ইরানে হামলার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে। শান্তিচুক্তি না হলে তারা আবার বোমা হামলা শুরুর যে হুমকি দিয়েছিল, তা থেকে সরে আসতে শুরু করেছে। তবে ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গন আবারও যুদ্ধ শুরুর জন্য উদগ্রীব বলে খবর এসেছে।
ডানপন্থি ইসরায়েলি টেলিভিশন চ্যানেল ১৪-এর উপস্থাপক শিমন রিকলিন তেহরানে নতুন হামলার কথিত গোপন পরিকল্পনা ফাঁস করেছেন। তিনি ইরানের একটি ইউরেনিয়াম সংরক্ষণাগারের অবস্থানও উল্লেখ করেন, যা হামলার লক্ষ্য হতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে।
ইসরায়েলি পার্লামেন্টের সদস্যরা রিকলিনের এই মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন। পরে রিকলিন দাবি করেন, তার বক্তব্য ছিল পুরোপুরি কাল্পনিক। তবুও ইসরায়েল যে আবার সংঘাত শুরু করতে আগ্রহী, এ বিষয়ে ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া তারা তা করতে পারবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। আর সেই অনুমতি দ্রুত মিলবে বলেও মনে হচ্ছে না।
ওয়াশিংটনের যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের উদ্বেগ উপেক্ষা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে ফোনালাপের খবর প্রকাশের পর নেতানিয়াহু নাকি ভীষণ চাপে পড়েন।
চলতি সপ্তাহে ইসরায়েলি গণমাধ্যম জানিয়েছে, নেতানিয়াহু ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পুনরায় শুরু করা নিয়ে নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার দ্বিতীয় বৈঠকে সভাপতিত্ব করেছেন। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক হামলার পরও তেহরানের সরকার এখনো টিকে আছে।
আঞ্চলিক দেশগুলোতে ইরানের পাল্টা হামলা এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার কারণে তেহরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহ যুক্তরাষ্ট্রের কমে গেছে।
ইরানভীতি
নেতানিয়াহুর জন্য ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলি জনগণকে দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখানো হয়েছে। তাই এ যুদ্ধবিরতি তাদের অস্বস্তিতে ফেলেছে।
বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট যুদ্ধবিরতিকে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। লাপিদ এই যুদ্ধবিরতিকে ইসরায়েলের ইতিহাসের অন্যতম বড় ‘রাজনৈতিক বিপর্যয়’ বলে বর্ণনা করেছেন। অনেকের মতে, এই দৃষ্টিভঙ্গি ইসরায়েলি জনগণের মনোভাবের সঙ্গেও মিলে যায়।
মে মাসের শুরুতে ইসরায়েল ডেমোক্র্যাসি ইনস্টিটিউটের এক জরিপে দেখা যায়, অধিকাংশ ইসরায়েলি মনে করেন যুদ্ধ দ্রুত শেষ করা দেশের নিরাপত্তা স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে। একই সঙ্গে অনেকে মনে করেন, আবারও যুদ্ধ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বেন-গুরিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাগাই রাম আল জাজিরাকে বলেন, ইসরায়েলি জনগণ ও রাজনৈতিক শ্রেণি বহুদিন ধরে ইরানকে নিজেদের সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে দেখে এসেছে।
ইরানভীতি নিয়ে লেখা তার বইয়ের প্রসঙ্গ টেনে রাম বলেন, ইসরায়েলিদের এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে যেন যুদ্ধ অনিবার্য। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময় বোমা আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা অনেক মানুষকে তিনি দেখেছেন, যারা পরিস্থিতিকে খুব স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিলেন।
তার ভাষায়, ‘তাদের কাছে এটা একদম স্বাভাবিক ছিল যে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি থামাতে হলে বা তাদের দৃষ্টিতে ‘ইরানের জনগণকে মুক্ত করতে’ হলে জীবন থামিয়ে রাখাও মেনে নিতে হবে।’ রামের মতে, অনেক ইসরায়েলির কাছে এখন মূল প্রশ্ন হলো, নেতানিয়াহু কীভাবে ইরানকে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করবেন।
রাজনৈতিক জাদু
ইসরায়েলে অনেকেই নেতানিয়াহুকে এমন এক নেতা হিসেবে দেখেন, যিনি রাজনৈতিক নিয়মকানুন অতিক্রম করতে পারেন। ২০২২ সালে একাধিক দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত থাকা সত্ত্বেও তিনি নির্বাচনে জয়ী হন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার নিরাপত্তা ব্যর্থতা থেকেও তিনি নিজেকে অনেকটা দূরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। এমনকি ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামাতে প্রভাবিত করার কৃতিত্বও অনেকে তাকে দেন, যদিও তিনি তা অস্বীকার করেন।
সাবেক ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ও নিউইয়র্কে কনসাল জেনারেল অ্যালন পিঙ্কাস আল জাজিরাকে বলেন, ২০২৩ সালের অক্টোবরের হামলা এবং ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি, যেখানে ইসরায়েলের কোনো ভূমিকা ছিল না, এ দুটি বিষয় নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভাবনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এগুলোই তাকে আবার সামরিক অভিযান শুরু করতে উৎসাহিত করতে পারে।
পিঙ্কাস বলেন, ‘আমার ধারণা, নেতানিয়াহু যুদ্ধ আবার শুরু করতে চান তিনটি কারণে। প্রথমত, তিনি ৭ অক্টোবরের ঘটনা থেকে মনোযোগ সরাতে চান। এ জন্য তার বড় কোনো কৌশলগত বিজয় দরকার, যা গাজা বা লেবাননে তিনি পাচ্ছেন না। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধ শেষ হয়নি। যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই বলবে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইসরায়েল তেমন কিছু অর্জন করতে পারেনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘তৃতীয়ত, জনমত জরিপ দেখলেই বোঝা যায়, বছরের শেষে নির্বাচনে যাওয়ার আগে ইরান ইস্যুতে একটি বিজয় তার প্রয়োজন। ইরানের হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া, যার কারণে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে ইরানের হামলা–এসব সম্ভবত নেতানিয়াহু যুদ্ধ শুরুর সময় কল্পনাও করেননি। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইসরায়েলের ব্যর্থতাগুলো আগামী সাধারণ নির্বাচনে বড় বিতর্কের বিষয় হতে পারে। নির্বাচন হওয়ার কথা আগস্টে।’
ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা
এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির কয়েক সপ্তাহ পর ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র সবুজ সংকেত দিলেই ইসরায়েল ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে’ ফিরিয়ে দিতে প্রস্তুত। এতে আবারও স্পষ্ট হয়, ইসরায়েলি সরকার সংঘাত পুনরায় শুরু করতে কতটা আগ্রহী।
সাবেক ইসরায়েলি সরকারি উপদেষ্টা ড্যানিয়েল লেভি আল জাজিরাকে বলেন, ‘ইসরায়েলের মধ্যে এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা ক্ষতি মেনে নিয়ে সরে যেতে চান। আবার নেতানিয়াহু এবং মূলধারার অনেক রাজনীতিক আছেন, যারা উল্টো আরও এগোতে চান এবং ইরানের উপকূলে জড়ো করা মার্কিন অস্ত্রশক্তি ব্যবহার করে দেশটিকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলতে চান।’
তবে শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহুর ক্ষমতারও সীমা আছে। লেভির ভাষায়, ‘যুক্তরাষ্ট্র যখন বলবে যুদ্ধ থামবে, তখনই তা থামবে।’ আর ট্রাম্পও গত মঙ্গলবারের ফোনালাপের পর নেতানিয়াহু সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমি যা চাইব, সে তাই করবে।’ সূত্র: আল জাজিরা