সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের হস্তক্ষেপে ট্রান্সকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিমিন রহমান ভাই হত্যাসহ বিভিন্ন মামলা থেকে রেহাই পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্ট্যাম্প জালিয়াতির মাধ্যমে কোম্পানির শেয়ার আত্মসাতের অভিযোগে তার ছোট বোন শাযরেহ্ হকের করা মামলায় অভিযোগপত্র দাখিলের পরও সিমিন রহমানসহ সব আসামির অব্যাহতি পাওয়ায় ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, আসিফ নজরুলের ইশারায় মামলার গতিপথ বদলে যায় এবং অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে তিনি মামলায় হস্তক্ষেপ করেন।
এসব কর্মকাণ্ডে ট্রান্সকম গ্রুপের দুই পত্রিকার সম্পাদক মতিউর রহমান ও মাহফুজ আনাম মধ্যস্থতা করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
মামলার বাদী শাযরেহ্ হক অভিযোগ করেন, প্রভাবশালী তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপে বাদীপক্ষকে শুনানির সুযোগ না দিয়েই মামলাটি খারিজ করা হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে হাইকোর্টে গড়িয়েছে।
ট্রান্সকম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা লতিফুর রহমানের মৃত্যুর পর বড় মেয়ে সিমিন রহমানের বিরুদ্ধে ‘হত্যা, অর্থ আত্মসাৎ, সম্পত্তি দখল ও অবৈধভাবে শেয়ার হস্তান্তর’-এর অভিযোগ এনে ট্রান্সকম গ্রুপের পরিচালক শাযরেহ্ হক ২০২৪ সালে মামলা করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এই পারিবারিক দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে।
অভিযোগ রয়েছে, মামলার তদন্ত ও বিচারকাজ প্রভাবিত করতে সিমিন রহমান বিভিন্ন মহলে প্রভাব বিস্তার করেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের ঘনিষ্ঠ অ্যাডভোকেট তৌফিকা করিমকে ব্যবহার করে আদালত থেকে নিজেদের অনুকূলে আদেশ নেওয়া হয়। তৌফিকা করিম নেপথ্যে থেকে তার ঘনিষ্ঠ আইনজীবী শাহীন ও বাহারুলের মাধ্যমে আদালতের বিভিন্ন পর্যায়ে সিমিন রহমানের পক্ষে আদেশ করিয়ে নেন। পরে গণঅভ্যুত্থানের পর সিমিন রহমান অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তিনি মামলায় হস্তক্ষেপ করেন বলেও দাবি করা হয়।
মামলার নথিপত্রে উল্লেখ করা হয়, ট্রান্সকম গ্রুপের অধিকাংশ শেয়ার নিজের নামে নিতে ভাই ও বোনের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে ব্যবহার করেন সিমিন রহমান। পাশাপাশি একটি ভুয়া পারিবারিক ‘ডিড অব সেটেলমেন্ট’ তৈরি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া রাজধানীর গুলশানে লতিফুর রহমানের নামে থাকা ২ বিঘা ২ কাঠা জমির মধ্যে ৩৫ কাঠা জমি ভুয়া হেবা দলিলের মাধ্যমে নিজের নামে নেওয়ার চেষ্টা করেন সিমিন রহমান। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কাছে জমা দেওয়া ওই হেবা দলিলেও বাবা ও ছোট বোন শাযরেহ্ হকের স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। পরে বিষয়টি ধরা পড়লে দলিলের কার্যক্রম আটকে যায়।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১ জুলাই লতিফুর রহমানের মৃত্যুর পর থেকেই জালিয়াতি, প্রতারণা ও আত্মসাতের ঘটনা শুরু হয়। ২০২৩ সালের শুরুতে লতিফুর রহমানের ছেলে আরশাদ ওয়ালিউর রহমান ও মেয়ে শাযরেহ্ হক বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে জানতে পারেন। এরপর একে একে বিভিন্ন জালিয়াতির তথ্য সামনে আসতে থাকে।
এরপর মামলা করেন লতিফুর রহমানের ছোট মেয়ে শাযরেহ্ হক। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)। এই মামলায় পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা শাজেদুর রহমান ছয়জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়, ২০২০ সালে ঢাকায় শেয়ার ট্রান্সফার সংক্রান্ত বোর্ড মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। সেই মিটিংয়ে শাযরেহ্ হক ও তার ভাই আরশাদ ওয়ালিউর রহমান উপস্থিত না থাকলেও তাদের স্বাক্ষর দেখানো হয়। একইভাবে লতিফুর রহমানের ভুয়া অনুমোদনের স্বাক্ষর দেখানো হয়েছে ওই মিটিংয়ে। এই অভিযোগপত্র থেকে সিমিন রহমানসহ সব আসামিকে অব্যাহতি দেয় আদালত।
এ বিষয়ে শাযরেহ্ হক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘কোর্ট আমাদের আবেদন না শুনেই মামলাটি খারিজ করে দিয়েছেন। তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপে মামলাটি খারিজ করা হয়েছে। আমি এটাতে বিস্মিত হয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘তারা হস্তক্ষেপ করে যেভাবে তাদের পক্ষে আদেশ নিয়ে যাচ্ছে, এটা হওয়া উচিত নয়। তিনি আরও বলেন, সব তথ্য প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছিলেন। আমাদের বক্তব্য না শুনেই অভিযোগ থেকে সব আসামিকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আমরা এ বিষয়ে উচ্চ আদালতে আবেদন করেছি।’
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের ফোনে পাওয়া যায়নি।
হাসিনাকে ‘১০০ কোটি টাকা ঘুষ’ অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান
ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমানের বিরুদ্ধে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘১০০ কোটি টাকা ঘুষ’ দেওয়ার অভিযোগের অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এজন্য গত বছর নভেম্বরে সংস্থার একজন উপপরিচালককে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এরপরই মূল অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
ট্রান্সকম গ্রুপের সিইওর বিরুদ্ধে ‘হত্যা, শেয়ার জালিয়াতি ও প্রতারণার’ একাধিক মামলা ‘ধামাচাপা দিতে’ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘১০০ কোটি টাকা ঘুষ’ দেওয়ার অভিযোগের কথা বলেছে দুদক। সংস্থার একজন ঊধ্বর্তন কর্মকর্তা বলেন, অভিযোগটি অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন