ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ চতুর্থ সপ্তাহে গড়িয়েছে। পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনায় হামলা ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেল-গ্যাসের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি এই প্রণালি দিয়ে পার হতো। প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেলের যাতায়াত পথ এটি। বর্তমানে এই পথ বন্ধ হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বিকল্প রপ্তানি রুটের ওপর ভরসা করছে। মূলত তিনটি প্রধান পাইপলাইন নিয়ে বিশ্লেষণ চলছে। তবে সেগুলো কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতি
গত ২ মার্চ ইরানের ওপর হামলা শুরুর দুই দিন পর ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টা ইব্রাহিম জাবারি প্রণালিটি ‘বন্ধ’ ঘোষণা করেন। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, কোনো জাহাজ পার হওয়ার চেষ্টা করলে আইআরজিসি ও নৌবাহিনী ‘ওই জাহাজগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেবে।’ এরপর থেকে এই পথে যান চলাচল ৯৫ শতাংশ কমে গেছে।
পরবর্তী সময়ে ইরানি কর্মকর্তারা জানান, প্রণালিটি পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তাদের মিত্রদের জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অন্য দেশগুলোর জন্য তেহরান নতুন নিয়ম জারি করেছে। এখন থেকে এই জলপথ ব্যবহারের জন্য তেহরানের পূর্বানুমতি লাগবে। গত দুই সপ্তাহে ভারত, পাকিস্তান ও চীনের কয়েকটি ট্যাঙ্কার চলাচলের অনুমতি পেয়েছে। গত বৃহস্পতিবার মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম মালয়েশীয় জাহাজগুলোকে ‘দ্রুত ছাড়পত্র’ দেওয়ায় তেহরানকে ধন্যবাদ জানান। তবে অন্য দেশের পতাকাবাহী প্রায় ২ হাজার জাহাজ এখনো প্রণালির দুই পাশে আটকে আছে।
বিকল্প পাইপলাইনের সম্ভাবনা ও বাস্তবতা
জাহাজে তেল পরিবহনের একমাত্র বিকল্প হলো স্থলপথ বা সমুদ্রের নিচের পাইপলাইন। তিনটি প্রধান পাইপলাইন বিকল্প হিসেবে আলোচিত হচ্ছে–
১. সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন (পেট্রোলিন): সৌদি আরামকো পরিচালিত ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনটি পারস্য উপসাগরের আবকাইক থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত। আরামকো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কোম্পানি, যারা বৈশ্বিক তেল উৎপাদনের ১২ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে।
২০২৪ সালের তথ্য অনুসারে, হরমুজ দিয়ে দৈনিক ২ কোটি ব্যারেল তেল প্রবাহিত হতো। পেট্রোলিনের দৈনিক সর্বোচ্চ সক্ষমতা ৭০ লাখ ব্যারেল। আরামকো জানিয়েছে, এর মধ্যে ৫০ লাখ ব্যারেল রপ্তানির কাজে ব্যবহার করা সম্ভব, বাকিটা স্থানীয় শোধনাগারের জন্য প্রয়োজন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সৌদি আরব এই পাইপলাইনে তেলের প্রবাহ বাড়িয়েছে। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে প্রবাহ দৈনিক ৭ দশমিক ৭ লাখ ব্যারেল থাকলেও বর্তমানে তা ২ দশমিক ৯ মিলিয়ন ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে।
তবে এই পথেও ঝুঁকি রয়েছে। ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী লোহিত সাগরে হামলার হুমকি দিয়েছে। এক হুতি নেতা রয়টার্সকে জানান, তেহরানের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে তারা লোহিত সাগরে পুনরায় হামলা চালাতে প্রস্তুত। বাব আল-মানদেব প্রণালিটি খুব সংকীর্ণ হওয়ায় সেখানে হামলা হলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা আবারও স্থবির হয়ে পড়বে। ইরান এই অঞ্চলে নতুন যুদ্ধক্ষেত্র খোলার ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে।
২. আবুধাবি অপরিশোধিত তেল পাইপলাইন (ADCOP): ৩৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনটি হাবশান তেলক্ষেত্র থেকে ওমান উপসাগরের ফুজাইরাহ বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত। ২০১২ সালে চালু হওয়া এই প্রকল্পের দৈনিক সক্ষমতা ১৫ লাখ ব্যারেল। কেপলারের বিশ্লেষক ইয়োহানেস রাউবলের মতে, মার্চ মাসে ফুজাইরাহ থেকে তেল রপ্তানি বেড়ে দৈনিক ১ দশমিক ৬২ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছেছে।
৩. ইরাক-তুরস্ক পাইপলাইন (কিরকুক-জেহান): ইরাককে তুরস্কের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের সঙ্গে যুক্ত করা এই পাইপলাইনের সক্ষমতা দৈনিক ১৬ লাখ ব্যারেল। তবে বর্তমানে এটি দিয়ে মাত্র ২ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হচ্ছে। ইরাক ওপেকভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ।
পাইপলাইনগুলো কি ঘাটতি মেটাতে পারবে ?
বিশ্লেষণ বলছে, এই পাইপলাইনগুলো কোনোভাবেই হরমুজ প্রণালির পূর্ণ বিকল্প হতে পারবে না। প্রথমত, এসব পাইপলাইনের সম্মিলিত সক্ষমতা দৈনিক মাত্র ৯ মিলিয়ন ব্যারেল। এটি হরমুজের ২০ মিলিয়ন ব্যারেল চাহিদার অর্ধেকেরও কম। দ্বিতীয়ত, পাইপলাইনগুলো স্থলভাগে অবস্থিত হওয়ায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার নাগালে রয়েছে। চলমান যুদ্ধে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো এখন চরম ঝুঁকির মুখে।
অন্য কোনো পথ আছে কি?
তাত্ত্বিকভাবে ট্রাকে করে তেল পরিবহন সম্ভব। তবে এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ধীর প্রক্রিয়া। একটি ট্রাক বড় জোর ১০০ থেকে ৭০০ ব্যারেল তেল নিতে পারে। দৈনিক লাখ লাখ ব্যারেল সরবরাহের জন্য হাজার হাজার ট্রাকের প্রয়োজন হবে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই বিশাল ট্রাকবহর পরিচালনা করা ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া প্রায় অসম্ভব।