গণভোটের পদ্ধতি ও কখন গণভোট হতে পারে, সেই প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য ছাড়াই বুধবার শেষ হয়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপ। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা দিতে একমত হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো।
বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) আলোচনায় জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিস জাতীয় নির্বাচনের আগেই গণভোট অনুষ্ঠানের পক্ষে দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে বিএনপিসহ বাকি দলগুলো জাতীয় নির্বাচনের পরে গণভোট অনুষ্ঠানের পক্ষে মত দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে ঐকমত্য কমিশন উভয় পক্ষের বক্তব্য তুলে ধরে সিদ্ধান্তের জন্য সরকারের কাছে পাঠাবে। তবে এর আগে সনদে সব দলের স্বাক্ষর নেওয়া হবে।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট চায় না বিএনপি। তাদের মতে, গণভোট অবশ্যই জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একই ভোটকেন্দ্র, কর্মকর্তা ও ব্যালট বাক্স ব্যবহার করে হতে হবে। তবে ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন এবং নভেম্বরে গণভোটের দাবিতে অনড় অবস্থানে এখনো জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি। তাদের মতে, গণভোট এবং জাতীয় নির্বাচন ভিন্ন বিষয়। কাজেই গণভোট আগে হতে হবে এবং তার ভিত্তিতেই আগামী জাতীয় নির্বাচন হতে হবে। বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের এমন বিপরীতমুখী অবস্থান জাতীয় ঐক্যের প্রধান অন্তরায় বলে অভিযোগ করেছেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু।
বৈঠকে ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ জাতীয় সনদের মধ্যে থাকা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ইস্যুগুলো বিবেচনার আহ্বান জানান। বলেন, আগামী ১৫-১৬ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় সনদে স্বাক্ষরের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে শুক্রবারের (আগামীকাল) মধ্যেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের রোডম্যাপ চূড়ান্ত করতে চায় তার কমিশন।
বিকেলে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে বৈঠকের পর তারা এসব কথা বলেন। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ইস্যুতে এটি ছিল কমিশনের পঞ্চম বৈঠক। ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজের সভাপতিত্বে বৈঠকে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বিএনপি নেতাদের মতে, গণভোট অবশ্যই জাতীয় নির্বাচনের দিনে হতে হবে। তাও একই ভোটকেন্দ্র, কর্মকর্তা ও ব্যালট বাক্স ব্যবহার করে অনুষ্ঠিত হতে হবে। অন্যথায় এটি নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে এবং দলের ওপর রাজনৈতিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন তারা। একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী গণভোটের ফলাফল বিএনপির বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারে এবং নেতিবাচক প্রচারণা চালাতে পারে; এমন শঙ্কার কথা জানান বিএনপি নেতারা।
ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক শেষে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেন, ‘কয়েকটি বিষয়ে মতভিন্নতা রয়েছে। গণভোট এবং জাতীয় নির্বাচন ভিন্ন বিষয়। গণভোট আগে হওয়া দরকার। জাতীয় নির্বাচন এর ভিত্তিতেই হতে হবে। জুলাই সনদে উচ্চকক্ষ রয়েছে, তাই একই দিন গণভোট ও জাতীয় নির্বাচনের ভোট হলে জনগণ উচ্চকক্ষ চায় কি না, বোঝার উপায় থাকবে না। কোনো কারণে জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে গণভোটও সুষ্ঠু হবে না। আর নির্বাচন স্থগিত হলে গণভোটও স্থগিত হবে। এ কারণে আমরা মনে করি, নভেম্বরের মধ্যেই গণভোট হওয়া উচিত। এটি সহজ নির্বাচন।’ গণভোটের পর নভেম্বরের শেষে বা ডিসেম্বরের শুরুতে তফসিল হলে ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন হওয়া নিয়ে বাধা থাকবে না বলেও মনে করেন এই জামায়াত নেতা। এ সময় সংস্কার ইস্যুটি বিএনপিকে স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়ে ডা. মো. তাহের বলেন, ‘তাদের বিষয়টি স্পষ্ট করতে হবে।’
বিএনপি ও জামায়াতের এমন বিপরীতমুখী অবস্থান ঐক্যের অন্তরায়, এমন অভিযোগ করেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। তিনি বলেন, ‘দেশের মানুষ চায় শান্তি ও ঐকমত্য। কিন্তু সীমান্তের ওপারের চাওয়া হলো বিভেদ, সংঘাত ও বিভক্তি। গণভোট আয়োজনের ব্যপারে ঐকমত্য হলেও গণভোট কি জাতীয় নির্বাচনের আগে হবে নাকি একই দিনে দুটি নির্বাচন হবে, তা নিয়ে স্পষ্ট দ্বিধাবিভক্তি দেখা যাচ্ছে। ঐকমত্য কমিশন বা সরকারের উচিত হবে দুপক্ষের কথা শুনে গণভোট কবে হবে এ ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া। তিনি বিএনপি-জামায়াত ও এনসিপি এই তিন দলের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, সরকার যে তিন দলকে নিজেদের অংশ মনে করে এবং সঙ্গে করে নিউইয়র্ক সফরে নিয়ে গেছে, মনে হচ্ছে তাদের ইগো সমস্যাই এখন জাতীয় ঐক্যের অন্তরায়।’
মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, জুলাই সনদ কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা কি ‘সংবিধান আদেশ, অধ্যাদেশ’ নাকি ‘জুলাই সনদ আদেশ’ নামে জারি হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অর্থাৎ এখানেও পদ্ধতি বা শব্দ নিয়ে বিতর্ক। এ বিতর্ক দেখে মনে হচ্ছে পরোক্ষভাবে আমরা কেউ কেউ সীমান্তের ওপারের চাওয়াকেই প্রাধান্য দিচ্ছি।’ তিনি আবারও জোর দিয়ে বলেন, চূড়ান্ত ঐকমত্য না হলে সরকার বা ঐকমত্য কমিশনের উচিত হবে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে যেকোনো একটি সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া।
এর আগে বৈঠকের সূচনা বক্তব্যে কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের বিষয়ে সবাই একমত হয়েছে। এখন পুরো দেশ অপেক্ষা করছে, আমরা সবাই মিলে এমন একটি ঐকমত্যের জায়গায় পৌঁছাতে পারব, যাতে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পথরেখাটা নির্ধারিত হয়। যেহেতু সনদের কিছু ইস্যুতে নোট অব ডিসেন্ট আছে, সেগুলোও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। আমাদের হাতে সময় কম, এটা আর বাড়াতে চাই না। গণভোটের ক্ষেত্রে কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে, সেসব নিশ্চিত করা দরকার। সবার ঐক্যবদ্ধ মতামতের ভিত্তিতে এই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের পদ্ধতি, প্রক্রিয়া ও দিনক্ষণ চূড়ান্ত করে আগামী ১০ তারিখের মধ্যেই সরকারের কাছে আমরা সুপারিশ জমা দিতে চাই। আমরা আশা করছি, সেটা দিতে পারব। একই সঙ্গে ১৫ থেকে ১৬ অক্টোবরের মধ্যে জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরের জন্য অনুষ্ঠান আয়োজন করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।’
ঐকমত্য কমিশন সূত্রে জানা গেছে, জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকারকে দুটি বিকল্প সুপারিশ দেওয়ার কথা বিবেচনা করছে কমিশন। তার একটি হলো, জুলাই সনদ নিয়ে ‘সংবিধান আদেশ’ জারি করে তার ভিত্তিতে গণভোট করা। অন্যটি হলো আগামী জাতীয় সংসদকে দ্বৈত ভূমিকা পালনের ক্ষমতা দেওয়া। এ ক্ষেত্রে নিয়মিত কাজের পাশাপাশি ‘সংবিধান সংস্কার সভা’ হিসেবে কাজ করবে আগামী জাতীয় সংসদ। ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে আগামী সংসদকে দ্বৈত ভূমিকা পালনের ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়ে একটি খসড়া তৈরি করা হয়েছে। এ খসড়ার বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিচ্ছে কমিশন।
এর আগে রাষ্ট্র সংস্কারের ৮৪টি প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হওয়ার পর সেগুলো সংকলিত করে তার সঙ্গে বাস্তবায়নের অঙ্গীকারনামা যুক্ত করে জুলাই সনদের খসড়া চূড়ান্ত করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। কিন্তু এই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে সৃষ্টি হয় রাজনৈতিক দলগুলোর মতবিরোধ। বিএনপিসহ কয়েকটি দল নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে এই সনদ বাস্তবায়নের কথা বলে আসছিল। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েক দল চাইছিল, নির্বাচনের আগেই এ সনদ বাস্তবায়িত হোক। পরে এ অচলাবস্থা নিরসনে গণভোটের প্রস্তাব তোলে জামায়াতে ইসলামী ও সমমনা দলগুলো। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উপায় নির্ধারণে গত ১১ সেপ্টেম্বর থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পুনরায় আলোচনা শুরু করে কমিশন।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুরুতে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো গণভোটের বিরোধিতা করলেও পরে তারা সে অবস্থান থেকে সরে আসে। তারা বলছে, গণভোট হতে পারে, তবে সেটা হতে হবে সংসদ নির্বাচনের দিনেই; আলাদা ব্যালট পেপারে। ৫ অক্টোবর দলগুলোর সঙ্গে চতুর্থ দফা বৈঠকের পর ড. আলী রীয়াজ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে গণভোট আয়োজনে রাজনৈতিক দলগুলো ‘একমত’ হয়েছে। তবে গণভোটের দিনক্ষণ, পদ্ধতি ও বিষয় নিয়ে নতুন করে বিভক্তি তৈরি হয়। ফলে গণভোটের ক্ষেত্রে এসব খুঁটিনাটি বিষয়ে দলগুলোর মতামত পর্যালোচনা এবং তাদের মতবিরোধ নিরসনের উপায় খুঁজতে পুনরায় বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করে কমিশন।
গণভোটের সময়, পদ্ধতি ও খুঁটিনাটি অন্যান্য বিষয় নির্ধারণে বুধবার আবারও বৈঠকে বসে কমিশন। এতে গণভোট অনুষ্ঠানের সময়সীমা নির্ধারণে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে সুস্পষ্ট মতামত চান কমিশনের সহসভাপতি ড. আলী রীয়াজ। কারণ এসব কাজ শেষ করতে কমিশনের হাতে সময় আছে মাত্র ছয় দিন। ঐকমত্য কমিশনের বর্ধিত মেয়াদ শেষ হবে আগামী ১৫ অক্টোবর।