চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে বৃহস্পতিবার (১৪ মে) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণী এই বৈঠকে তাইওয়ান ইস্যুতে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন শি জিনপিং। তিনি সাফ জানিয়েছেন, তাইওয়ান ইস্যুটি যদি ‘সঠিকভাবে পরিচালনা’ করা না হয়, তবে দুই দেশের মধ্যে সংঘাত, এমনকি যুদ্ধও বেঁধে যেতে পারে।
এ ছাড়া বৈঠকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বদলে সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন শি জিনপিং। তিনি বলেন, সংঘাত নয় বরং অংশীদারত্বই দুই দেশের সমৃদ্ধির পথ। বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে মতপার্থক্য ভুলে বড় শক্তি হিসেবে একে অপরকে সফল করতে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে সঠিক পথে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে দুই নেতার মধ্যে প্রায় ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়। গত বছরের তীব্র বাণিজ্যযুদ্ধের পর দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থিতিশীল করা এবং বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। তবে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল তাইওয়ান প্রশ্ন এবং ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি।
বৈঠক শেষে হোয়াইট হাউস একে ‘ফলপ্রসূ’ হিসেবে বর্ণনা করলেও তাইওয়ান প্রসঙ্গে তারা নীরব ছিল। তবে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) শি জিনপিংয়ের বক্তব্যের একটি বিবরণ প্রকাশ করেছেন। সেখানে শি জিনপিং ট্রাম্পকে সরাসরি বলেন, ‘চীন-মার্কিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাইওয়ান ইস্যুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। এটি সঠিকভাবে পরিচালনা করা হলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে। অন্যথায় দুই দেশ সরাসরি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারে, যা বিশ্বজুড়ে সম্পর্কের ক্ষেত্রে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে।’
শি জিনপিং আরও বলেন, ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতা’ এবং প্রণালির শান্তি কখনোই একসঙ্গে চলতে পারে না; যেমন আগুন এবং পানি পরস্পরবিরোধী। তিনি সতর্ক করে বলেন, তাইওয়ান প্রণালিতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই এখন দুই দেশের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। উল্লেখ্য, তাইওয়ান একটি গণতান্ত্রিক দ্বীপরাষ্ট্র, যা বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ তৈরি করে। চীন দীর্ঘদিন ধরে এটিকে নিজেদের অংশ মনে করে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে তা দখলের হুমকি দিয়ে আসছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে সামরিক সহায়তা দিলেও সরাসরি যুদ্ধে নামবে কি না, তা নিয়ে সব সময় অস্পষ্টতা বজায় রেখেছে।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার’ হওয়া উচিত: জিনপিং
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিযোগিতা নয়, সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন শি জিনপিং। তিনি বলেছেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার’ হওয়া উচিত। বৈঠকের শুরুতে দেওয়া বক্তব্যে শি জিনপিং বলেন, ‘চীন ও যুক্তরাষ্ট্র–দুই দেশই সহযোগিতা থেকে লাভবান হতে পারে এবং সংঘাত থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
তিনি বলেন, এই বৈঠকের দিকে বিশ্বজুড়ে মানুষের নজর রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘নতুন যুগে বড় শক্তিধর দেশগুলো কীভাবে একসঙ্গে চলবে, আমাদের সেই সঠিক পথ খুঁজে বের করতে হবে। আমাদের একে অপরকে সফল হতে সহায়তা করতে হবে এবং একসঙ্গে সমৃদ্ধ হতে হবে।’
চীনা প্রেসিডেন্ট বলেন, তিনি সব সময় বিশ্বাস করেন যে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্যের চেয়ে অভিন্ন স্বার্থই বেশি। তার ভাষায়, ‘এক দেশের সাফল্য অন্য দেশের জন্যও একটি সুযোগ।’ পাশাপাশি স্থিতিশীল চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক বিশ্বের জন্যও উপকারী বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রেসিডেন্ট জিনপিং জানান, দুই দেশের পাশাপাশি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে তিনি আরও আলোচনা করতে আগ্রহী। একই সঙ্গে তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করে ‘চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বিশাল জাহাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে’ চান বলেও উল্লেখ করেন।
বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা
তাইওয়ান নিয়ে উত্তেজনা থাকলেও বাণিজ্য ইস্যুতে দুই নেতা ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। গত বছরের নজিরবিহীন বাণিজ্যযুদ্ধের পর যেখানে উভয় দেশ একে অপরের ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছিল, সেখানে এবার নমনীয়তা দেখা গেছে। শি জিনপিং বলেন, ‘চীন-আমেরিকা অর্থনৈতিক সম্পর্ক দুই দেশের জন্যই লাভজনক। বাণিজ্যযুদ্ধে কারও জয় হয় না। আলোচনার মাধ্যমেই সব মতভেদ দূর করা সম্ভব।’
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও চীনের সঙ্গে ব্যবসা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে একটি চমৎকার ভবিষ্যৎ গড়তে যাচ্ছি।’ ট্রাম্পের এই সফরে তার সঙ্গে মার্কিন শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীদের একটি প্রতিনিধি দল ছিল। টেসলার সিইও ইলন মাস্ক, এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াং এবং অ্যাপলের বিদায়ী সিইও টিম কুকের মতো ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে এই প্রধান নির্বাহীদের শি জিনপিংয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এনভিডিয়া চীনে তাদের উন্নত চিপ বিক্রির সুযোগ খুঁজছে। বৈঠক শেষে ইলন মাস্ক ও জেনসেন হুয়াং জানান, আলোচনা অত্যন্ত সফল হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে একমত দুই নেতা
বৈঠকে ইরানের সঙ্গে আমেরিকার যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেন জ্বালানি তেলের অবাধ প্রবাহ অব্যাহত থাকে, সে বিষয়ে দুই নেতা একমত হয়েছেন। শি জিনপিং স্পষ্ট করেছেন, চীন হরমুজ প্রণালিকে সামরিকীকরণ করার বিরোধী। তবে চীন তার জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বেশি তেল কেনার আগ্রহ দেখিয়েছে, যাতে এই অঞ্চলের ওপর তাদের নির্ভরতা কমে। এ ছাড়া ইরান যাতে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়েও দুই দেশ একমত হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, ইরানের ওপর চীনের অর্থনৈতিক সমর্থন কমানোর জন্য তারা চাপ দিচ্ছেন। কারণ চীন হলো ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি সেখানে ব্যস্ত থাকায় বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ওয়াশিংটনের জন্য কিছুটা কঠিন হয়ে পড়েছে।
দিনের শুরুতে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে ট্রাম্পকে রাজকীয় সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ব্যান্ড দল, সামরিক কুচকাওয়াজ এবং ছোট ছোট শিশুর পতাকা নাড়ানোর মধ্য দিয়ে তাকে স্বাগত জানানো হয়। বৈঠক ও মন্দির পরিদর্শনের পর এক রাষ্ট্রীয় ভোজসভার আয়োজন করা হয়। সেখানে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং তার স্ত্রীকে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে সফরের আমন্ত্রণ জানান।
ট্রাম্প শি জিনপিংকে একজন ‘মহান নেতা’ এবং ‘বন্ধু’ হিসেবে সম্বোধন করেন। তিনি বলেন, বেইজিং একটি সুন্দর এবং অবিশ্বাস্য জায়গা। যদিও পেছনে তাইওয়ান ও বাণিজ্য নিয়ে গভীর বিরোধ রয়ে গেছে, তবুও এই সফরের মাধ্যমে দুই পরাশক্তি সম্পর্কের বরফ গলানোর চেষ্টা করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ২০১৭ সালের পর এটিই কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম চীন সফর। দুপক্ষই এখন চাইছে গত বছরের সংঘাতময় পরিস্থিতি কাটিয়ে একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে। তবে তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের অনড় অবস্থান আগামী দিনে এই বন্ধুত্বের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।