জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে জবানবন্দি দিয়ে গেছেন সদ্যপ্রয়াত লেখক-গবেষক ও রাজনীতিক বদরুদ্দীন উমর। তার সেই জবানবন্দি গ্রহণ করতে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করবে প্রসিকিউশন। গতকাল সোমবার দুপুরে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম এ কথা জানান।
শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ-আল মামুনের বিরুদ্ধে মামলাটি বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। এ পর্যন্ত ৩৯ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। বদরুদ্দীন উমরেরও সাক্ষ্য দেওয়ার কথা ছিল। মৃত্যুর আগে তিনি তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দিও দিয়েছেন।
গত রবিবার রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে মারা যান বদরুদ্দীন উমর। তার বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর। এ বিষয়ে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘বদরুদ্দীন উমর বার্ধক্যের কারণে মৃত্যুবরণ করেছেন। তার জবানবন্দি প্রসিকিউশনের কাছে আছে। তিনি জবানবন্দি দিয়েছেন। এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের আইনে একটা বিধান আছে। কোনো সাক্ষী মারা গেলে বা তাকে হাজির করা সম্ভব না হলে বা অন্য কারণে যদি বিলম্ব করেন, তাহলে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেওয়া সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশন আবেদন করতে পারে। বদরুদ্দীন উমরের সাক্ষ্য জবানবন্দি হিসেবে গ্রহণের জন্য ট্রাইব্যুনালে আবেদন করা হবে। সিদ্ধান্ত কী হবে, তা ট্রাইব্যুনাল জানাবেন।’
বদরুদ্দীন উমর জবানবন্দিতে বলেছেন, ‘শেখ হাসিনা ক্ষমতায় টিকে ছিল নির্বাচনগুলো নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনই তিনি ম্যানিপুলেট করেছেন। এগুলো সম্ভব হয়েছে, কারণ নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে পুলিশ ও আমলাতন্ত্র- সব কিছুর ওপর তিনি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এ কারণেই শেখ হাসিনা ঠিক করেছিলেন, তিনি নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করবেন। সেটি করতে গেলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখা সম্ভব নয়। অথচ, ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে তিনি আন্দোলন করেছিলেন, সংশোধনী এনেছিলেন। কোনো নীতিবোধ বা নৈতিক লজ্জাবোধ তার ছিল না। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে তিনিই সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে দিলেন। কারণ তিনি বুঝেছিলেন নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে, পরবর্তীকালে তারা আর জিততে পারবেন না। তাই নির্বাচনে জিততে হলে তাকে সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতেই হবে। তিনি প্রশাসনকে দুইভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছেন- প্রথমত ঘুষ, টাকা-পয়সা ও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে এবং দ্বিতীয়ত, হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে। ২০০৯ সালের মধ্যেই এই নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করেন। এই নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই তিনি ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনগুলো করেছেন। ২০১৪ সালে ভোটকেন্দ্রে কাউকে ঢুকতেই দেয়নি।
২০১৮ সালে ‘রাতের ভোট’ হয়েছে। দিনে ভোট হলেও, আসলে ভোট হয়ে গেছে আগের রাতেই। ২০২৪ সালেও একই ঘটনা। এভাবে নির্বাচন করেও তিনি জয়লাভ করেছেন। যদিও এগুলোতে জনসমর্থনের কোনো ভিত্তি ছিল না। এসব নির্বাচনে তার দল ৩০০ সিটের মধ্যে চার-পাঁচটি সিটও পেত কি-না, সন্দেহ। এর পরও তিনি জয়ী হয়েছেন শুধুমাত্র প্রশাসনের ওপর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণের কারণে। এটা গোপন কিছু না, সবাই জানে। একটি সরকার যদি চায়, তারা এভাবে নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করবে, তাহলে সেটা ঠেকানো কঠিন। শুধু নির্বাচনের কারচুপিই নয়, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর নিষ্ঠুর দমন চালিয়েছেন শেখ হাসিনা।
কোনো রাজনৈতিক দল যাতে কার্যকরভাবে নড়াচড়া করতে না পারে, সে জন্যও নির্যাতন করা হয়েছে। প্রচুর মানুষকে গ্রেপ্তার করে বছরের পর বছর আটকে রাখা হয়েছে বিনা কারণে। ‘আয়না ঘর’ নামে টর্চার সেল তৈরি করা হয়েছে, যেটা শেখ মুজিবের আমলেও ছিল না। শেখ মুজিব বিরোধীদের সরাসরি হত্যা করতেন। শেখ হাসিনা শুধু হত্যা করতেন না, নির্যাতনও করতেন এবং এতে এক ধরনের বিকৃত আনন্দ পেতেন। সুতরাং এভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি নির্বাচনি ব্যবস্থাকে নিজের করায়ত্ত এবং প্রকৃত পক্ষে জনগণের সঙ্গে তার সম্পর্ক একেবারেই ছিন্ন করেছেন। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান শুধু বাংলাদেশে নয়, গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। ভারত বা পাকিস্তানে এমন জনতার শক্তি ও ব্যাপকতার গণ-অভ্যুত্থান কখনো দেখা যায়নি। বাংলাদেশ নিজেই একটি ‘গণ-অভ্যুত্থানের দেশ।’ ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৯০ সালের ঘটনাগুলো তার উদাহরণ। তবে এসব অভ্যুত্থানের মধ্যে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান ছিল সবচেয়ে বিস্ফোরক, সবচেয়ে রূপান্তরমূলক। ভাষা আন্দোলনের (১৯৫২) মধ্য দিয়ে ভাষার স্বীকৃতি এসেছিল, ১৯৬৯-এ আইয়ুব খানের পতন হয়েছিল, ১৯৯০-এ এরশাদের পতনের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু এসব আন্দোলনে এমন সর্বগ্রাসী ভাঙন, এমন পলায়নপর সরকার বা দল দেখা যায়নি। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। শুধু তিনিই নন- তার মন্ত্রিসভা, দলের কেন্দ্রীয় নেতারা, এমনকি তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরাও দেশ ছেড়ে পালায়। এই রকম ব্যাপক দলীয় পতন, আতঙ্ক ও আত্মগোপন বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কখনো ঘটেনি। সিরিয়া বা অন্য কোনো দেশে, স্বৈরাচার পতনের পরও এত সংগঠিত দলীয় পলায়ন দেখা যায়নি। এই গণ-অভ্যুত্থানের গভীরতা বোঝাতে একটি প্রতীকী চিত্র যথাযথ- শেখ হাসিনার পালানোর পরদিন থেকেই সারা দেশে শেখ মুজিবের মূর্তি ও ম্যুরাল সাধারণ মানুষ নিজেরা ভেঙে ফেলেন। কেউ কোনো নির্দেশ দেয়নি, তবুও এটি ঘটেছে। এটি এক ধরনের ‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’, যার বহিঃপ্রকাশ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়ায় হয়েছে। বহু বছর ধরে নির্যাতিত, অবদমিত জনগণের ক্রোধ এই গণ-অভ্যুত্থানে বিস্ফোরিত হয়েছে। শেখ মুজিব নিজেই একসময় পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘সিরাজ শিকদার কোথায়?’ যেটা ছিল একটি অমানবিক ব্যঙ্গ। কিন্তু ইতিহাসের প্রতিশোধ হয়েছিল ওই বছরেরই আগস্টে, যখন মানুষ বলেছিল, ‘শেখ মুজিব কোথায়?’ এভাবে ইতিহাসে অনেক সময় ঘটনাগুলো পুনরাবৃত্তি হয় প্রতিশোধের রূপে। এই গণ-অভ্যুত্থানের ফলে আওয়ামী লীগ শুধু ক্ষমতা থেকে বিতাড়িতই হয়নি, তারা জনগণের বিশ্বাস থেকেও বিতাড়িত হয়েছে। মুসলিম লীগের পতনের মতোই এবারের গণ-অভ্যুত্থান আওয়ামী লীগের জন্য একটি চূড়ান্ত ভয়াবহ রাজনৈতিক পরিণতি তৈরি করেছে। ভারতের সহায়তায় তারা হয়তো কিছু অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালাতে পারে, কিন্তু জাতীয় রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের পুনঃউত্থান অসম্ভব বলেই মনে হয়। এই গণ-অভ্যুত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ছাত্রদের ভূমিকা। তারাই এই আন্দোলনের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল।
ইতিহাসে ছাত্ররা বারবার নেতৃত্ব দিয়েছে। কিন্তু এবারের আন্দোলনে তারা যে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, সাহস ও আত্মত্যাগের পরিচয় দিয়েছে, তা বিরল।