (উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক) সম্পর্কের ওপর জোর দিচ্ছেন।
এবং মনে হচ্ছে এই কৌশল কাজ করছে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট এবং আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী উভয়ই সাম্প্রতিক সপ্তাহে বেইজিং সফর করেছেন। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী এবং জার্মানির চ্যান্সেলরও শীঘ্রই সফর করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
কার্নি বলেন, ‘‘বিশ্ব নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে এবং কানাডা নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করবে তা আগামী কয়েক দশকের জন্য আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।’’
তিন দিনের এই সফরের শুরুর দিকে তিনি বলেছিলেন যে কানাডা-চীন অংশীদারত্ব দেশ দুটিকে একটি ‘নতুন বিশ্বব্যবস্থার’ জন্য প্রস্তুত করছে। তিনি আরও যোগ করেন যে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাটি বর্তমানে “ক্ষুণ্ণ বা অবমূল্যায়িত” হয়েছে।
শুক্রবার গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ চীনা ও কানাডীয় প্রতিনিধিদল যখন বৈঠকে বসেন, তখন শি বলেন: ‘‘চীন-কানাডা সম্পর্কের সুস্থ ও স্থিতিশীল উন্নয়ন বিশ্ব শান্তি, স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য সহায়ক।’’
বাণিজ্যিক পুনঃসূচনা
শুল্ক ছিল দুই পক্ষের মধ্যে বড় একটি বিরোধের জায়গা। ২০২৪ সালে মার্কিন পদাঙ্ক অনুসরণ করে কানাডা চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল। গত বছর বেইজিং এর পাল্টা জবাব হিসেবে ক্যানোলা বীজ ও তেলের মতো ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের কানাডীয় কৃষি ও খাদ্য পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করে। ফলে ২০২৫ সালে কানাডীয় পণ্যের চীনা আমদানি ১০ শতাংশ কমে যায়।
শুক্রবারের চুক্তিতে কানাডা মাত্র ৪৯ হাজার চীনা বৈদ্যুতিক গাড়িকে ৬.১ শতাংশ শুল্ক হারে তাদের বাজারে প্রবেশের অনুমতি দেবে। কানাডীয় গাড়ি নির্মাতাদের সস্তা চীনা ইভি’র সহজলভ্যতার আশঙ্কার কথা মাথায় রেখে এই নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ক্যানোলা চাষিদের স্বস্তির পাশাপাশি কানাডীয় লবস্টার (গলদা চিংড়ি), কাঁকড়া এবং মটরের ওপরও শুল্ক কমানো হবে। চীন কানাডার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার, যদিও বাণিজ্যের পরিমাণের দিক থেকে এটি এখনও আমেরিকার চেয়ে অনেক পিছিয়ে।
কার্নির জন্য চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ক্রমবর্ধমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। গত বুধবার বেইজিং পৌঁছানোর পর তিনি একটি বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি প্রস্তুতকারক এবং একটি জ্বালানি জায়ান্টসহ বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় চীনা ব্যবসায়িক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৃহস্পতিবার দুই দেশ জ্বালানি ও বাণিজ্য সহযোগিতার বিষয়ে বেশ কিছু চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
সাবেক কানাডীয় কূটনীতিক এবং কানাডিয়ান গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স ইনস্টিটিউটের ভাইস-প্রেসিডেন্ট কলিন রবার্টসন বলেন, এই সফরটি ‘একটি সম্পর্কের পুনঃসূচনা’। সূত্র: বিবিসি
মাহফুজ/