যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এখন তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে। গত সপ্তাহে স্থানীয় নির্বাচনে ভরাডুবির পর তার দল লেবার পার্টির ভেতরেই শুরু হয়েছে নেতৃত্ব বদলের চাপ। একের পর এক মন্ত্রীর পদত্যাগ, এমপিদের প্রকাশ্য সমালোচনা ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, স্টারমার সরে দাঁড়ালে কে আসবেন তার জায়গায়। এই আলোচনায় উঠে এসেছে বেশ কয়েকজনের নাম।
মার্কিন সাময়িকী টাইমের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এখন নিজেকে টিকিয়ে রাখার লড়াই করছেন। তার দল লেবার পার্টিরই অন্তত ৮০ জন এমপি তাকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছেন। গত মঙ্গলবার সরকারের চারজন মন্ত্রী পদত্যাগ করেন। তাদের দাবি–স্টারমারের নেতৃত্বের ওপর তারা আর আস্থা রাখতে পারছেন না।
সেফগার্ডিং মন্ত্রী জেস ফিলিপস পদত্যাগপত্রে স্টারমারকে ‘ভালো মানুষ’ বলে উল্লেখ করেন। তবে তিনি বলেন, ‘শুধু ভালো মানুষ হওয়াই যথেষ্ট নয়।’
যুক্তরাজ্যের আবাসন ও কমিউনিটিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মিয়াত্তা ফাহনবুল্লাহ প্রধানমন্ত্রীকে দেশ ও লেবার পার্টির স্বার্থে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সুশৃঙ্খল নেতৃত্ব পরিবর্তনের সময়সূচি নির্ধারণ করার আহ্বান জানান। স্বাস্থ্য উদ্ভাবন ও নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী জুবির আহমেদ এবং নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা ও ভুক্তভোগীবিষয়ক মন্ত্রী অ্যালেক্স ডেভিস-জোন্সও একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে পদত্যাগ করেন।
তবে মঙ্গলবার সকালে মন্ত্রিসভার সদস্যদের স্টারমার স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি পদত্যাগ করবেন না। তিনি বলেন, ‘দেশ চায় আমরা সরকার পরিচালনার কাজে মনোযোগ দেই। আমি সেটাই করছি। মন্ত্রিসভা হিসেবে আমাদেরও সেটাই করতে হবে।’ স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির বড় পরাজয়ের দায় স্বীকার করার এক দিন পর তিনি এ কথা বলেন।
গত সপ্তাহের স্থানীয় নির্বাচনের খারাপ ফল অনেক এমপির জন্য শেষ ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর আগেও বিতর্কিত পিটার ম্যান্ডেলসনের নিয়োগ নিয়ে স্টারমারের সমালোচনা করে কেউ কেউ তার পদত্যাগ দাবি করেছিলেন।
স্টারমার নতুন করে দল গোছানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও তাতে উদ্বেগ কমেনি। এখন পর্যন্ত অন্তত ৮০ জন লেবার পার্টির এমপি তাকে সরে যাওয়ার সময়সীমা ঘোষণা করতে বলেছেন। তবে স্টারমার মন্ত্রিসভাকে মনে করিয়ে দেন, ‘তাকে সরানোর দাবি বাড়লেও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তার নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ তোলা হয়নি।’
ইনস্টিটিউট ফর গভর্নমেন্টের হিসাব অনুযায়ী, কেউ যদি স্টারমারকে সরানোর জন্য নতুন করে দলীয় নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করতে চান, তবে সেই প্রার্থীকে লেবার পার্টির অন্তত ২০ শতাংশ এমপির সমর্থন পেতে হবে। বর্তমান সংসদের আসন সংখ্যা অনুযায়ী এর অর্থ হলো, অন্তত ৮১ জন এমপির সরাসরি সমর্থন লাগবে।
লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক টিম বেল টাইমকে বলেন, ‘একবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নাম চূড়ান্ত হয়ে গেলে মূল লড়াইটি চলে যায় লেবার পার্টির সাধারণ কর্মী-সমর্থক, সহযোগী সংগঠন এবং শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর সদস্যদের হাতে। তারাই ভোটের মাধ্যমে চূড়ান্ত নেতা বেছে নেন।’
নেতৃত্ব নির্বাচন ছাড়াও স্টারমারকে সরানোর আরেকটি পথ রয়েছে বলে মনে করেন টিম বেল। তিনি বলেন, ‘যদি মন্ত্রীরা ‘দলবেঁধে পদত্যাগ শুরু করেন এবং তাদের জায়গায় নতুন কাউকে বসানো কঠিন কিংবা অসম্ভব হয়ে পড়ে, তাহলে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।’
এমন ঘটনা ২০২২ সালেও ঘটেছিল। তখন কনজারভেটিভ পার্টির নেতা ও প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন একের পর এক নৈতিকতাসংক্রান্ত কেলেঙ্কারির প্রতিবাদে সরকারের ৫০ জনের বেশি সদস্য পদত্যাগ করায় শেষ পর্যন্ত সরে দাঁড়ান।
স্টারমারের প্রধানমন্ত্রিত্ব সংকটে পড়ায় ফের আলোচনা শুরু হয়েছে। তিনি পদত্যাগ করলে বা তাকে সরিয়ে দেওয়া হলে তার জায়গায় কে আসতে পারেন।
অ্যান্ডি বার্নহ্যাম
সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের তালিকায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। ইউগভের জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে ব্রিটিশ জনগণের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় লেবার রাজনীতিক তিনি। জরিপে অংশ নেওয়া ৩৫ শতাংশ মানুষ তার সম্পর্কে ইতিবাচক মত দিয়েছেন। সেখানে স্টারমারের জনপ্রিয়তার হার ১৯ শতাংশ। তবে কার্যকর প্রার্থী হতে হলে বার্নহ্যামকে আগে উপনির্বাচনের মাধ্যমে আবার হাউস অব কমন্সে ফিরতে হবে। এজন্য লেবার পার্টির কোনো এক এমপিকে আসন ছাড়তে হবে।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক টনি ট্রাভার্স বলেন, ‘বার্নহ্যামের দলের সদস্যদের মধ্যে শক্ত সমর্থনভিত্তি রয়েছে। উত্তর ইংল্যান্ডে ভোটারদের সমর্থন টানার বিশেষ ক্ষমতাও তার আছে।’
ওয়েস স্ট্রিটিং
সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম বর্তমান স্বাস্থ্য সচিব ওয়েস স্ট্রিটিং। খবর অনুযায়ী, স্টারমার সরে দাঁড়ালে নেতৃত্বের দৌড়ে নামতে তিনিও আগ্রহী।
টনি ট্রাভার্স বলেন, ‘স্ট্রিটিংয়ের এমন একটি দক্ষতা আছে, যা কিয়ার স্টারমারের নেই। আর সেটি হলো নিজের কাজকে মানুষের কাছে দৃশ্যমান ও সহজবোধ্য করে তোলা।
গত দুই বছরে তিনি জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা (এনএইচএস) আরও ডিজিটাল করার পক্ষে জোর দিয়েছেন। পাশাপাশি ২০২৯ সালের মধ্যে এনএইচএসের দীর্ঘ অপেক্ষার সময় কমানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।
ট্রাভার্সের মতে, স্ট্রিটিংকে লেবার পার্টির মধ্যপন্থি বা মধ্য ডানপন্থি অংশের প্রতিনিধি হিসেবে দেখা হয়।
অ্যাঞ্জেলা রেইনার
সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় আছেন লেবার পার্টির সাবেক ডেপুটি নেতা অ্যাঞ্জেলা রেইনারও। ইউগভের জরিপে তার ইতিবাচক জনপ্রিয়তার হার ২৪ শতাংশ।
অধ্যাপক টনি ট্রাভার্স বলেন, দলের ভেতরে, বিশেষ করে ব্যাকবেঞ্চ এমপি ও সাধারণ সদস্যদের মধ্যে রেইনার বেশ জনপ্রিয়। সাধারণ মানুষের কাছেও তিনি অনেক রাজনীতিকের চেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য।
তবে নিজের বাড়ির কর কম পরিশোধের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর গত সেপ্টেম্বরে তিনি উপপ্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। পরে স্টারমারের নৈতিকতাবিষয়ক উপদেষ্টা সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, তিনি মন্ত্রীদের আচরণবিধি ভঙ্গ করেছেন।
পদত্যাগপত্রে রেইনার বলেন, ‘অতিরিক্ত বিশেষজ্ঞ কর পরামর্শ না নেওয়ার সিদ্ধান্তের জন্য আমি গভীরভাবে অনুতপ্ত। এই ভুলের সব দায় আমি নিচ্ছি।’
তবে তার করসংক্রান্ত সরকারি তদন্তের ফল শিগগিরই প্রকাশ হতে পারে। এতে হয়তো তাকে সব ধরনের অভিযোগ থেকে মুক্ত ঘোষণা করা হবে।
রেইনারও বার্নহ্যামকে সম্ভাব্য উপনির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সময়ের দাবি অনুযায়ী পরিবর্তনের গুরুত্ব আমরা বুঝি, এটি দেখাতে হলে আমাদের সেরা খেলোয়াড়দের পার্লামেন্টে আনতে হবে।’
এড মিলিব্যান্ড
আলোচনায় রয়েছে লেবার পার্টির সাবেক নেতা এড মিলিব্যান্ডের নামও। বর্তমানে তিনি স্টারমারের মন্ত্রিসভায় জ্বালানি নিরাপত্তা ও নেট জিরোবিষয়ক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অধ্যাপক টনি ট্রাভার্স বলেন, ‘দলের সদস্যদের মধ্যে তিনি জনপ্রিয়। তবে সমস্যা হলো, তিনি আগে দলীয় নেতা ছিলেন এবং সাধারণ নির্বাচনে জিততে পারেননি।’
তবে বার্নহ্যাম যদি নেতৃত্ব নির্বাচনের আগে এমপি হতে ব্যর্থ হন, তাহলে মিলিব্যান্ডকে অন্তর্বর্তী বা সাময়িক নেতা হিসেবে দেখা হতে পারে বলেও মত দেন তিনি।