তীব্র শীতের মধ্যে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা না করার বিষয়ে হওয়া সমঝোতা রাশিয়া ভেঙেছে বলে অভিযোগ তুলেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। গত মঙ্গলবার রাশিয়ার বিরুদ্ধে তিনি ওই অভিযোগ তোলেন।
মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে করা একটি সমঝোতা মস্কো ভেঙেছে বলেই অভিযোগ কিয়েভের। আবুধাবিতে তিন পক্ষের বৈঠকের আগের দিনই রাশিয়া কিয়েভে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে। জেলেনস্কি বলেন, কিয়েভে তাপমাত্রা যখন মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে গেছে, তখন রাতভর রাশিয়া একটি বিশাল ও ‘ইচ্ছাকৃত’ হামলা চালিয়েছে।
তার দাবি, ৭১টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ৪৫০টি ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে, যার লক্ষ্য ছিল জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করা। এটি এ পর্যন্ত রেকর্ড সংখ্যক হামলা। গত মঙ্গলবার কিয়েভে এক হাজারের বেশি আবাসিক ভবনে গরমের ব্যবস্থা ছিল না।
জেলেনস্কি বলেন, ‘ট্রাম্পের ব্যক্তিগত অনুরোধে অস্বাভাবিক ঠাণ্ডার কারণে এক সপ্তাহ কিয়েভ ও বিভিন্ন শহরে হামলা না করার যে প্রতিশ্রুতি ভ্লাদিমির পুতিন দিয়েছিলেন, তা রাশিয়া ভেঙেছে।’ ট্রাম্প গত বৃহস্পতিবার বলেছিলেন, ‘তিনি এতে সম্মত হয়েছেন। আমাকে বলতে হবে, এটা খুবই ভালো ছিল।’
পরে ক্রেমলিন জানায়, এই যুদ্ধবিরতি শুধু রবিবার পর্যন্তই ছিল। ইউক্রেনের মতে, যুদ্ধবিরতি শুক্রবার পর্যন্ত চলার কথা ছিল। জেলেনস্কির ভাষ্য, এই অল্প সময়ের বিরতি কাজে লাগিয়ে রাশিয়া অস্ত্র মজুত করেছে। তিনি বলেন, ‘হয়তো রাশিয়া মনে করছে এক সপ্তাহে সাত দিনের বদলে চার দিন থাকে, অথবা তারা শুধু যুদ্ধের দিকেই বাজি ধরেছে এবং শীতের সবচেয়ে ঠাণ্ডা দিনগুলোর অপেক্ষায় আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা মনে করি এই রুশ হামলা স্পষ্টভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষের সঙ্গে আলোচনার লঙ্ঘন, এবং এর পরিণতি হওয়া উচিত।’ অন্যদিকে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প জানান, পুতিন যে সমঝোতা করেছিলেন তার মেয়াদ রবিবার শেষ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এটা ছিল রবিবার থেকে রবিবার, তারপর সেটা খুলে গেল এবং তিনি গত রাতে জোরালো হামলা চালালেন। তিনি কথাটা রেখেছিলেন… আমরা যে কোনোটা নেব, কারণ ওখানে সত্যিই খুব ঠাণ্ডা। কিন্তু সেটা রবিবার ছিল, আর তিনি রবিবার থেকে রবিবার পর্যন্তই মেনেছেন।’
হতাশ হয়েছেন কি না এমন প্রশ্নে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি চাই তিনি যুদ্ধ শেষ করুন।’ যুদ্ধ শেষের লক্ষ্যে রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিতীয় দফার আলোচনা আবুধাবিতে চলমান রয়েছে। গত মাসে প্রথম দফার আলোচনা কোনো অগ্রগতি আনতে পারেনি।
এদিকে গত মঙ্গলবার কিয়েভ সফরে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুত্তে মস্কোর বিরুদ্ধে ‘নিরীহ বেসামরিক মানুষের জন্য বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির’ অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, এই সপ্তাহের আলোচনায় জেলেনস্কি ‘পুরোপুরি প্রস্তুত’। তবে প্রশ্ন তোলেন রাশিয়ানরা ‘আসলেই কি আন্তরিক।’ রাতের হামলাকে তিনি ‘খুবই খারাপ সংকেত’ বলে অভিহিত করেন।
রুত্তে বলেন, প্রায় চার বছর আগে শুরু হওয়া পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর শান্তিপূর্ণ সমাধান করাতে একমাত্র সক্ষম ব্যক্তি ট্রাম্পই। তিনি জেলেনস্কিকে বলেন, ‘নিশ্চিত থাকুন, ন্যাটো ইউক্রেনের পাশে আছে এবং বহু বছর তা অব্যাহত রাখতে প্রস্তুত। আপনার নিরাপত্তাই আমাদের নিরাপত্তা। আপনার শান্তিই আমাদের শান্তি।’
কিয়েভের বাসিন্দারা জানান, গত মঙ্গলবার ভোর ১টা থেকে একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। হামলায় কিয়েভের পাঁচটি জেলায় ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং রাজধানীতে অন্তত ছয়জন আহত হন। পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বিমান হামলার সতর্কতা জারি ছিল। দক্ষিণের শহর জাপোরিঝিয়ায় ড্রোন হামলায় দুই কিশোর নিহত এবং অন্তত নয়জন আহত হন বলে কর্মকর্তারা জানান।
জেলেনস্কি বলেন, ‘শীতের সবচেয়ে ঠাণ্ডা দিনগুলোকে কাজে লাগিয়ে মানুষকে আতঙ্কিত করাই কূটনীতির দিকে যাওয়ার চেয়ে রাশিয়ার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি পশ্চিমা মিত্রদের কাছে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য আরও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ বাড়ানোর আহ্বান জানান, যাতে ‘স্বাভাবিক জীবন’ রক্ষা করা যায়।
তিনি সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, ‘রাশিয়ার ওপর চাপ না থাকলে এই যুদ্ধ শেষ হবে না। এখন মস্কো সন্ত্রাস ও উত্তেজনা বেছে নিচ্ছে, তাই সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োজন।’ সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান