রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার চলমান যুদ্ধে সম্মুখসমরে থাকা সেনাদের জীবন এখন চরম সংকটের মুখে। দুই দেশই আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তির আধিপত্য ও যুদ্ধের কৌশল পরিবর্তন করেছে। এতে সামনের সারির সেনাদের কাছে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় রসদ পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে উভয় পক্ষের সেনাদের মধ্যেই চরম খাদ্যাভাব ও অপুষ্টির করুণ চিত্র ফুটে উঠছে।
সম্প্রতি এপ্রিলে ইউক্রেনের চারজন কঙ্কালসার সৈনিকের ছবি ও আর্তি দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
জানা গেছে, প্রায় ১৭ দিন কোনো খাবার না পেয়ে ও দীর্ঘ সময় কোনো পরিবর্তন (রোটেশন) ছাড়াই তারা ফ্রন্টলাইনে টিকে ছিলেন। ১৪তম মেকানাইজড ব্রিগেডে দায়িত্বরত এক সেনার স্ত্রী আনাস্তাসিয়া সিলচুক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানান, ‘যোদ্ধারা ক্ষুধার জ্বালায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে, তারা বৃষ্টির পানি পান করছে।’
ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলের ওসকিল নদীর পূর্ব তীরে আটকেপড়া এই সেনাদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে ওঠে যখন রুশ বোমা হামলায় তাদের সংযোগকারী সেতুগুলো ধ্বংস হয়ে যায়। সিলচুক জানান, তার স্বামী রেডিওতে খাবারের জন্য বারবার চিৎকার করে আকুতি জানালেও কোনো সাহায্য পৌঁছায়নি।
চরম ক্ষুধার অভিজ্ঞতা
সম্প্রতি যুদ্ধে আহত হয়ে কিয়েভে চিকিৎসাধীন ৩১ বছর বয়সী ইউক্রেনীয় সেনা ওলেক্সান্দর আল-জাজিরাকে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি জানান, সম্মুখসমরে থাকা অবস্থায় পরিবারের চেয়েও বেশি মিস করতেন সাধারণ খাবার। ওলেক্সান্দর বলেন, ‘আপনি কেবল একটি গরম খাবারের স্বপ্ন দেখবেন, কারণ সপ্তাহের পর সপ্তাহ আপনার জুটেছে কেবল কিছু চকলেট বার, ওটমিল আর দিনে এক বোতল পানি।’
আধুনিক ড্রোন যুদ্ধের প্রভাবে এখন সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি বদলে গেছে। ফ্রন্টলাইনের ২৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ড্রোনের সার্বক্ষণিক নজরদারি থাকায় ট্রাক বা সাঁজোয়া যান নিয়ে যাতায়াত এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে একেকটি সামরিক অবস্থান এখন বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। ড্রোন ইউনিটের কমান্ডার ইহোর বলেন, ‘সেসব দিন শেষ হয়ে গেছে যখন আপনি বাংকার থেকে বেরিয়ে নিশ্চিন্তে একটা ধূমপান করতে পারতেন।’
রুশ বাহিনীর ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি একই রকম বিপজ্জনক। ড্রোনের আক্রমণ এড়াতে তারা মাত্র ২-৩ জনের ছোট দলে চলাচল করে, যা তাদের রসদ সরবরাহকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। ড্রোন থেকে বাঁচতে ১২০ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চালিয়েও রক্ষা পাওয়া যাচ্ছে না। ওলেক্সান্দর জানান, তারা এক দিনেই চারটি পিকআপ ভ্যান হারিয়েছেন।
আকাশপথে সরবরাহ
বর্তমানে ফ্রন্টলাইনে রসদ পাঠানোর একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্যামেরা লাগানো রোবটিক কার্ট এবং ভারী ড্রোন। ড্রোনের মাধ্যমে ওপর থেকে খাবার ও গোলাবারুদ ফেলা হয়। ড্রোন যুদ্ধের পথিকৃৎ আন্দ্রি প্রনিন জানান, গত এক বছর ধরে আকাশপথেই লজিস্টিক সেবা দেওয়া হচ্ছে। তবে জার্মান গবেষক নিকোলে মিত্রোখিন ড্রোনের মাধ্যমে রসদ সরবরাহের এই ব্যাপকতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
সেনাদের ক্ষুধার্ত থাকার বিষয়টি নিয়ে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তদন্ত শুরু করেছে। এতে সংশ্লিষ্ট ব্রিগেডের কমান্ডারকে বরখাস্ত করেছে দেশটি। মন্ত্রণালয়ের মতে, এই সংকট যেন কাঠামোগত সমস্যায় রূপ না নেয়, তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ক্ষুধার জ্বালায় আত্মসমর্পণের ঘটনাও ঘটছে। ২০২৫ সালের মার্চে খারকিভ অঞ্চলে এক রুশ সেনাকে ড্রোনের মাধ্যমে চকলেট বার ও আত্মসমর্পণের নির্দেশনা পাঠিয়ে উদ্ধার করে ইউক্রেনীয় বাহিনী।
অভুক্ত অবস্থায় পরিত্যক্ত
রুশ সেনাদের প্রায়ই কোনো পর্যাপ্ত খাদ্য ছাড়াই উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ মিশনে পাঠানো হচ্ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তাজিকিস্তান থেকে আসা মোহাম্মাদ নামে এক রুশ যোদ্ধা জানান, তাকে লুগানস্কের একটি পরিত্যক্ত গ্রামে এক মাস থাকতে হয়েছে। সেখানে তাকে দিনে মাত্র সামান্য পানি আর ২-৩টি চকলেট দেওয়া হতো। ক্ষুধার জ্বালায় তিনি কাঁচা ম্যাকারনি (গমের সেমোলিনা, পানি বা ডিম দিয়ে তৈরি শুকনা পাস্তা) বা খাবারের উচ্ছিষ্ট খুঁজে খেতেন। যুদ্ধের আগে ৭৬ কেজি ওজনের মোহাম্মাদ বন্দি অবস্থায় বর্তমানে ৬০ কেজিতে নেমে এসেছেন।
২০২৫ সালের অক্টোবরে ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা সংস্থা দাবি করে, দনিপ্রো নদীর দ্বীপগুলোতে শত শত রুশ সেনা খাদ্য ও গোলাবারুদ ছাড়াই পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। এমনকি চরম খাদ্যাভাবের কারণে রুশ সেনাদের মধ্যে স্বজাতীয় মানুষকে খাওয়ার (নরমাংস ভক্ষণ) মতো ভয়াবহ ঘটনারও খবর পাওয়া গেছে, যা ব্রিটিশ দৈনিক ‘দ্য টাইমস’-এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রযুক্তির এই যুদ্ধে সম্মুখসমরের সেনারা এখন কেবল শত্রুর গুলির সঙ্গেই নয়, ক্ষুধার বিরুদ্ধেও লড়াই করছেন। রসদ সরবরাহের এই সংকট যুদ্ধের গতিপ্রকৃতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সূত্র: আল-জাজিরা