চলতি অর্থবছরের নভেম্বর পর্যন্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার কোটি টাকা। ডিসেম্বর পর্যন্ত ঘাটতি আরও বেড়ে ৪৬ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। সরকারের আয় না বাড়লেও ব্যয় বাড়ানোর ছক কষেছে সরকার নিজেই।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে বেতন কমিশনের জমা দেওয়া প্রতিবেদনে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলেছেন, সরকার আর্থিক সংকটে আছে। রাজস্ব ঘাটতি বেড়েই চলেছে। বেতন কমিশনের সুপারিশ কার্যকর হলে সরকারের খরচ আরও বাড়বে।
বিশ্লেষকরা আরও বলেছেন, অতীতে দেখা গেছে, বেতন বাড়ানো হলে তার প্রভাব পড়েছে বাজারে। অসাধু ব্যবসায়ীরা বেতন বাড়ার অজুহাতে জিনিসপত্রের দাম কয়েকগুণ বেশি বাড়িয়ে থাকেন। তাই বেতন বাড়ানোর ফলে স্বস্তি মিলে না বললেই চলে। অন্যদিকে এবার বেসরকারি খাতে বেতন বাড়ানো নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত দেখা যায়নি। ফলে সরকারি খাতে বেতন বাড়ানোর প্রভাবে জিনিসপত্রের দাম বাড়লে বেসরকারি খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর দ্রব্যমূল্যের চাপ বাড়বে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই দেশের সমগ্র অর্থনীতি বিভিন্নভাবে চাপের মধ্যে আছে। বিগত সরকার ভঙ্গুর অর্থনীতি রেখে গেছে। অর্থনীতির বেশির ভাগ খাত অতীতের রেশ কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলে সরকারের খরচ বেড়ে যাবে। এই বাড়তি খরচ সরকার কোথা থেকে জোগাড় করবে তা স্পষ্ট না।’
একই মত জানিয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেছেন, ‘অতীতে দেখা গেছে বেতন বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বেতন বেড়েছে এই অজুহাতে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে বিক্রি করেন। অথচ বেতন বাড়ানো হলে জিনিসপত্রের দাম বাড়ানো হবে–এমন কোনো কারণ থাকে না। আমাদের দেশে বাজার নজরদারিতে সরকার ব্যর্থ। দাম বাড়লে বেসরকারি কর্মচারীসহ অন্যদেরও বাড়তি দামেই জিনিসপত্র কিনতে হয়। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ে।’
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সরকারের খরচের চাপ বাড়ছে। কারণ, বেতন-ভাতা, সুদ পরিশোধ, ভর্তুকিতেই বাজেটের সিংহভাগ টাকা খরচ হয়ে যায়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শোভন জীবনধারণের জন্য বেতন-ভাতা বাড়াতে হচ্ছে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব আদায় বাড়ছে না।’
গতকাল নবম জাতীয় বেতন কমিশন নির্ধারিত সময়ের তিন সপ্তাহ আগেই প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন পেশ করেছে। ২৩ সদস্যবিশিষ্ট কমিশন, কমিশনপ্রধান জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন। এ সময় অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী, অর্থ সচিব খায়রুজ্জামান মজুমদারসহ কমিশনের সব পূর্ণকালীন ও খণ্ডকালীন সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
গত ২৭ জুলাই ২০২৫ তারিখে সরকার ২৩ সদস্যবিশিষ্ট নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে এবং ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করে। ২০১৩ সালে অষ্টম বেতন কমিশন গঠনের পর দীর্ঘ ১২ বছর পর এই কমিশন গঠিত হয়। কমিশনের প্রতিবেদন দাখিলের নির্ধারিত শেষ তারিখ ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।
এ সময় কমিশনের প্রধান বলেন, ‘গত এক দশকে বৈশ্বিক ও জাতীয় পর্যায়ে অর্থনীতির প্রায় সব সূচকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সময়োপযোগী ও যথাযথ বেতন কাঠামো নির্ধারণ না হওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সুস্পষ্ট কার্যপরিধি নির্ধারণপূর্বক বিদ্যমান বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে কমিশন কাজ করে।’
কমিশনপ্রধান জাকির আহমেদ খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘বেতন কমিশন থেকে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। এখন কবে সরকার বাস্তবায়ন করবে এটা সরকারের বিষয়। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় প্রতিবেদনের প্রস্তাব খতিয়ে দেখবে। এরপর তা উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। এরপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কমিশনের এক সদস্য খবরের কাগজকে বলেন, ‘১ জানুয়ারি থেকে আংশিক কার্যকর এবং আগামী অর্থবছর থেকে পূর্ণ বাস্তবায়নে সুপারিশ করা হয়েছে।’
নতুন বেতনকাঠামোয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করা হচ্ছে ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ। এর ফলে সর্বনিম্ন অর্থাৎ ২০তম ধাপে বেতন ২০ হাজার টাকা আর সর্বোচ্চ প্রথম ধাপে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার সুপারিশ করা হচ্ছে। ধাপ শেষ পর্যন্ত ২০টি থাকছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। এত দিন ১১তম থেকে ২০তম ধাপের কর্মচারীদের জন্য যাতায়াতের ভাতা ছিল। নতুন বেতন কমিশন এ যাতায়াতের ভাতা ১০ম ধাপ থেকে ২০তম পর্যন্ত দেওয়ার সুপারিশ করেছে। কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি পেনশনভোগীদের পেনশনের হারও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। মাসে ২০ হাজার টাকার কম পান, এমন পেনশনভোগীদের পেনশন বাড়ছে ১০০ শতাংশের মতো। যারা মাসে ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার পেনশন পান, তাদের বাড়ছে ৭৫ শতাংশ। আর যারা মাসে ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশন পান, তাদের বাড়ছে ৫৫ শতাংশ। ৭৫ বছরের বেশি বয়সী পেনশনধারীদের চিকিৎসার ভাতা ১০ হাজার টাকা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। ৫৫ বছরের কম বয়সীদের চিকিৎসার ভাতা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে ৫ হাজার টাকা। প্রথম থেকে দশম ধাপ পর্যন্ত সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়ি ভাড়া তুলনামূলক কম হারে দেওয়ার সুপারিশ করা হচ্ছে। ১১তম থেকে ২০তম ধাপে বাড়ি ভাড়ার হার তুলনামূলক বেশি থাকবে। সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রতিবেদন দাখিলের পর সামরিক ও বিচার বিভাগের জন্য আলাদা বেতন কমিশন চূড়ান্ত করা হবে বলে জানা গেছে।
প্রতিবেদন দাখিলকালে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘এই প্রস্তাব বাস্তবায়নই এখন পরবর্তী কাজ। এ লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করে দেওয়া হবে, যে কমিটি বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করবে।’
কমিশনের প্রতিবেদনে নতুন নতুন প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে–সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা প্রবর্তন, পেনশনব্যবস্থার সংস্কার, সরকারি কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড পুনর্গঠন, সার্ভিস কমিশন গঠন, বেতন গ্রেড ও স্কেলের যৌক্তিক পুনর্বিন্যাস, সরকারি দপ্তরগুলোতে ভাতা পর্যালোচনার জন্য কমিটি গঠন এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে মানবসম্পদ উন্নয়ন।