মহাবিশ্বে ভিনগ্রহের প্রাণ আছে কি না— এ প্রশ্ন বিজ্ঞানীদের বহুদিনের। তবে আমাদের সমুদ্রেই এমন অনেক প্রাণী আছে, যেগুলো জীবন সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ করে। সামুদ্রিক প্রাণীদের মধ্যে জেলিফিশ সম্ভবত সবচেয়ে অদ্ভুতদের একটি। এদের মস্তিষ্ক নেই, হাড় নেই, হৃদযন্ত্র নেই—এমনকি কিছু প্রজাতি কার্যত চিরজীবীও। প্রাণিজগতে জেলিফিশের মতো এত ‘ভিনগ্রহী’ বৈশিষ্ট্য খুব কম প্রাণীর মধ্যেই দেখা যায়। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা হংকংয়ের কাছাকাছি লবণাক্ত-স্বাদু পানির পুকুরে (যেগুলো ‘গেই ওয়াই’ নামে পরিচিত) বক্স জেলিফিশ পরিবারের (Tripedaliidae) একটি নতুন প্রজাতি আবিষ্কার করেছেন। গড়ে মাত্র ১ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার লম্বা এই জেলিফিশটির শরীরে মোট ২৪টি চোখ রয়েছে, যা চারটি সংবেদনশীল অঙ্গে বিভক্ত। এই চোখগুলোর সমন্বয়ে প্রাণীটি একসঙ্গে ৩৬০ ডিগ্রি দৃষ্টিসীমা পায়।
এখন পর্যন্ত এই নতুন প্রজাতিটি কেবল একটি সংরক্ষিত এলাকাতেই পাওয়া গেছে, তবে বিজ্ঞানীদের ধারণা— পাশের জলাঞ্চলেও এদের উপস্থিতি থাকতে পারে।
এই অদ্ভুততার তালিকা আরও দীর্ঘ হয়- যখন Zoological Studies জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় হংকং ব্যাপটিস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের (HKBU) বিজ্ঞানীরা বক্স জেলিফিশের একটি নতুন প্রজাতির সন্ধান দেন। মাই পো নেচার রিজার্ভের কাছে লবণাক্ত পানির চিংড়ি চাষের পুকুরে এই প্রজাতিটি পাওয়া যায়। কিউবোযোয়া শ্রেণির এই জেলিফিশটির নাম দেওয়া হয়েছে Tripedalia maipoensis। এটি Tripedalia গণের তৃতীয় প্রজাতি এবং চীনের জলসীমায় আবিষ্কৃত প্রথম প্রজাতি।
গবেষক দলটি প্রথম ২০২০ সালে এই জেলিফিশটির সন্ধান পান এবং পরবর্তী প্রতিটি বছরেই সংরক্ষিত এলাকার পুকুরগুলোতে এদের উপস্থিতি লক্ষ্য করেন। নামটি নির্দিষ্ট এলাকার সঙ্গে যুক্ত হলেও বিজ্ঞানীদের ধারণা— এরা শুধু এই সংরক্ষিত এলাকাতেই সীমাবদ্ধ নয়। কারণ গেই ওয়াই পুকুরগুলো জোয়ার-ভাটার খালের মাধ্যমে পার্ল নদীর মোহনার সঙ্গে যুক্ত।
এই প্রজাতির নামকরণ প্রসঙ্গে HKBU–এর জীববিজ্ঞানী ও গবেষণার সহলেখক কিউ জিয়ানওয়েন বলেন, যে এলাকায় প্রথম এ প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গেছে, তার প্রতিফলন ঘটাতেই নাম রাখা হয়েছে Tripedalia maipoensis।
বক্স জেলিফিশ সাধারণত খুব বড় আকারের হয় না। অস্ট্রেলিয়ান বক্স জেলিফিশ যেখানে প্রায় এক ফুট চওড়া হতে পারে এবং বিশ্বের সবচেয়ে বিষধর প্রাণীদের একটি, সেখানে অনেক প্রজাতির আকার মাত্র এক সেন্টিমিটারের মতো। Tripedalia maipoensis সেই ছোট আকারের দিকেই পড়ে—এর গড় দৈর্ঘ্য মাত্র ১দশমিক ৫ সেন্টিমিটার।
তবে আকার ছোট হলেও এদের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো ২৪টি চোখ। এই চোখগুলো চারটি দলে বিভক্ত, প্রতিটি দলে ছয়টি করে চোখ থাকে, যা ‘রোপালিয়াম’ নামে বিশেষ সংবেদনশীল অঙ্গে অবস্থান করে। ছয়টি চোখের মধ্যে দুটি লেন্সযুক্ত, যা দিয়ে ছবি গঠন করা যায়, আর বাকি চারটি আলো-অন্ধকার শনাক্ত করে।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, Tripedalia গণের আরেক সদস্য T. cystophora যা ক্যারিবিয়ান ও মধ্য ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে পাওয়া যায়। উপরে তাকানো চোখ ব্যবহার করে ম্যানগ্রোভ গাছের ছায়ায় লুকিয়ে থাকতে পারে এবং একই সঙ্গে শিকড়ের ভেতর দিয়ে চলাচলও সহজে করতে পারে। এই জটিল চোখের ব্যবস্থা জেলিফিশগুলোকে কার্যত ৩৬০ ডিগ্রি দৃষ্টিশক্তি দেয়।
সংরক্ষিত এলাকাটি যেহেতু এমন একটি উপসাগরের কাছে, যা দক্ষিণ চীন সাগরে গিয়ে মিশেছে, তাই বিজ্ঞানীরা চীনের উপকূলজুড়ে জরিপ চালাতে আগ্রহী- এই নতুন বক্স জেলিফিশের বিস্তৃতি আসলে কতদূর পর্যন্ত, তা জানার জন্য। সূত্র: ইয়াহু
মেহেদী/


