একাধিক বিয়ের ব্যাপারটি ইসলামপূর্ব যুগেও পৃথিবীর প্রায় সব ধর্মমতেই বৈধ বলে বিবেচিত হতো। আরব, ভারতীয় উপমহাদেশ, ইরান, মিসর, ব্যাবিলন প্রভৃতি সব দেশেই এটির প্রচলন ছিল। একাধিক বিয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বর্তমান যুগেও স্বীকৃত।
ইসলামপূর্ব যুগে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই একাধিক বিয়ের ব্যাপারটি প্রচলিত ছিল। এর প্রতি কোনো ধরনের বাধা-বিপত্তি ছিল না। ইহুদি, খ্রিষ্টান, আর্য, হিন্দু এবং পারসিকদের মধ্যে একাধিক বিয়ের প্রচলন ছিল। ইসলামের প্রাথমিক যুগে কোনো সংখ্যা নির্ধারণ করা ছাড়া একাধিক বিয়ে বৈধ রেখেছে। পরে চারজনের বেশি করা যাবে না মর্মে আইন করেছে।
আজকের পৃথিবীতে একাধিক বিয়ের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করতে পারেনি কেউ। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘আর যদি তোমরা ভয় কর যে, এতিম মেয়ের হক যথাযথভাবে পূরণ করতে পারবে না, তবে সেসব মেয়েদের মধ্য থেকে যাদের ভালো লাগে তাদের বিয়ে করে নাও দুই, তিন কিংবা চারটি পর্যন্ত। আর যদি এমন আশঙ্কা কর যে, তাদের মধ্যে ন্যায়সংগত আচরণ বজায় রাখতে পারবে না, তবে একটিই; অথবা তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীদের; এতেই পক্ষপাতিত্বে জড়িত না হওয়ার অধিকতর সম্ভাবনা।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৩)
ইসলাম একাধিক বিয়ের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় বিধি-নিষেধও জারি করেছে। ইসলাম একই সময় চার এর অধিক স্ত্রী রাখাকে হারাম ঘোষণা করেছে। ইসলাম এ ক্ষেত্রে ইনসাফ কায়েমের জন্য বিশেষ তাগিদ দিয়েছে এবং ইনসাফের পরিবর্তে জুলুম করা হলে তার জন্য শাস্তির ঘোষণা করেছে।
আলোচ্য আয়াতে একাধিক বা চারজন স্ত্রী গ্রহণ করার সুযোগ অবশ্য দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে এই চার পর্যন্ত কথাটি আরোপ করে; এর বেশিসংখ্যক স্ত্রী গ্রহণ করা যাবে না; বরং তা হবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ তাও বলা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একাধিক বিয়ের মধ্যে ছিল বহু প্রজ্ঞা। আল্লাহর নির্দেশেই তিনি এ মহৎ কাজ সম্পাদন করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ততক্ষণ আমি কোনো নারীকে বিয়ে করিনি এবং আমার মেয়েদের অন্য কারও কাছে বিয়ে দিইনি যতক্ষণ না আমার প্রভুর পক্ষ থেকে জিবরাইল (আ.) বিয়ের আদেশ সংবলিত বার্তা না এনেছেন।’ (উয়ুনুল আসার, ২/৩০০, শরহে মাওয়াহিব, ৩/২১৯)
নবি-রাসুলরা আল্লাহর কিতাব ও মুজেজাপ্রাপ্ত হন। আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া তারা কোনো কাজ করেন না। আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেন, ‘আর তিনি (রাসুল) প্রবৃত্তির তাড়নায় কথা বলেন না; বরং যা কিছু বলেন তা সবই (আল্লাহর কাছ থেকে) প্রত্যাদেশ হয়।’ (সুরা নাজম, আয়াত: ৩-৪)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একাধিক বিয়ের অনেক কারণ রয়েছে। তা হলো, দ্বীন প্রচার-প্রসারের মাধ্যম। তিনি ছিলেন বিশ্বনবি ও রাষ্ট্রনায়ক। চতুর্মুখী ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে ইসলাম ধর্মকে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তিনি আদিষ্ট হয়েছেন। কিন্তু পরিবেশ পরিস্থিতিকে সামাল দিতে অনেক জটিল সমস্যার সম্মুখীন হন তিনি। তাঁর একাধিক বিয়ে ধর্মীয় বিধান প্রচার ও প্রসারে বিরাট ভূমিকা রাখে। একাধিক বিয়ের ফলে বিভিন্ন গোত্রের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপিত হয়—যা রাজনৈতিক জটিলতা দূর করে দ্বীন প্রচারের সুযোগ করে।
কোরআনে চারজন স্ত্রীর কথা বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং সঙ্গে সঙ্গে বলে দেওয়া হয়েছ, ‘যদি তোমরা তাদের মধ্যে সমতা বিধান বা ন্যায়বিচার করতে না পার, তাহলে এক স্ত্রীর ওপরেই নির্ভর করো।’
এতে বোঝা যায়, একাধিক বিয়ে ঠিক তখনই বৈধ হতে পারে, যখন শরিয়ত মোতাবেক সবার সঙ্গে সমান আচরণ করা হবে; তাদের সবার অধিকার সমভাবে সংরক্ষণ করা হবে। এ ব্যাপারে অপারগ হলে এক স্ত্রীর ওপরই নির্ভর করতে হবে এবং এটাই ইসলামের নির্দেশ। রাসুলুল্লাহ (সা.) একাধিক স্ত্রীর বেলায় সবার সঙ্গে পরিপূর্ণ সমতার ব্যবহার করার ব্যাপারে বিশেষভাবে তাগিদ করেছেন এবং যারা এর ব্যতিক্রম করবে, তাদের জন্য কঠিন শাস্তির সংবাদ দিয়েছেন। নিজের ব্যবহারিক জীবনেও তিনি এ ব্যাপারে সর্বোত্তম আদর্শ স্থাপন করে দেখিয়েছেন। এমনকি তিনি এমন বিষয়েও সমতাপূর্ণ ব্যবহারের আদর্শ স্থাপন করেছেন, যে ক্ষেত্রে এর প্রয়োজন ছিল না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তির দুই স্ত্রী রয়েছে, সে যদি তাদের মধ্যে ব্যবহারের ক্ষেত্রে পূর্ণ সমতা ও ইনসাফ করতে না পারে, তবে কিয়ামতের ময়দানে সে এমনভাবে উঠবে যে, তার শরীরের এক পার্শ্ব অবশ হয়ে থাকবে।’ (মিশকাতুল মাসাবিহ, পৃষ্ঠা: ২৭৮)
লেখক: আলেম ও মাদরাসা শিক্ষক