‘আমার ছেলেকে দুইটা গুলি করা হয়েছে। একটা গলায় ডানপাশে, সব রগ ছিঁড়ে গিয়েছে। আরেকটা পিঠের পিছনে, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে ডাক্তার পিঠের পিছনটা দেখতেই পারেনি। আমি জানি, আমার ছেলে আমার জন্য কী ছিল! সে হয়ত দেশের জন্য করে গেছে কিন্তু ছেলেটা আমি ও আমার ছোট ছেলের জীবনটাকে পুরোপুরি তছনছ করে দিয়েছে। তিন মাসে আমরা একটুও গুছিয়ে উঠতে পারেনি। ছোট ছেলেকে নিয়ে মাসের ১৫ দিন হাসপাতালে থাকতে হয়। ইতোমধ্যে তাকে ৫টি কেমোথেরাপি দেওয়া হয়েছে, ছেলেটার বয়স মাত্র ১৩ বছর। এতো বড় একটা যুদ্ধ, এই লড়াইটি আমি আমার বড় ছেলেকে ছাড়া কীভাবে লড়বো। আমি এমন এক মা যে, জীবন যুদ্ধে দুই ছেলের কাছে হাইরা গেছি।’
বুধবার (১৩ নভেম্বর) জুলাই গণহত্যার ১০০তম দিনে শহিদদের স্মরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) সংলগ্ন পায়রা চত্বরে ইনকিলাব মঞ্চের আয়োজনে ‘কান্দে আমার মায়’ শীর্ষক এক স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে এভাবে জুলাই অভ্যুত্থানের ৫ আগস্ট ছেলে হারানোর কথা বলছিলেন আবদুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমা তুজ জোহরা।
রাজধানীর শহিদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল আবদুল্লাহ বিন জাহিদ। এ বছর ১৭ বছরে পা দিতেন আবদুল্লাহ। এবারের জন্মদিন একাই পার করতে হয়েছে মা ফাতেমা তুজ জোহরাকে। আরেক ছেলে ১৪ বছর বয়সী মাহমুদুল্লাহ বিন জিসান কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত। ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর আবদুল্লাহ আনন্দ মিছিল করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয় আবদুল্লাহ। বড় ছেলেকে গোসল-খাওয়া সব করিয়ে দিতেন ফাতেমা। বাসায় ডিশ না থাকায় মাকে নিয়ে খবর দেখতে নানুর বাড়ি যায় আবদুল্লাহ।
সেদিনের বর্ণনা দিয়ে আবদুল্লাহর মা ফাতেমা তুজ জোহরা বলেন, ‘এ বছর পহেলা নভেম্বর সে জন্মদিন পালন করতে পারেনি। ওকে ছাড়াই আমার এ দিনটি পার করতে হয়েছে। আমার জীবনে ৮০ ভাগই জুড়েই ছিল আমার বড় ছেলে। ছোট ভাইয়েরও ৮০ ভাগ জুড়েই ছিল আমার বড় ছেলেটি। অনেক শখের জিনিস হয়ত আল্লাহ রাখে না। ওইদিন পৌনে পাঁচটার দিকে সে বের হয়ে যায়। ৭টা ১২ মিনিটে, ৭টা ৩৬ মিনিটে তাকে ফোন দেই ও ফোন ধরেনি। পরে আরেকবার দিলে ফোন ধরে; সালাম দিয়ে আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, বাবা সন্ধ্যা হয়নি? ও উত্তর দেয়, আম্মু আমি এয়ারপোর্টের মাথায় আছি, আধা ঘণ্টার মধ্যে আসতেছি। এই আধা ঘণ্টা, আজও আমার জীবন থেকে শেষ হয়নি, কারণ আব্দুল্লাহ আর ফিরে আসেনি। ৮টা ১০ মিনিটে খবর আসে আমার সন্তানকে গুলি করা হয়েছে। এই ৩৪ মিনিটে আমার জীবন-সংসার সব উজাড় হয়ে গিয়েছে। যাইতে-যাইতে আমাকে বলা হয়, তাড়াতাড়ি উত্তরার মা ও শিশু হাসপাতালে আসুন নাহলে তাকে ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হবে। পরে গিয়ে দেখি, আমার আবদুল্লাহ আর নাই!’
তিনি আরও বলেন, ‘ছোট ভাই ঘনঘন অসুস্থ ছিল, এ নিয়ে আবদুল্লাহ বেশ টেনশনে ছিল। অথচ তার মারা যাওয়ার ১৪ দিন পর ধরা পড়ে ওর কোলন ক্যান্সার হয়েছে। এখন সে তৃতীয় পর্যায়ে রয়েছে। আমার অনুরোধ থাকবে, সবাই আমার ছেলেদের জন্য দোয়া করবেন।’
এদিকে ৫ আগস্ট রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় পুলিশের গুলিতে মৃত্যুবরণ করে করে দশম শ্রেণির ছাত্র শাহরিয়ার খান আনাস। সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে গোসল করে পড়ার টেবিলের ওপর মাকে উদ্দেশ করে একটি চিঠি লিখে বেরিয়ে যায়। ওই স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে অংশ নেয় আনাসের বাবা শাহরিয়ার খান পলাশ ও মা সানজিদা খান দিপ্তী।
ছেলে মৃত্যুর স্মৃতিচারণ করতে কান্নায় ভেঙে পড়েন সানজিদা খান দিপ্তী। তিনি বলেন, ‘১৬ বছরে আমার সন্তান। কিছুই জানে না, তারপরেও আন্দোলনে গিয়েছে। সব হারিয়ে ফেলেছি আমি, আনাস আপনাদের কাছে শুধু একটি শহিদের নাম কিন্তু আমার কাছে আমার সন্তানটা ছিল সারা পৃথিবী। আমার সন্তানের জন্য দোয়া করবেন। আর যেন কোন যুদ্ধে যেন আর কোন মায়ের কোল খালি না হয়। যে দেশের স্বপ্নে বিভোর হয়ে আমাদের সন্তানরা যে আন্দোলনে নেমেছিল তাদের রক্ত বৃথা যেতে দেবেন না, সেই স্বপ্নের দেশটা যেন এ জাতি পায়।’
এছাড়া এতে অন্যান্যদের মধ্যে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শহিদ জাহিদুজ্জামান তানভীন, শহিদ ফাহমিন জাফরের মা, শহিদ আব্দুল আহাদের বাবাসহ অনেক আহত-নিহত পরিবারের সদস্যরা আপনজন হারানোর স্মৃতি তুলে ধরেন। মুহূর্তেই শহিদের পরিবারে কান্নায় ভারী হয়ে টিএসসি প্রাঙ্গণ। ‘কান্দে আমার মায়’ শীর্ষক ওই অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণ ছাড়াও শোকগীতি, পথনাট্য, দোয়ার আয়োজন করা হয় জুলাই অভ্যুত্থানে আহত-নিতদের স্মরণে।
আরিফ জাওয়াদ/এমএ/