মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ১৫ দফা শান্তি প্রস্তাবকে “অবাস্তব, অযৌক্তিক ও অতিরিক্ত” বলে প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। একই সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়া হবে।
সোমবার (৩০ মার্চ) ট্রাম্প বলেন, যদি দ্রুত কোনো সমঝোতা না হয় এবং হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যের জন্য খুলে না দেওয়া হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র, তেলক্ষেত্র এবং খার্গ দ্বীপ সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেবে। এমনকি দেশটির পানিশোধনাগারেও হামলার হুমকি দেন তিনি।
১৫ দফা সম্পর্কে জানতে পড়ুন: যুদ্ধ শেষ করতে ইরানের কাছে ১৫ দফা প্রস্তাব পাঠালেন ট্রাম্প
এর আগে তেহরান জানায়, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব পেয়েছে। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘায়ী বলেন, “আমাদের অবস্থান পরিষ্কার—আমরা সামরিক আগ্রাসনের শিকার। তাই আমাদের সব প্রচেষ্টা আত্মরক্ষার দিকেই নিবদ্ধ।”
ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ এক মাসে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, যাদের বেশিরভাগই ইরান ও লেবাননের বেসামরিক নাগরিক।
ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে রেখেছে, যা দিয়ে সাধারণত বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়।
এদিকে ইসরায়েল জানায়, সোমবার ইয়েমেন থেকে ছোড়া দুটি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। এর আগে ইরানপন্থী হুথি গোষ্ঠী ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে যুদ্ধে জড়িয়েছে। পাশাপাশি লেবাননের হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের দিকে রকেট ছুড়েছে।
ইসরায়েলি বাহিনী তেহরানে সামরিক স্থাপনা এবং বৈরুতে হিজবুল্লাহর অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, যার ফলে লেবাননের রাজধানীর আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়।
অনড় অবস্থানে ইরান
মাসব্যাপী যুদ্ধে ইরান এখনো দৃঢ় অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশটি জানিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে চলমান হামলার মুখে আত্মরক্ষাই তাদের প্রধান লক্ষ্য।
এদিকে পাকিস্তান, মিশর, সৌদি আরব ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে বৈঠকের পরও সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা শিগগির হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করা হচ্ছে।
ইরান আরও জানিয়েছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়টি পর্যালোচনা করছে।
সংঘাত চলাকালে আরব উপসাগরীয় দেশগুলোকেও লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইরান। লেবাননে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ সংঘর্ষ আবারও তীব্র হয়েছে। দক্ষিণ লেবাননে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর এক সদস্য নিহত এবং আরেকজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
বিশ্ববাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৩ ডলারের বেশি হয়েছে, যা মাসিক হিসেবে বড় উল্লম্ফনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেনের হুথিদের হামলা বাব এল-মান্দেব প্রণালিতেও বিঘ্ন ঘটাতে পারে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।
নতুন সামরিক প্রস্তুতি
যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করছে, যদিও স্থল অভিযান চালানোর কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র প্রণালিগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করবে এবং নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখবে।
এদিকে ইরান নিশ্চিত করেছে, তাদের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌ কমান্ডার আলিরেজা তাংসিরি নিহত হয়েছেন। এছাড়া সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তার ছেলে মোজতবা খামেনি দায়িত্ব নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
তবে এসব হামলা ও নেতৃত্বের ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থামেনি।
অন্যদিকে কুয়েতে একটি বিদ্যুৎ ও পানিশোধনাগারে হামলায় এক ভারতীয় নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটি, যদিও এতে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে ইরান।
ইসরায়েলের হাইফা শহরে নৌঘাঁটির কাছে একটি স্থাপনা ও জ্বালানি ট্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে, যার দায় স্বীকার করেছে হিজবুল্লাহ।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত শান্ত না হলে মধ্যপ্রাচ্যে আরও বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সূত্র: রয়টার্স
মাহফুজ/