ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচিত হলো। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে প্রথম দফার নির্বাচনে ভোটারদের অভূতপূর্ব সাড়া মিলেছে। গত বৃহস্পতিবার রাজ্যের ১৫২টি আসনে অবিশ্বাস্যভাবে ৯২ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। এই বিপুল ভোটদান ভারতের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে। এই ব্যাপক জনস্রোতকে ঘিরে এখন ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস এবং প্রধান বিরোধী দল বিজেপি- উভয় পক্ষই জয়ের ব্যাপারে প্রবল আত্মবিশ্বাসী।
শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) বিজেপির শীর্ষ নেতা ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন, প্রথম দফার ১৫২টি আসনের মধ্যে বিজেপি ১১০ থেকে ১২৫টি আসনে জয়ী হতে চলেছে। অন্যদিকে, তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পাল্টা দাবি করেছেন, তার দল প্রথম দফায় অন্তত ১৩৫টি আসনে জয়লাভ করবে।
তৃণমূল বলছে ‘এম’ ফ্যাক্টর
তৃণমূলের জয়ের এই প্রত্যয়ের মূলে কাজ করছে বিশেষ ‘এম’ ফ্যাক্টর। দলের নীতিনির্ধারকদের মতে, এম ফ্যাক্টরের তিনটি স্তম্ভ হলো- মহিলা, মুসলিম এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং। এবারের নির্বাচনে মহিলা ভোটারদের ৯৩ শতাংশ ভোটদান তৃণমূলের আত্মবিশ্বাস বহু গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী ও স্বাস্থ্যসাথির মতো জনমুখী প্রকল্পের সুফল পাওয়া মহিলারা একচেটিয়াভাবে তৃণমূলকে ভোট দিয়েছেন বলে শাসক দল মনে করছে। পাশাপাশি, সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিও তাদের প্রধান ভরসা। এ ছাড়া, এসআইআর বা জাতীয় নাগরিক পঞ্জি-সংক্রান্ত ভীতির কারণে পরিযায়ী শ্রমিকরা দলে দলে ভোট দিতে আসায় তৃণমূল একে তাদের অনুকূল বলে মনে করছে।
অন্যদিকে, বিজেপি এই বিশাল ভোটদানকে ‘পরিবর্তনের সুনামি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। অমিত শাহর মতে, বহু বছর পর বাংলার মানুষ ভয়মুক্ত পরিবেশে ভোট দিতে পেরেছেন। সারা রাত নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে বিজেপি দাবি করছে, মানুষ দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট রাজের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় বিজেপি অভাবনীয় সাফল্যের আশা করছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও এই বিপুল ভোটদানকে তৃণমূলের ‘মহাজঙ্গলরাজ’ থেকে মুক্তির পথ হিসেবে দেখছেন।
নির্বাচনি মাঠের এই লড়াই ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং বাগ্যুদ্ধেও গড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর গঙ্গায় নৌকাবিহার নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কটাক্ষ করে দিল্লিতে যমুনা নদীর দূষণ সামলানোর পরামর্শ দিয়েছেন। বিপরীতে বিজেপি বলছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন বলেই খড়কুটো আঁকড়ে ধরছেন।
প্রথম দফার এই নির্বাচন বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেও ভোটের হার ছিল চোখে পড়ার মতো। তৃণমূলের ধারণা, অভিন্ন দেওয়ানি বিধির আশঙ্কায় সংখ্যালঘুরা বিজেপির বিরুদ্ধে তৃণমূলকেই ঢাল হিসেবে বেছে নিয়েছে। তবে বিজেপি নেতাদের দাবি, এবার সরকারবিরোধী হাওয়া এতটাই প্রবল যে, মমতার তথাকথিত ভোটব্যাংকে বড় ধরনের ধস নেমেছে।
উভয় দলের শীর্ষ নেতাদের বাগ্যুদ্ধ এবং বিশাল ভোটদানের হার ইঙ্গিত দিচ্ছে, এবারের লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। তৃণমূল যেখানে উন্নয়নের খতিয়ান ও ‘ঘরের মেয়ে’ ভাবমূর্তিকে সামনে রেখে লড়াই করছে, বিজেপি সেখানে দুর্নীতিমুক্ত শাসন ও পরিবর্তনের ডাক দিয়ে এগোচ্ছে। আগামী ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফায় কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার ১৪২টি আসনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ৪ মে চূড়ান্ত ফলাফল জানা যাবে। তবে প্রথম দফার এই রেকর্ড ভোটদান প্রমাণ করেছে, বাংলার মানুষ পরিবর্তনের জন্য হোক বা স্থায়িত্বের জন্য- নিজেদের মতামত জানাতে এবার কোনো কার্পণ্য করেনি।