বাংলাদেশে নারী-পুরুষের সমতা ও নারী অধিকার নিয়ে আলোচনা আজ নতুন নয়, বরং এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মানবিক অগ্রগতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি প্রশ্ন। সাম্প্রতিক সময়ে ‘নারীর প্রতি বৈষম্য কাম্য নয়’ শিরোনামে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে এ বিষয়ে বেশ কিছু বাস্তব চিত্র পাওয়া যায়। আমরা লক্ষ করি যে, আমাদের সমাজে যেখানে নারীরা পরিশ্রমে সমান, কিন্তু প্রাপ্তিতে অসম। দেশে নারী শ্রমিকরা কর্মক্ষেত্রে পুরুষদের সমান দক্ষতা ও পরিশ্রম দিলেও বেতনে বৈষম্য, পদোন্নতিতে উপেক্ষা, কর্মস্থলে হয়রানি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় অনুপস্থিতি এখনো প্রকট। এ অসমতা কেবল কর্মক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাজনীতি, পারিবারিক জীবন এমনকি সংস্কৃতি পর্যন্ত তার প্রভাব বিস্তৃত। এটি আসলে পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার এক দীর্ঘ ঐতিহ্য, যা নারীর অবদানকে গৌন করে দেখার অভ্যাস তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতিতে নারীর অবদান আজ অনস্বীকার্য। পোশাকশিল্প থেকে কৃষি, শিক্ষা থেকে প্রশাসন, চিকিৎসা থেকে প্রযুক্তি- প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীশ্রম আজ জাতীয় উৎপাদনের অন্যতম চালিকাশক্তি। অথচ একই সমাজে আজও অনেক নারী নিরাপদ কর্মপরিবেশ পান না, যৌন হয়রানির শিকার হন, গৃহস্থালি দায়িত্বে অবদমিত থাকেন। একদিকে তারা পরিবারে মূল দায়িত্ব পালন করেন, অন্যদিকে অর্থনৈতিক সাফল্যে অবদান রাখেন। তবুও তাদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। অনেক সময় তাদের সফলতা পরিবার ও সমাজের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার কাছে হুমকি বলে বিবেচিত হয়।
এ বৈষম্য দূর করতে কেবল আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, বরং প্রয়োজন মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক পরিবর্তন। কারণ আইন যতই কঠোর হোক না কেন, যদি সমাজের মানসিকতা নারীর মর্যাদা ও স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি না দেয়, তবে উন্নতির পথ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায় যে, লিঙ্গসমতা কেবল সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন নয়, বরং এটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতির অপরিহার্য ভিত্তি। উদাহরণস্বরূপ, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো- সুইডেন, নরওয়ে ও ডেনমার্কে নারীর প্রতি নীতিনির্ধারণে এক ধরনের সমন্বিত রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে। সেখানে পুরুষদের জন্যও মাতৃত্বকালীন (Parental) ছুটি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যাতে পুরুষরা সন্তান লালন-পালন ও গৃহস্থালির কাজে সমান দায়িত্ব ভাগ করে নিতে পারেন। এর ফলে নারীরা কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েন না এবং পারিবারিক ও পেশাগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারেন।
অন্যদিকে আয়ারল্যান্ডে কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যকে আইনি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ফলে চাকরিদাতারা নারীর প্রতি অবিচার করলে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হন। এ ছাড়া দেশটি সামাজিক প্রচারণার মাধ্যমে পুরুষদেরও নারী অধিকার আন্দোলনের অংশ হিসেবে যুক্ত করেছে। ফলে পারিবারিক দায়িত্ব ভাগাভাগির সংস্কৃতি গড়ে উঠছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোতেও দীর্ঘদিনের পুরুষতান্ত্রিক ধারা ভেঙে নারী নেতৃত্ব ও উদ্যোক্তা বিকাশে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের Women in Innovation প্রকল্প নারীদের প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলছে, আর জাপানে কর্পোরেট বোর্ডে নারীর উপস্থিতি এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
বাংলাদেশে অবশ্যই অগ্রগতি হয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় মেয়েদের ভর্তি ও উপস্থিতির হার এখন ছেলেদের সমান, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে বেশি। প্রশাসনে নারী কর্মকর্তা, সংসদ সদস্য, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী- সব ক্ষেত্রেই নারী এখন দৃশ্যমান। গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তারা ক্ষুদ্রঋণ ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজেদের ব্যবসা গড়ে তুলছেন। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে অনেক তরুণী এখন ফ্রিল্যান্সিং, সফটওয়্যার উন্নয়ন এবং ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে সক্রিয়।
বাংলাদেশে নারী শ্রমিকদের অধিকাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত, যেখানে সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যবিমা বা মাতৃত্বকালীন সুবিধা নেই। নারীরা কাজ করেন, কিন্তু তাদের কাজের মূল্যায়ন প্রায়শই অনুপস্থিত।
রাজনীতি ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও বৈষম্য স্পষ্ট। যদিও বাংলাদেশে একাধিকবার নারী প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, কিন্তু স্থানীয় সরকার, কর্পোরেট বোর্ড কিংবা রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্তরে নারীর অংশগ্রহণ এখনো সীমিত। দলীয় রাজনীতিতে নারীদের প্রার্থী মনোনয়নে সীমাবদ্ধতা আছে, আর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও তারা প্রায়ই আর্থিক ও সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে পিছিয়ে পড়েন। এটি দেখায় যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় নারীর উপস্থিতি থাকলেও সমাজের মূল কাঠামোয় নারীর অধিকার এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
এ বাস্তবতা পরিবর্তন করতে হলে সরকার, সমাজ ও পরিবারকে যৌথভাবে এগিয়ে আসতে হবে। প্রথমত, কর্মক্ষেত্রে সমান কাজের জন্য সমান বেতনের নীতি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য মাতৃত্ব ও পিতৃত্ব ছুটি বাধ্যতামূলক করে পরিবারে সমান দায়িত্বের ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাব্যবস্থায় লিঙ্গসমতা বিষয়টি শিশুর মানসিক বিকাশের অংশ করতে হবে, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম নারীকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহযোগী হিসেবে দেখতে শেখে। তৃতীয়ত, গণমাধ্যম ও সামাজিক প্রচারণার মাধ্যমে নারীকে ‘সহানুভূতির নয়, মর্যাদার’ জায়গায় স্থাপন করতে হবে।
অর্থনৈতিক অগ্রগতির দিক থেকেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যেসব দেশে নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ বাড়ছে, সেখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল হচ্ছে। অর্থাৎ নারীকে ক্ষমতায়িত করা মানে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা। বাংলাদেশ যদি সত্যিই মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত দেশে পরিণত হতে চায়, তাহলে নারী শ্রম ও নেতৃত্বকে সম্পূর্ণভাবে মূলধারায় আনতে হবে।
সবকিছুর ভিত্তি হলো মানসিকতা- যে মানসিকতায় নারীকে দুর্বল নয়, সক্ষম হিসেবে দেখা হবে; সহানুভূতির নয়, সম্মানের জায়গায় বসানো হবে। পরিবারে, বিদ্যালয়ে, কর্মক্ষেত্রে- প্রতিটি জায়গায় এ মানসিক পরিবর্তন ঘটানো এখন সময়ের দাবি। আজকের শিশুর কাছে যদি শেখানো যায় যে, নারী ও পুরুষ সমানভাবে সমাজ গঠনের অংশীদার, তাহলে আগামী প্রজন্মের বাংলাদেশ হবে আরও ন্যায্য, মানবিক ও সমতাভিত্তিক।
নারীর প্রতি বৈষম্য কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। এটি শুধু নৈতিকতার প্রশ্ন নয়, এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব, মানবাধিকারের প্রতিশ্রুতি এবং টেকসই উন্নয়নের শর্ত। তাই আজ সময় এসেছে কথায় নয়, কাজে প্রমাণ করার- আমরা সত্যিই বিশ্বাস করি যে নারীর প্রতি বৈষম্য কাম্য নয়। বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রতিটি নীতিতে, প্রকল্পে ও সিদ্ধান্তে যদি নারীকে সমান মর্যাদায় দেখা যায়, তবে সেটিই হবে একটি সত্যিকার অর্থে প্রগতিশীল ও মানবিক রাষ্ট্রের সূচনা।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]



