গোপালগঞ্জে এনসিপির পথযাত্রায় হামলা-সংঘর্ষে নিহত পাঁচজনের মধ্যে তিনজনের মরদেহ আদালতের নির্দেশে পাঁচ দিন পর কবর থেকে উত্তোলন করে পুনরায় দাফন করা হয়েছে।
সোমবার (২১ জুলাই) মরদেহগুলো উত্তোলনের পর গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ময়নাতদন্ত করা হয়। রাত ৮টায় দুজনকে গোপালগঞ্জ গেটপাড়া পৌর কবরস্থানে এবং অপর একজনকে টুঙ্গিপাড়ায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
গোপালগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশের করা মামলাগুলোতে সাধারণ মানুষকে হয়রানি না করার আহ্বান জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছে জেলা বিএনপি। অন্যদিকে কারফিউ ও ১৪৪ ধারা তুলে নেওয়ার পর জনমনে কিছুটা হলেও স্বস্তির বাতাস বইছে। জেলা শহর ও অন্য বাজারগুলোতে জনসমাগম বেড়েছে। তবে গ্রেপ্তার আতঙ্কে অনেকে তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছেন।
ওসি মীর মো. সাজেদুর রহমান বলেন, ‘গত শনিবার গোপালগঞ্জ সদর থানায় চারটি হত্যা মামলা করা হয়। মামলার বাদীরা আদালতে নিহতের সুরতহাল প্রতিবেদন ও ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ উত্তোলনের আবেদন করেন। পরে আদালত ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে নিহত রমজান কাজী, ইমন তালুকদার ও সোহেল রানার লাশ কবর থেকে উত্তোলন করে সুরতহাল প্রতিবেদন এবং ময়নাতদন্তের জন্য নির্দেশ দেন।’
তিনি বলেন, ‘এ পরিপ্রেক্ষিতে আজ (সোমবার) দুপুর ১টার দিকে ম্যাজিস্ট্রেট রাসেল মুন্সি ও রন্টি পোদ্দারের উপস্থিতিতে গোপালগঞ্জ পৌর কবরস্থান থেকে রমজান কাজী ও ইমন তালুকদার এবং ম্যাজিস্ট্রেট মারুফ দস্তগীরের উপস্থিতিতে টুঙ্গিপাড়ায় পারিবারিক কবরস্থান থেকে সোহেল রানার মরদেহ উত্তোলন করা হয়। পরে মরদেহগুলো গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। লাশ উত্তোলনের সময় নিহতের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।’
নিহত অপর দুজনের মধ্যে দীপ্ত সাহার লাশ হিন্দু ধর্মীয় মতে পৌর শ্মশানে সৎকার করা হয়। আর রমজান মুন্সীর মরদেহের ময়নাতদন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সম্পন্ন করা হয়।
ওসি সাজেদুর বলেন, ‘গত শনিবার রাতে গোপালগঞ্জ সদর থানার চার উপপরিদর্শক (এসআই) বাদী হয়ে চারটি হত্যা মামলা করেন। চার মামলায় মোট আসামি ৫ হাজার ৪০০ জন।’
নিহত ইমন তালুকদারের মামাতো ভাই বাবু ভূইয়া ও রামজান কাজীর মামা রানা কাজী বলেন, ‘মামলার বিষয়ে তাদের কিছু না জানালেও পুলিশের মাধ্যমে খবর দেওয়া হয় মরদেহ উত্তোলন করা হবে। এর বেশি কিছু জানানো হয়নি। পরে আজ (সোমবার) দুপুরে
মরদেহ উত্তোলন করা হয়।’
সংঘর্ষের ঘটনায় করা মামলায় নিরীহ মানুষকে হয়রানি না করার আহ্বান জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছে জেলা বিএনপি।
সোমবার দুপুরে শহরের বড়বাজার পৌর মার্কেটে জেলা বিএনপি কার্যালয়ে এ সংবাদ সম্মেলন হয়।
এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শরীফ রফিকুজ্জামান।
তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষ জনমনে ভীতির সঞ্চার করে। এ ঘটনায় কয়েকটি মামলা হয়েছে। মামলায় যেন কোনো নিরীহ মানুষকে হয়রানি করা না হয়।’
সংবাদ সম্মেলনে জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট কাজী আবুল খায়ের, সদস্য ডা. কে এম বাবর, অ্যাডভোকেট তৌফিকুল ইসলাম তৌফিক, সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি সিকদার শহীদুল বাসলাম লেলিন, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক সাজ্জাদ হোসেন হীরাসহ বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া তারেক রহমানকে কটূক্তি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে জেলা জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল। বিক্ষোভ মিছিলটি শহরের পুলিশ লাইনস থেকে শুরু হয়ে কুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে শেষ হয়।
হামলা-সংঘর্ষের ঘটনায় গত কয়েকদিন গোপালগঞ্জের পরিস্থিতি থমথমে হয়ে ওঠে। সেই পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করেছে। জীবনযাত্রাও স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। বাজারে জনসমাগম বাড়তে শুরু করেছে। কারফিউ ও ১৪৪ ধারা তুলে নেওয়ার পর জনমনে কিছুটা হলেও স্বস্তির বাতাস বইছে। তবে গ্রেপ্তার আতঙ্কে অনেকে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র পালিয়েছেন।
গতকাল জেলা শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শহরের বিভিন্ন ওষুধের দোকান, খাবারের দোকানসহ অন্য দোকানগুলো খুলতে শুরু করেছে। অনেকেই গ্রেপ্তার আতঙ্কে তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক ছিল। শহরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। খুলেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অফিস আদালত। তবে উপস্থিতি কম। অনেকেই তাদের সন্তানকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন।
গত বুধবার ওই হামলা-সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত ও পুলিশ, সাংবাদিকসহ শতাধিক মানুষ আহত হন। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারটি হত্যা মামলাসহ মোট আটটি মামলা হয়েছে। মামলাগুলোতে ৮ হাজার ৪০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। আর গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৩২২ জনকে। তাদের মধ্যে দুই শতাধিক আসামিকে বাইরের জেলার কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।