চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এক ফোনালাপে তাইওয়ান ইস্যুটিকে চীন-মার্কিন সম্পর্কের ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শি ট্রাম্পকে তাইওয়ানে অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে ‘সতর্ক’ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর ‘অত্যধিক গুরুত্ব’ আরোপ করেন এবং আশা প্রকাশ করেন যে উভয় পক্ষই তাদের মতপার্থক্য নিরসনের পথ খুঁজে পাবে।
গতকাল বুধবারের এই ফোনালাপকে ট্রাম্প ‘চমৎকার’ এবং ‘দীর্ঘ ও বিস্তারিত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের আশায় সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারসহ বেশ কয়েকজন পশ্চিমা নেতার চীন সফরের পর এই ফোনালাপটি অনুষ্ঠিত হলো।
ট্রাম্প নিজে আগামী এপ্রিলে চীন সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে এবং এই সফর নিয়ে তিনি ‘অনেক বেশি’ আগ্রহী বলে জানিয়েছেন। তিনি আরও যোগ করেন যে, চীন বর্তমানে ১২ মিলিয়ন টন সয়াবিন আমদানির পরিবর্তে ২০ মিলিয়ন টন মার্কিন সয়াবিন কেনার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এর এক পোস্টে লেখেন, ‘চীনের সঙ্গে সম্পর্ক এবং প্রেসিডেন্ট শির সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো। আমরা দুজনেই এই সম্পর্ক বজায় রাখা কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা অনুভব করি।’’
পোস্ট অনুযায়ী, তাইওয়ান এবং সয়াবিন ছাড়াও ট্রাম্প ও শি ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ, ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি এবং চীন কর্তৃক যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল ও গ্যাস ক্রয়ের বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
তাইওয়ান প্রসঙ্গে শি বলেন, এই স্বশাসিত দ্বীপটি ‘চীনের ভূখণ্ড’ এবং বেইজিংকে অবশ্যই ‘সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষা করতে হবে’। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।’
চীন দীর্ঘকাল ধরে তাইওয়ানকে পুনরায় একীভূত করার অঙ্গীকার করে আসছে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাও নাকচ করেনি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাইওয়ানের পরিবর্তে বেইজিংয়ের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও, ওয়াশিংটন কয়েক দশক ধরে এক ধরণের কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনও তাইওয়ানের শক্তিশালী মিত্র এবং দ্বীপটির সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী।
গত ডিসেম্বরে ট্রাম্প প্রশাসন তাইওয়ানের কাছে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের বিশাল অস্ত্র বিক্রির ঘোষণা দিয়েছিল, যার মধ্যে উন্নত রকেট লঞ্চার, সেলফ-প্রোপেলড হাউইটজার এবং বিভিন্ন ধরণের ক্ষেপণাস্ত্র অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বেইজিং সে সময় বলেছিল যে, ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতাকে সমর্থন করার এই প্রচেষ্টা’ তাইওয়ান প্রণালীতে কেবল ‘বিপজ্জনক এবং সহিংস পরিস্থিতিকেই উসকে দিবে’।
শি গতকাল বুধবার ট্রাম্পকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের যেমন উদ্বেগ আছে, চীনেরও নিজস্ব উদ্বেগ রয়েছে। যদি উভয় পক্ষ সমতা, শ্রদ্ধা এবং পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে একই লক্ষ্যে কাজ করে, তবে আমরা অবশ্যই একে অপরের উদ্বেগের সমাধান করতে পারব।
বৃহস্পতিবার তাইওয়ানের নেতা লাই চিং-তে সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ‘অত্যন্ত মজবুত’ এবং ‘সব ধরনের চলমান সহযোগিতা প্রকল্প অব্যাহত রয়েছে।’
শি এবং ট্রাম্পের মধ্যে সর্বশেষ গত নভেম্বরে কথা হয়েছিল, যখন চীনা প্রেসিডেন্ট তার মার্কিন সমকক্ষকে চীন সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
গত বছরের শুল্ক যুদ্ধ এবং চিপ ও বিরল খনিজ ধাতু (রেয়ার আর্থ) নিয়ে লড়াইয়ের পর গত কয়েক মাসে দুই দেশের সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। যদিও এসব বিষয় এখনও বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে, তবুও গত অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় দুই নেতার সাক্ষাতের পর উত্তেজনা কিছুটা কমেছে। ওই বৈঠকে তারা কিছু ট্যারিফ এবং রেরয়ার আর্থ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে নমনীয় হতে সম্মত হন।
উভয় দেশের প্রতিনিধিরা সয়াবিন চুক্তির রূপরেখাতেও একমত হয়েছেন—যেখানে চীন মার্কিন সয়াবিন আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে। পাশাপাশি গত মাসে টিকটক সংক্রান্ত একটি চুক্তিও চূড়ান্ত করা হয়েছে।
ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলার কয়েক ঘণ্টা আগে শি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে একটি ভার্চুয়াল বৈঠক করেন, যেখানে তারা বেইজিং ও মস্কোর মধ্যে সম্পর্ক জোরদারের প্রশংসা করেন। রুশ সংবাদমাধ্যমের দাবি, পুতিন বছরের প্রথমার্ধেই চীন সফরের জন্য শি’র আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন।
দুই বিশ্ব নেতার সঙ্গে শি’র এই আলাপচারিতাকে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো বিশ্বের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা হিসেবে তুলে ধরছে যে, চীন একটি দায়িত্বশীল এবং যুক্তিবাদী বিশ্ব শক্তি হিসেবে থাকবে।
‘চায়না ডেইলি’র এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, এই ফোনালাপগুলো প্রমাণ করে যে যখন ‘সংঘাত এবং একতরফাবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে’, তখন চীন একটি স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে কাজ করে যাবে।
এতে আরও বলা হয়, বেইজিং দায়িত্বশীল কূটনীতির মাধ্যমে বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতায় অবদান রাখতে প্রধান অংশীদারদের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। সূত্র: বিবিসি
মাহফুজ/