‘পেট্রোলিয়াম করপোরেশন অব বাংলাদেশ (বিপিসি) আগের তুলনায় জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়িয়েছে। তাই আমরাও চালকদের বেশি করে তেল দিতে পারছি। এভাবে কয়েকদিন চলতে থাকলে তেল পেতে চালকদের লাইন ছোট হয়ে যাবে।’
মঙ্গলবার (২২ এপ্রিল) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাশে ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার মো. শফিকুর রহমান খবরের কাগজকে এভাবেই তেল পেতে ভোগান্তির বদলে স্বস্তির বার্তা জানান।
তবে অন্য দিনের মতো গতকালও এই ফিলিং স্টেশনসহ অন্য পাম্পেও চালকদের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। কোনো কোনো ফিলিং স্টেশনে তারা চার থেকে ছয় ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর তেল পান। তবে আগের তুলনায় বেশি তেল পাওয়ায় তাদের মধ্যে স্বস্তি দেখা যায়।
ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে কথা হয় বাইকচালক মো. শাজাহানের সঙ্গে। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আগে ৫০০ টাকার তেল পেয়েছি। আজকে ১ হাজার টাকার তেল পেলাম। ভালোই লাগছে। বেশ কিছু দিন চলে যাবে।’
অন্য চালকরাও একই তথ্য জানান। এই ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার মো. শফিকুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘ফুয়েল পাস অ্যাপ চালু করা হয়েছে। বাইকে ১ হাজার টাকার ও ব্যক্তিগত গাড়িতে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে। বেশি তেল পাওয়ায় আস্তে আস্তে লাইন ছোট হয়ে যাবে। বিপিসি বেশি করে সরবরাহ করায় এই সুফল পাওয়া শুরু হয়েছে। রাজধানীসহ সারা দেশে তেলের সরবরাহ বেশি করা হলে চাপ কমে যাবে। আশা করি কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’
অন্য ফিলিং স্টেশনেও দেখা গেছে ডিপো থেকে তেলের সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। এ জন্য তারা চালকদের কাছে বেশি করে তেল বিক্রি করছেন। মোহাম্মদপুরের আসাদগেটে সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে দেখা যায় চালকদের আগের তুলনায় বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে।
এ ব্যাপারে ম্যানেজার সজীব সরকার শংকর খবরের কাগজকে বলেন, ‘গতকাল থেকে আগের তুলনায় তেল বেশি পাচ্ছি ডিপো থেকে। এজন্য আমরাও গ্রাহকদের কাছে বেশি করে বিক্রি করতে পারছি। ফুয়েল পাস অ্যাপে ১ হাজার ২০০ টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে। ব্যক্তিগত গাড়িতে আড়াই হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে। বিপিসি এভাবে বেশি করে তেল সরবরাহ করলে কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।’
কল্যাণপুরের সোহরাব ফিলিং স্টেশনেও তেলের বাড়তি সরবরাহের চিত্র দেখা গেছে। এ ব্যাপারে এ স্টেশনের ম্যানেজার মো. নাজমুল হাসান খবরের কাগজকে বলেন, ‘আগে যে তেল পেতাম তার তুলনায় বেশি পাচ্ছি। এখানে ডিজেল বেশি বিক্রি হয়। অকটেনও বিক্রি হয়। সরবরাহ বাড়ায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কেটে যাবে। আতঙ্কের কারণেই অনেকেই তেল মজুত করেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ গত বছরের রমজান মাসের ঈদে ১ লাখ ৯০ হাজার লিটার ডিজেল বিক্রি করি। এবার ২ লাখ ৪০ হাজার লিটার বিক্রি হয়েছে। একইভাবে গত বছরের ঈদে ৩০ হাজার লিটার অকটেন বিক্রি করা হলেও এবারে ৪০ হাজার লিটার বিক্রি হয়। তারপরও তেল নেই নেই অবস্থা। দিনের অধিকাংশ সময় পাম্প বন্ধ রাখতে হয়েছে। আতঙ্কিত হয়েই অনেক চালক বেশি করে তেল কিনে বাসাবাড়িতে মজুত করে রেখেছেন। গতকাল থেকে যেহেতু সরকার তেলের সরবরাহ বাড়িয়েছে আশা করি কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।’
রাজধানীর মহাখালী, কল্যাণপুর, তেজগাঁও, নীলক্ষেত ফিলিং স্টেশনেও দেখা যায় একই দৃশ্য। ডিপো থেকে তেলের সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। তারপরও চালকদের দীর্ঘ লাইন। তবে বেশি তেল পেয়ে তারা স্বস্তির কথা জানান। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শুরু হলে এই সংকট শুরু হয়। চালকরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে তেলের জন্য অপেক্ষা করছেন। বাধ্য হয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় গত ১৯ এপ্রিল থেকে লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা দাম বাড়িয়েছে। তারপরও অনেক চালক তেল পাচ্ছেন না। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন তেলের সরবরাহ বাড়াতে। এতে ভোক্তাদের আতঙ্ক কেটে যাবে। এরপর বিপিসি গতকাল থেকে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি অকটেন এবং ১০ শতাংশ বেশি ডিজেল ও পেট্রলের সরবরাহ বাড়িয়েছে ফিলিং স্টেশনে। এর সুফল পেতে শুরু করেছেন ভোক্তারা।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত কেনার কারণে জ্বালানি তেলের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। সে কারণেই সরবরাহ বাড়িয়ে বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। দেশের মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৬৩ শতাংশই ডিজেল। তাই ডিজেলের সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি অকটেন ও পেট্রলের ক্ষেত্রেও বাড়তি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যাতে ভোক্তারা চাহিদামতো তেল পান।