হামে আক্রান্ত শিশুদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও টিকা অব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িতদের বিচার দাবিতে পৃথক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ সমবেশ ও মিছিল করেছে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্র ইউনিয়ন ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগ-বিসিএল। এদিকে শিক্ষাখাতে জিডিপির ৬ শতাংশ এবং স্বাস্থ্যখাতে ৫ শতাংশ বরাদ্দের দাবিতে অর্থমন্ত্রীকে স্মারকলিপি প্রদান করেছে ছাত্র ফ্রন্ট।
বুধবার (১৩ মে) বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে হামে আক্রান্ত শিশুদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও হাসপাতালে হাম কর্ণার এবং টিকা অবস্থাপনার সাথে জড়িতদের বিচার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি বাতিল ও সীমান্ত হত্যা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেবার দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন।
সমাবেশে ছাত্র ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতির বক্তব্যে মশিউর রহমান খান রিচার্ড বলেন, ‘হামে আক্রান্ত শিশুদের জীবন আজ গুরুতর ঝুঁকিতে। প্রতিদিন শিশুর মৃত্যু ঘটছে। এটি একটি জাতীয় জরুরি অবস্থা। এই সংকটের সময়ে শিশুদের জীবন রক্ষার মৌলিক দায়িত্ব উপেক্ষা করে ডাকসুর ছাত্র শিবির মনোনীত প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে জিমনেসিয়াম মাঠ ব্যবহারে অসম্মতি প্রদান অমানবিক রাজনৈতিক অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ। আমরা দাবি করি, অবিলম্বে হাম সেন্টার স্থাপন, স্বাস্থ্যখাতের কাঠামোগত সংস্কার এবং জরুরি চিকিৎসা সক্ষমতা বৃদ্ধিকে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার ঘোষণা করতে হবে। হামের টিকা অব্যবস্থাপনার সাথে জড়িতদের বিচার করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি সীমান্তে এক কলেজ ছাত্রসহ দুইজনের বিএসএফের গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনায় আমরা তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি এবং ভারতীয় দূতাবাসের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি জানাই। বাংলাদেশের মানুষের জীবন রক্ষায় সরকারের কঠোর ও কার্যকর অবস্থান প্রত্যাশিত।’
কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সৈকত আরিফ বলেন, ‘নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি করে অন্তবর্তীকালীন সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে গোপন বাণিজ্যচুক্তি সম্পাদন করেছে। আমরা এই চুক্তির একদম শুরুতেই দাবি করেছিলাম, এই চুক্তিতে সংসদে বিল আকারে উত্থাপন করে তা নিয়ে আলোচনা করতে হবে কিন্তু আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি সরকার সেই পথে হাটছে না।’
এসময় ওই সমাবেশে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আরমানুল হক, ঢাকা মহানগর ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি আল-আমিন রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সজীব হোসেন ও নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সদস্য সাইদুর রহমানসহ আরো অনেকে উপস্থিত ছিলেন। এদিকে সমাবেশ শেষে একটি মিছিল সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্য থেকে শুরু হয়ে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে টিএসসির পায়রাচত্বরে শেষ হয়।
সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট। সমাবেশ থেকে হামে আক্রান্ত শিশুদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত, হামের টিকা কেনার অব্যবস্থাপনায় জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনা এবং ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের বাজেটে শিক্ষাখাতে জিডিপির ৬ শতাংশ এবং স্বাস্থ্যখাতে ৫ শতাংশ বরাদ্দের দাবি জানানো হয়েছে।
সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক প্রগতি বর্মণ তমার সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক মোজাম্মেল হক, অর্থ সম্পাদক নওশিন মুসতারি সাথী এবং সাধারণ সম্পাদক রাফিকুজ্জামান ফরিদ।
সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে সালমান সিদ্দিকী বলেন, ‘ইউনেস্কো এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষা সংস্থাগুলোর সুপারিশ অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশে বাজেটের অন্তত ২৫ শতাংশ বা জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা উচিত । এশিয়ার দেশগুলোর দিকে তাকালেও দেখা যায়, ভিয়েতনাম তার বাজেটের প্রায় ২০ শতাংশ, মালয়েশিয়া ১৯ শতাংশের উপরে এবং এমনকি নেপালও বাংলাদেশের তুলনায় জিডিপির অনুপাতে অনেক বেশি বরাদ্দ দিয়ে থাকে। স্পষ্টতই, বাংলাদেশে শিক্ষা খাত বরাবরই অবহেলিত ও উপেক্ষিত।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান জনগণকে মোট চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশের বেশি নিজেদের পকেট থেকে বহন করতে হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে ঋণ ও দারিদ্র্যের চক্রে ঠেলে দিচ্ছে। বাস্তবতা হলো—সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, শয্যা ও ওষুধের চরম সংকট বিরাজ করছে। প্রতি ১০,০০০ জনে মাত্র ৬–৭ জন ডাক্তার থাকায় সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আশা করি আসন্ন বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৬ শতাংশ এবং চিকিৎসা খাতে ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে এগিয়ে নেওয়া হবে।’
সমাবেশ শেষে বিভিন্ন দাবি সংবলিত প্ল্যাকার্ডসহ একটি মিছিল ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ স্থান প্রদক্ষিণ করে টিএসসিতে গিয়ে শেষ হয়। সমাবেশ ও মিছিল শেষে একটি প্রতিনিধি টিম অর্থমন্ত্রী বরাবর প্রদান করে ছাত্রফ্রন্ট।
এদিকে বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে একত্রে বিক্ষোভ সমাবেশ করে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগ-বিসিএল। সমাবেশে সভাপতির সভাপতির বক্তব্যে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সভাপতি মুক্তা বাড়ৈ বলেন, ‘শিশু হত্যাকারী ইউনূস ও নূরজাহান বেগমের বিচার নিশ্চিতের পাশাপাশি গনবিরোধী বাণিজ্যচুক্তি বাতিল করতে হবে। ছাত্র রাজনীতি বন্ধের নামে গণতান্ত্রিক অধিকার রুদ্ধ করার যেকোন প্রচেষ্টা শক্তভাবে আমরা মোকাবেলা করবো।’
পরে বিক্ষোভ সমাবেশ শেষে একটি মিছিল রোকেয়া হল ঘুরে টিএসসিতে এসে শেষ হয়। এসময় তারা সমাবেশ থেকে ৩ দফা দাবি জানায়। দাবিগুলো হলো- হামে শিশু মৃত্যুর দায়ে ড. ইউনূস ও নূরজাহান বেগমের বিচার নিশ্চিত ও জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করে মৃত্যুমিছিল বন্ধ; দেশবিরোধী মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি বাতিল এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সন্ত্রাস-দখলদারিত্ব বন্ধ।
আরিফ জাওয়াদ/এসএন