অগ্নিঝরা মার্চের ২২তম দিন আজ। ১৯৭১ সালের এই দিনটি ছিল সোমবার। বেলা সাড়ে ১১টায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রেসিডেন্ট হাউসে ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে আলোচনা করেন। ২৫ মার্চ আবারও অধিবেশন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এদিন (২২ মার্চ) সন্ধ্যায় সংবাদমাধ্যমে সেই অধিবেশন বাতিলের কথা উল্লেখ করে বিবৃতি পাঠানো হয়।
বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান তার ‘বাংলাদেশের তারিখ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘ঢাকার প্রেসিডেন্ট হাউস থেকে প্রচারিত এক ঘোষণায় ২৫ মার্চ আহূত পার্লামেন্ট অধিবেশন পুনরায় অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত। প্রতিটি সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠায় বাংলাদেশের পতাকা মুদ্রণ।’ সেদিন ভুট্টো এবং ইয়াহিয়ার আচরণে জনমনে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ কোনো কারণে কালক্ষেপণ করতে চায়।
এদিন (২২ মার্চ) ৭৫ মিনিটব্যাপী আলোচনা শেষে শেখ মুজিবুর রহমান প্রেসিডেন্ট হাউসের বাইরে আসেন এবং অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আমার নির্ধারিত বৈঠক ছিল। সে অনুযায়ী আমি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করতে যাই। সেখানে মি. ভুট্টো উপস্থিত ছিলেন। আমি প্রেসিডেন্টকে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছি যে চারটি শর্ত পূরণ না হলে আমরা জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদান করতে পারি না।’
সেদিন দুপুরে বাসভবনে ফিরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আরেক দফা কথা বলতে হয় বঙ্গবন্ধুকে। তিনি এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, ‘বাংলাদেশে গুরুতর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। জনগণের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।’ এদিন বিদেশি টেলিভিশনের সাংবাদিকদের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের নির্বাচিত বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে শাসন করার নৈতিক বৈধতা কেবল আমারই রয়েছে, অন্য কারও নয়।’
মহিউদ্দিন আহমদ তার ‘আওয়ামী লীগ: যুদ্ধদিনের কথা ১৯৭১’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘ইয়াহিয়া ২২ মার্চ শেখ মুজিব ও ভুট্টোর সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের এক ফাঁকে মুজিব ভুট্টোকে নিয়ে পাশের কামরায় যান ও তার সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে মুজিব ভুট্টোর হাত ধরে অনুরোধ করেন, তিনি যেন সামরিক বাহিনীকে বিশ্বাস না করেন। তিনি বলেন, ‘তারা আমাকে শেষ করবে, তারপর আপনাকে।’ ঘরে গোপন টেপ রেকর্ডার থাকতে পারে এই আশঙ্কায় ভুট্টো মুজিবকে টেনে পাশের বারান্দায় নিয়ে যান। যাহোক, ভুট্টো মুজিবের কথায় সায় দেননি। ২২ মার্চ ঢাকা রেডিও থেকে ঘোষণা করা হয়, ইয়াহিয়া ও মুজিবের মধ্যে একটি আপসরফা হয়েছে।’
অধ্যাপক রেহমান সোবহান তার ‘উতল রোমন্থন: পূর্ণতার সেই বছরগুলো’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘২৫ মার্চ এগিয়ে আসতে থাকলে শেষের দিনগুলোতে একটা চূড়ান্ত সেশন হয়েছিল মতিঝিলে কামাল হোসেনের আইন চেম্বারের সভাঘরে। এই অধিবেশনে পরের দিনের আলাপ-আলোচনায় চূড়ান্ত অবস্থান স্থির করতে আওয়ামী লীগ হাইকমান্ড এবং তাদের উপদেষ্টাদের নিয়ে সারা রাত কাজ করেন বঙ্গবন্ধু। প্রয়োজনে হাজিরা দিতে কামালের বাড়িতে অবস্থান নেন অর্থনীতিবিদরা। মনে আছে আনিস অফিসের মেঝেয় লম্বা হয়ে ঘুমিয়ে নিয়েছিল। ২২-২৩ মার্চ নাগাদ এই আলোচনায় আমাদের শেষ অবদান ছিল আগের রাতে আমাদের তৈরি প্রস্তাবগুলোর ওপর এম এম আহমেদের হাতে লেখা সংশোধনীগুলো নিয়ে কথা বলা। মনে আছে আমরা এই সংশোধনীগুলোর সঙ্গে সহমত ছিলাম এবং শেষ পর্যন্ত হয়তো একটা সমাধান পাওয়া গেছে এই চিন্তা নিয়ে বাড়ি চলে যাই।’
অধ্যাপক রেহমান সোবহান তার ‘উতল রোমন্থন: পূর্ণতার সেই বছরগুলো’ গ্রন্থে স্মৃতিচারণা করে আরও লিখেছেন, ‘ইয়াহিয়ার দল যে চূড়ান্ত অবস্থান নিয়েছিল তা থেকে মনে হচ্ছিল যে অন্তত অর্থনৈতিক ইস্যুগুলোতে একটা সমঝোতায় পৌঁছানো যাবে। আশা ছিল ২৪ মার্চ জেনারেল পীরজাদা আলোচনার চূড়ান্ত অধিবেশন ডাকবে, যা থেকে একটা সমঝোতার ঘোষণা সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া যাবে। পরের দু’দিন কেটে গেল পীরজাদার ফোনের অপেক্ষায়। ২৫ মার্চ আমরা জানতে পারলাম এম এম আহমেদ আর কর্নেলিয়াস আগের রাতে পশ্চিম পাকিস্তান চলে গেছে।’
এদিকে দুপুরে প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে কড়া সামরিক পাহারায় হোটেলে ফিরে জুলফিকার আলী ভুট্টো তার উপদেষ্টাদের নিয়ে বৈঠকে বসেন। ভুট্টো ফেরার সময় হোটেলের বাইরে ভুট্টোবিরোধী স্লোগান দেন বিক্ষুব্ধরা। রাতে ভুট্টো হোটেল লাউঞ্জে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট এবং আওয়ামী লীগপ্রধান বর্তমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে একটি সাধারণ ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। তবে ওই ঐকমত্য অবশ্যই পিপলস পার্টির কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। পিপলস পার্টির অনুমোদন ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত পশ্চিম পাকিস্তানিরা মেনে নিতে পারে না।’
এদিন জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে মিছিলের ঢল ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে যায়। বাসভবনে জনতার উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু এদিনও বেশ কয়েকবার বক্তৃতা দেন। জনতার গগনবিদারী ‘জয় বাংলা’ ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান ও করতালির মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন, ‘সাত কোটি বাঙালি যখন ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, তখন আমি অবশ্যই দাবি আদায় করে ছাড়ব।’ তিনি বলেন, ‘২৩ বছর মার খেয়েছি, আর মার খেতে রাজি নই। শহিদদের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া হবে না। প্রয়োজন হলে আরও রক্ত দেব। কিন্তু এবার সুদে-আসলে বাংলার দাবি আদায় করে আনব।’
এদিন বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক বাঙালি সৈনিকেরা সমাবেশ ও কুচকাওয়াজ করেন।
তারা বলেন, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যে অভূতপূর্ব ঐক্য গড়ে উঠেছে, তাতে তারা আর প্রাক্তন হিসেবে বসে থাকতে পারেন না।