সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার গভীরে জাপান ট্রেঞ্চে লুকিয়ে আছে পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্প ও সুনামির রহস্য। যেখানে বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছেন নতুন তথ্য, যা ভবিষ্যতের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বোঝা ও প্রস্তুতিতে সহায়ক হতে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল ওশান ডিসকভারি প্রোগ্রামের (আইওডিপি) অধীনে ‘এক্সপিডিশন ৪০৫’-এ বিশ্বের সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক খনন জাহাজ চিকিউ ব্যবহার করা হয়। এতে ৬০ জন গবেষক অংশ নেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪ মাস ধরে চলা এ অভিযানে সমুদ্রতলের ফল্ট জোন থেকে শিলা ও পলির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এ ছাড়া সেখানে তাপমাত্রা ও চাপ পর্যবেক্ষণের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রও স্থাপন করা হয়েছে। এই দলে ছিলেন পাললিক শিলা বিশেষজ্ঞ, ভূ-রসায়নবিদ, ভূ-পদার্থবিদসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞ।
এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল ২০১১ সালের প্রলয়ঙ্করী ‘তোহোকু’ ভূমিকম্পের উৎসস্থলে পৌঁছানো। বিজ্ঞানীরা সেই ফল্টের ‘ডেকোলমেন্ট’ বা মূল বিচ্যুতি স্তরে খনন করতে সক্ষম হন, যা ওই বিধ্বংসী ভূমিকম্পের জন্য দায়ী। সংগৃহীত নমুনাগুলো বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করছেন, কীভাবে এত শক্তিশালী ভূমিকম্পের সূত্রপাত হয়।
২০১১ সালের ১১ মার্চ জাপানের উত্তর-পূর্ব উপকূলে ৯ দশমিক ১ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর ফলে সৃষ্ট সুনামিতে প্রাণ হারান ১৮ হাজারের বেশি মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, বড় ভূমিকম্প সাধারণত ভূ-পৃষ্ঠের অনেক গভীরে ঘটে। তবে তোহোকু ভূমিকম্পে দেখা যায়, টেকটোনিক প্লেটের সবচেয়ে বড় বিচ্যুতিটি ঘটেছিল সমুদ্রতলের কাছাকাছি অগভীর অংশে। জাপান ট্রেঞ্চে প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্লেট ওখোৎস্ক প্লেটের নিচে ধাক্কা খাচ্ছে। এতদিন মনে করা হতো, এ অংশ ধীরে ও শান্তভাবে সরে যায়। তবে ২০১১ সালে এখানে প্রায় ৫০ মিটারের বেশি বিচ্যুতি ঘটে, যা বিপুল পানিকে সরিয়ে সুনামির জন্ম দেয়।
এক্সপিডিশন ৪০৫-এ গবেষকরা সমুদ্রতল থেকে ৮০০ মিটারের বেশি খনন করে নমুনা সংগ্রহ করেন। জাহাজে প্রতি তিন ঘণ্টায় নতুন কোর আনা হয়, যা লাখো বছরের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের আর্কাইভ হিসেবে বিবেচিত।
নমুনা বিশ্লেষণে পাওয়া গেছে ‘স্মেকটাইট’ নামের এক ধরনের পিচ্ছিল কাদামাটির খনিজ। এটি ফল্টের ঘর্ষণ কমিয়ে প্লেটগুলোকে সহজে সরে যেতে সাহায্য করে। এ কারণে অগভীর অংশেও সুনামি সৃষ্টিকারী শক্তিশালী ভূমিকম্প হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ‘চার্ট’ নামের কঠিন শিলাস্তরে পৌঁছানো। এটি ছিল ‘ডেকোলমেন্ট জোন’, যেখানে একটি প্লেট আরেকটির নিচে চলে যায়। এই স্তরের কাদামাটিতে চকলেট, ভ্যানিলা ও ক্যারামেলের মতো রঙিন ছোপ পাওয়া গেছে, যা গভীর ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার নিদর্শন।
ভূমিকম্পের উৎসস্থলে একটি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনকে অভিযানের বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এটি দীর্ঘমেয়াদে তাপমাত্রা ও পানির চাপ পরিমাপ করবে। এ তথ্য ব্যবহার করে ভূমিকম্পের সিমুলেশন তৈরি করা সম্ভব হবে।
গবেষকরা বলছেন, জাপান ট্রেঞ্চের মতো সাবডাকশন জোন চিলি, আলাস্কা ও ইন্দোনেশিয়ার মতো বিশ্বের আরও অনেক দেশে রয়েছে। সেসব অঞ্চলের কাছে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা অবস্থিত। সেখানে অগভীর অংশে বড় ধরনের বিচ্যুতি ঘটতে পারে। তাই ঝুঁকি মূল্যায়ন ও দুর্যোগ মোকাবিলার কৌশল নতুন করে ভাবতে হবে।
এই অভিযানের লক্ষ্য শুধু অতীতের ভূমিকম্প বোঝা নয়, ভবিষ্যতের জন্যও প্রস্তুত থাকা। সংগৃহীত তথ্য বিজ্ঞানীদের মেগা-ভূমিকম্পের আচরণ আরও পরিষ্কারভাবে বুঝতে সাহায্য করবে, যা বিশ্বজুড়ে সুনামি সতর্কতা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বড় ভূমিকা রাখবে।


