পশ্চিমবঙ্গের মসনদ হারাল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস। অবসান ঘটল দলটির টানা ১৫ বছরের শাসনের। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয় ছিনিয়ে নিয়ে প্রথমবারের মতো বাংলায় ক্ষমতায় বসছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। মূলত দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষমতাবিরোধী মনোভাব (অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি), নিয়োগ, আবাসন প্রকল্পসহ প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতির অভিযোগ এবং সংখ্যালঘু (মুসলিম) ভোটব্যাংকে ফাটল ধরায় ধরাশায়ী হয়েছে ঘাসফুল শিবির। ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়া এবং হিন্দুত্বের মেরূকরণ বিজেপির পথকে প্রশস্ত করেছে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে সোমবার (৪ মে) একটি যুগান্তকারী দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। বুথফেরত সমীক্ষাকে ভুল প্রমাণ করে ম্যাজিক ফিগার অতিক্রম করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বিজেপি।
যে অটল বিহারি বাজপেয়ী একসময় বাংলায় পদ্ম ফোটানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা অবশেষে বাস্তবায়িত হলো। তৃণমূলের এই অভাবনীয় পতনের পেছনে বিশ্লেষকরা প্রধানত তৃণমূলের প্রশাসনিক ব্যর্থতা, দুর্নীতি, সাংগঠনিক ফাটল এবং বিজেপির সুপরিকল্পিত নির্বাচনি কৌশলসহ কমপক্ষে ৬টি বিষয়কে দায়ী করছেন।
শিক্ষক নিয়োগ থেকে পাচারকাণ্ডে দুর্নীতিতে বিদ্ধ প্রশাসন
বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। শিক্ষা দপ্তর থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রশাসন–সর্বত্রই আর্থিক অনিয়মের ছায়া দেখা যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলোর তৎপরতায় একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসায় উত্তাল রাজ্য রাজনীতি।
স্কুল সার্ভিস কমিশন (এসএসসি) নিয়োগ দুর্নীতি
রাজ্যের স্কুলগুলোতে শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মী নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। স্কুল সার্ভিস কমিশনের (এসএসসি) মাধ্যমে হওয়া এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মেধাতালিকাকে তোয়াক্কা না করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
অভিযোগ রয়েছে, যোগ্য ও মেধাবী প্রার্থীদের বঞ্চিত করে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অযোগ্য প্রার্থীদের চাকরি দেওয়া হয়েছে। এই কেলেঙ্কারিতে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম জড়িয়েছে এবং বিষয়টি বর্তমানে আদালতের বিচারাধীন।
পৌরসভা নিয়োগ কেলেঙ্কারি
শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি রাজ্যের বিভিন্ন পৌরসভায় কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রেও দুর্নীতির কালো ছায়া দেখা গেছে। রাজ্যের একাধিক পৌরসভায় নিয়মবহির্ভূতভাবে কর্মী নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে।
কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা (সিবিআই) বর্তমানে এই ঘটনার গভীরে পৌঁছাতে তদন্ত চালাচ্ছে। অর্থের বিনিময়ে অযোগ্যদের সরকারি চাকরিতে বসানোর এই অভিযোগ প্রশাসনের স্বচ্ছতাকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
আবাস যোজনায় অনিয়ম ও জনরোষ
প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় গরিব ও গৃহহীনদের জন্য ঘর বরাদ্দ হওয়ার কথা থাকলেও সেখানে স্বজনপোষণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতা, কর্মী এবং আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিরা এই প্রকল্পের সুবিধা ভোগ করছেন।
অন্যদিকে প্রকৃত অভাবী মানুষ মাথার ওপর ছাদ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ ঘটনার ফলে গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।
কয়লা ও গরু পাচারকাণ্ড
রাজ্যের সীমান্ত ও শিল্পাঞ্চলগুলোতে কয়লা এবং গরু পাচারের মতো গুরুতর অপরাধের অভিযোগ উঠেছে। বিরোধীদের দাবি, এই পাচার চক্রের সঙ্গে শাসক দলের প্রভাবশালী নেতারা সরাসরি যুক্ত এবং এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হয়েছে। এই পাচারকাণ্ডের শিকড় খুঁজতে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলো নিয়মিত তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদ চালিয়ে যাচ্ছে।
ভোটার তালিকা সংস্কার ও ‘সন্দেহভাজন’ ভোটার ফ্যাক্টর
নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকার ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) তৃণমূলের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথ্যানুযায়ী, প্রায় ৬১ লাখ মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর বাইরেও ৬০ লাখ মানুষকে ‘সন্দেহভাজন’ বা ‘আন্ডার এডুকেশন’ বিভাগে রাখা হয়েছে, যাদের বড় অংশই তৃণমূলের নিশ্চিত ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত ছিল। সামান্য বানান ভুল বা বয়সের অসংগতির কারণে ভোটাধিকার প্রয়োগে অনিশ্চয়তা তৃণমূলের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যায় সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।
হুমায়ুন কবীরের ‘আম জনতা পার্টি’ ও সংখ্যালঘু ভোট বিভাজন
তৃণমূলের দীর্ঘদিনের দুর্গ বলে পরিচিত সংখ্যালঘু প্রধান জেলাগুলোতে (মুর্শিদাবাদ, মালদহ) ফাটল ধরিয়েছেন বিদ্রোহী নেতা হুমায়ুন কবীর। তার নবগঠিত ‘আম জনতা উন্নয়ন পার্টি’ ১৮২টি আসনে প্রার্থী দিয়ে তৃণমূলের ভোটব্যাংকে ব্যাপক ধস নামিয়েছে। নওদা এবং রেজিনগরের মতো আসনে তৃণমূল প্রার্থীদের শোচনীয় পরাজয় প্রমাণ করে যে, সংখ্যালঘু ভোটাররা বিকল্প খুঁজতে শুরু করেছে। অন্তত ৩৫টি আসনে হুমায়ুনের দল ৫ থেকে ১২ শতাংশ ভোট কাটায় সেই সুবিধা সরাসরি বিজেপির অনুকূলে চলে গেছে। অর্থাৎ তৃণমূলের ‘ভোট কাটুয়া’ হিসেবে হুমায়ুন কবীর বিজেপির জয়ের পথ মসৃণ করেছেন।
হিন্দুত্বের মেরূকরণ
বিজেপি অত্যন্ত সফলভাবে হিন্দুত্বের আবেগকে কাজে লাগিয়ে ভোটারদের মেরূকরণ করতে সক্ষম হয়েছে। ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগানকে তারা প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গণনা চলাকালীন বড় দাবি করেছেন নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী তথা রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী।
তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে ‘হিন্দু ভোট সংহত’ হয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী আরও দাবি করেন, মুসলিম ভোটাররা এবার আগের মতো তৃণমূল কংগ্রেসকে (টিএমসি) ভোট দেননি।
মুসলিমদের ভোটের মেরূকরণ নিয়ে তিনি বলেন, ‘কিছু ভোট মুসলিমপন্থি দলের দিকে গেছে। আবার বিজেপিও সামান্য পরিমাণে কিছু মুসলিম ভোট পেয়েছেন। নন্দীগ্রামের মুসলিম বুথগুলোতে এত ভালো ফলের আশা আমি করিনি।’
বিজেপির এই প্রভাবশালী নেতার মতে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বাংলা গড়ার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা বিজেপির পক্ষে কাজ করেছে। তবে পশ্চিমবঙ্গে কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন হিন্দু সংহতিকে দেখা গিয়েছিল বিজেপির হয়ে প্রচার করতে।
বাম-কংগ্রেসের ব্যর্থতা ও মোদি ম্যাজিক
রাজ্যে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস সাংগঠনিকভাবে প্রান্তিক শক্তিতে পরিণত হওয়ায় তাদের বিশাল ভোটব্যাংক তৃণমূলকে রুখতে বিজেপির দিকে ঝুঁকেছে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত ক্যারিশমা এবং কেন্দ্রীয় উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি যুবসমাজ ও নারী ভোটারদের একটি বড় অংশকে আকৃষ্ট করেছে। তৃণমূলের একসময়ের বড় শক্তি ‘নারী ভোটব্যাংক’ এবার অনেকাংশেই গেরুয়া শিবিরের দিকে সরে গেছে।
‘বহিরাগত’ তকমা বিফল হওয়া
তৃণমূল বিজেপিকে ‘বহিরাগত’ বলে প্রচার করলেও শুভেন্দু অধিকারীর মতো স্থানীয় হেভিওয়েট নেতাদের সামনে রেখে বিজেপি সেই আক্রমণ রুখে দিয়েছে। অনুপ্রবেশ সমস্যা এবং সিএএ-এনআরসি ইস্যু হিন্দু উদ্বাস্তুদের মনে নিরাপত্তার আশা জাগিয়ে বিজেপির ভোট বাড়াতে সাহায্য করেছে।