যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সোমবার (১১ মে) রাতে ইউক্রেনের ওপর ২০০টির বেশি ড্রোন হামলা চালায় রাশিয়া। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন এ তথ্য। এতে যুদ্ধবিরতির সময়সীমা বৃদ্ধির যে আশা ছিল, তা আরও ক্ষীণ হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজয়ের বার্ষিকী উপলক্ষে ৯ থেকে ১১ মে পর্যন্ত যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল ইউক্রেন ও রাশিয়া। চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি উদ্যোগের অংশ ছিল এই সমঝোতা। গত শুক্রবার ট্রাম্প আশা প্রকাশ করেছিলেন, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও বাড়ানো হতে পারে।
যদিও যুদ্ধবিরতির সময় কোনো পক্ষই বড় ধরনের বিমান হামলার খবর দেয়নি। তার পরও সীমান্তরেখায় লড়াই চলেছে বলে অভিযোগ করেছে দুই দেশই। তারা একে অপরের বিরুদ্ধে ড্রোন ও গোলাবর্ষণের অভিযোগ তুলেছে। ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা জানান, কিয়েভ যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু মস্কো তার বদলে হামলা বাড়িয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আমরা মস্কোকে ১১ মের পরও আংশিক যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু এর বদলে গত রাতে রাশিয়া ইউক্রেনের ওপর ২০০টির বেশি ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় একটি কিন্ডারগার্টেনসহ বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এতে অন্তত ছয়জন আহত এবং একজন নিহত হয়েছেন।’
ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানায়, স্থানীয় সময় গত সোমবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাশিয়া মোট ২১৬টি ড্রোন ছোড়ে, যার মধ্যে ১৯২টি ভূপাতিত বা নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, ‘কয়েক দিন ধরে চলা আংশিক নীরবতা শেষ করার সিদ্ধান্ত রাশিয়াই নিয়েছে।’
তিনি জানান, বিভিন্ন অঞ্চলে ড্রোন প্রতিহত করা হলেও জ্বালানি স্থাপনা, আবাসিক ভবন, একটি কিন্ডারগার্টেন ও একটি বেসামরিক লোকোমোটিভ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিৎশ্চিকো জানান, রাজধানীর উত্তরের ওবোলন জেলায় ভূপাতিত একটি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ ১৬ তলা একটি আবাসিক ভবনের ছাদে পড়ে আগুন ধরে যায়।
কিয়েভ অঞ্চলের গভর্নর মাইকোলা কালাশনিক জানান, রাতের ড্রোন হামলায় একটি কিন্ডারগার্টেনের ছাদে আগুন লাগে এবং কাছের চারতলা আবাসিক ভবনের জানালা ভেঙে যায়। মধ্যাঞ্চলীয় চেরকাসি অঞ্চলে দুইজন আহত হন। পশ্চিমাঞ্চলীয় ঝিটোমির অঞ্চলে আবাসিক ভবন ও গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উত্তরাঞ্চলীয় চেরনিহিভ অঞ্চলও হামলার মুখে পড়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর দিনিপ্রোতে হামলায় পরিবহন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং একজন আহত হয়েছেন। দক্ষিণাঞ্চলীয় খেরসনে গোলাবর্ষণে এক নারী আহত হন। মাইকোলাইভ অঞ্চলে রুশ ড্রোন হামলায় বিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কয়েকটি এলাকা বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বলে জানান আঞ্চলিক গভর্নর ভিতালিই কিম।
পুতিনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ইউরোপের সরকারের
এদিকে, ইউরোপীয় সরকারগুলো গত সোমবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে, যেখানে তিনি ভবিষ্যতে ইউরোপের নিরাপত্তা নিয়ে মস্কোর সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনায় সাবেক জার্মান চ্যান্সেলর গেরহার্ড শ্রোয়েডারকে ইউরোপের প্রতিনিধি হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন।
গত শনিবার পুতিন বলেছিলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ শেষের দিকে যাচ্ছে বলে তিনি বিশ্বাস করেন এবং ইউরোপের নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনায় তিনি আগ্রহী। এ ক্ষেত্রে তার পছন্দের আলোচক হচ্ছেন শ্রোয়েডার। তবে ব্রাসেলসে বৈঠকে অংশ নেওয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মনে করেন, রাশিয়া এখনো আন্তরিকভাবে যুদ্ধ শেষ করতে বা শান্তি ও ইউরোপীয় নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত নয়।
তারা শ্রোয়েডারের সম্ভাব্য ভূমিকাও নাকচ করে দেন। কারণ তিনি রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কাজ করেছেন এবং পুতিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিপ্রধান কাজা কাল্লাস সাংবাদিকদের বলেন, ‘পুতিন কেন তাকে চাইছেন তা স্পষ্ট। তা হলে কার্যত তিনি আলোচনার দুই পাশেই বসবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে কে আলোচক হবেন, সেই অধিকার যদি রাশিয়াকে দিই, তা হলে সেটা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।’ এস্তোনিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাল্লাস বলেন, রাশিয়া এখনো সৎভাবে আলোচনায় আগ্রহী এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তার মতে, আগে ইউরোপীয় দেশগুলোর নিজেদের অবস্থান ঠিক করতে হবে।
জার্মানির ইউরোপবিষয়ক মন্ত্রী গুন্থার ক্রিশবাউম বলেন, ১৯৯৮ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত জার্মানির চ্যান্সেলর থাকা শ্রোয়েডারের নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হওয়ার মতো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। তিনি বলেন, ‘তিনি এখনো এবং অতীতেও পুতিনের প্রবল প্রভাবে ছিলেন।’ ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহাও শ্রোয়েডারের ভূমিকার বিরোধিতা করেন। তবে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন শান্তি আলোচনার পরিপূরক হিসেবে ইউরোপও আলোচনায় যুক্ত হতে পারে। তিনি বিস্তারিত কিছু না বললেও জানান, এসব আলোচনা ‘নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধান’ নিয়ে হতে পারে।
আলোচনার সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্র জানায়, সিবিহা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যদের কাছে রাশিয়া ও ইউক্রেনের বিমানবন্দরগুলোর ওপর হামলা বন্ধে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছেন। সূত্রটি জানায়, পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তির পরিবর্তে অর্জনযোগ্য লক্ষ্য নিয়ে এগোনোর চিন্তা থেকেই এই উদ্যোগ।
২০২২ সালে ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়াকে বিচ্ছিন্ন করার নীতি অনুসরণ করছে। তারা মস্কোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগও সীমিত রেখেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন শান্তি আলোচনা খুব বেশি অগ্রগতি না হওয়ায় এবং ওয়াশিংটন ইরান সংকটে বেশি মনোযোগ দেওয়ায়, কিছু ইউরোপীয় কর্মকর্তা এখন মস্কোর সঙ্গে সরাসরি আলোচনার পক্ষে মত দিচ্ছেন। এ ধরনের আলোচনায় বিশেষ দূত নিয়োগের কথাও উঠেছে।
ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্টা গত সপ্তাহে বলেন, ‘সঠিক সময় এলে’ রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনার জন্য কী প্রয়োজন এবং কীভাবে প্রস্তুতি নেওয়া যায়, তা নিয়ে তিনি অন্যান্য ইউরোপীয় নেতার সঙ্গে আলোচনা করছেন। তবে কাল্লাসসহ কয়েকজন মন্ত্রী বলেছেন, আলোচনায় যাওয়ার আগে রাশিয়ার ওপর চাপ আরও বাড়ানো উচিত।
লিথুয়ানিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী কেস্তুতিস বুদরিস বলেন, ‘এটা কাউকে বেছে নেওয়ার বিষয় নয়। প্রথমে আমাদের মূল বিষয়ে যেতে হবে, আর সেটি হলো রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়ানোর জন্য আমাদের উপায়গুলো প্রস্তুত করা।’ অস্ট্রিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিয়াতে মাইনল-রাইসিঙ্গার বলেন, রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার সময় এসেছে এবং এ জন্য একটি আলোচক দল গঠন করা উচিত। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘সেই সিদ্ধান্ত আমরা নেব, রাশিয়া নয়।’ সূত্র: রয়টার্স