মায়ানমারে হাজারও বন্দিকে সাধারণ ক্ষমা দেওয়া হয়েছে বা তাদের সাজা কমানো হয়েছে। চলতি মাসে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর সাবেক সামরিক জান্তা মিন অঙ হ্লাংয়ের এটি প্রথম দিককার গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সিদ্ধান্তগুলোর একটি।
এই পদক্ষেপের মধ্যেই কারাবন্দি সাবেক নেতা অং সান সু চির সাজা কমানো হয়েছে বলে তার আইনজীবী জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর আটক সাবেক প্রেসিডেন্ট উইন মিন্টকেও ক্ষমা করা হয়েছে বলে প্রেসিডেন্টের দপ্তর জানিয়েছে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এমআরটিভি জানায়, মিন অং হ্লাইং মোট ৪ হাজার ৩৩৫ জন বন্দির জন্য সাধারণ ক্ষমা অনুমোদন করেছেন। এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, যাদের মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল, তাদের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড করা হবে, যদিও নির্দিষ্ট কোনো বন্দির নাম উল্লেখ করা হয়নি।
আরেক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট উইন মিন্টকে ক্ষমা করেছেন এবং নির্দিষ্ট শর্তে তার বাকি সাজাও কমানো হয়েছে। ৮০ বছর বয়সী অং সান সু চি বর্তমানে ২৭ বছরের সাজা ভোগ করছেন। তার বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগকে তার সমর্থকরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করেন। তার সাজা এক-ষষ্ঠাংশ কমানো হয়েছে বলে তার আইনজীবী জানিয়েছেন। তবে তিনি বাকি সাজা গৃহবন্দি অবস্থায় কাটানোর সুযোগ পাবেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। অভ্যুত্থানের পর মিন অং হ্লাইং সু চিকে গৃহবন্দি করেছিলেন।
মায়ানমারে সাধারণত জানুয়ারিতে স্বাধীনতা দিবস এবং এপ্রিলে নববর্ষ উপলক্ষে এ ধরনের সাধারণ ক্ষমা দেওয়া হয়। এবারের ক্ষমার আওতায় ১৭৯ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন, যাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে। এ ছাড়া সব মৃত্যুদণ্ডকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তর, যাবজ্জীবন সাজা ৪০ বছরে নামিয়ে আনা এবং অন্য বন্দিদের সাজা এক-ষষ্ঠাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শপথ গ্রহণের ভাষণে মিন অং হ্লাইং বলেন, ‘মায়ানমার আবার গণতন্ত্রের পথে ফিরেছে এবং একটি ভালো ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে’। তবে তিনি স্বীকার করেন, দেশটির এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
গতকাল শুক্রবার স্বজনদের মুক্তির আশায় ইয়াঙ্গুনের ইনসেইন কারাগারের বাইরে পরিবারগুলো ভিড় করে।
৩৮ বছর বয়সী অং হ্তেত নাইং বলেন, ‘আমার ভাই রাজনৈতিক মামলায় বন্দি। আশা করছি, আজকের মুক্তির তালিকায় সে থাকতে পারে। তবে আগেরবারগুলোতে সে ছিল না, তাই খুব বেশি আশা করছি না।’
তার এই সতর্ক আশার পেছনে একটি বাস্তবতা রয়েছে। ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড পলিসি মায়ানমারের তথ্যানুসারে, অভ্যুত্থানের পর ধারাবাহিক সাধারণ ক্ষমায় মুক্তি পাওয়া বন্দিদের মধ্যে ১৪ শতাংশেরও কম রাজনৈতিক বন্দি।
মানবাধিকার সংস্থা অ্যাসিস্টেন্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনারস জানিয়েছে, ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে ৩০ হাজারের বেশি মানুষ রাজনৈতিক অভিযোগে আটক হয়েছেন।
অং সান সু চিকে বিচার শেষ হওয়ার পর থেকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। তার অবস্থানও অজানা। তার ছেলে কিম অ্যারিস গত বছর জানান, তিনি তার মায়ের অবস্থা সম্পর্কে খুব সীমিত তথ্য পেয়েছেন এবং তার স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে।
সু চির সাজা কমানো একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে তার নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের মতে, শুধু কমানো নয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার ভিত্তিতে দেওয়া সাজা পুরোপুরি বাতিল করা উচিত।
জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক বলেছেন, ‘অং সান সু চিসহ অভ্যুত্থানের পর অন্যায়ভাবে আটক সবাইকে অবিলম্বে ও নিঃশর্তভাবে মুক্তি দিতে হবে। মায়ানমারের মানুষের বিরুদ্ধে চলমান সহিংসতারও অবসান ঘটাতে হবে।’ সূত্র: আল-জাজিরা